ব্রেন কেন পরিবর্তন পছন্দ করে না-বিজ্ঞান কী বলে?
নতুন বছরের প্রথম দিন।
খাতায় লিখলেন: “এ বছর প্রতিদিন ভোরে উঠব, বই পড়ব, হাঁটব।”
প্রথম সপ্তাহ দারুণ গেল।
দ্বিতীয় সপ্তাহে একটু ঢিলে।
তৃতীয় সপ্তাহে দেখলেন, জীবন আবার ঠিক আগের জায়গায় ফিরে গেছে।
যেন কোনো অদৃশ্য রাবার ব্যান্ড আপনাকে টেনে পুরোনো জায়গায় ফিরিয়ে আনল।
সেই রাবার ব্যান্ডটা আপনার দুর্বলতা নয়।
ওটা আপনার ব্রেনের ডিজাইন।
.png)

বিজ্ঞান কী বলে
১. ব্রেনএকটা ভবিষ্যদ্বাণী-যন্ত্র
নিউরোসায়েন্টিস্ট Karl Friston-এর ধারণা অনুযায়ী, ব্রেন সারাক্ষণ অনুমান করে পরের মুহূর্তে কী ঘটবে। অনুমান মিলে গেলে সে স্বস্তিতে থাকে। না মিললে, অর্থাৎ অনিশ্চয়তা বাড়লে, সে সতর্ক হয়ে যায়।
পরিচিত রুটিন মানে অনুমান সহজ।
নতুন রুটিন মানে অনুমানে ভুলের সম্ভাবনা।
তাই ভালো পরিবর্তনও মগজের (ব্রেন) কাছে প্রথমে “অনিশ্চয়তা” হিসেবেই ধরা পড়ে।
২. আমাদের দিনের বড় অংশ চলে অটোপাইলটে
মনোবিজ্ঞানী Wendy Wood ও তাঁর সহকর্মীদের গবেষণায় দেখা গেছে, আমাদের প্রতিদিনের আচরণের প্রায় ৪৩ শতাংশ ঘটে অভ্যাসবশে, একই পরিবেশে, প্রায় না ভেবেই।
MIT-এর নিউরোসায়েন্টিস্ট Ann Graybiel দেখিয়েছেন, অভ্যাস তৈরি হলে ব্রেন পুরো কাজটাকে একটা “প্যাকেট” বানিয়ে ব্যাসাল গ্যাংলিয়া নামের অংশে জমা রাখে। তখন কাজটা করতে আর আলাদা করে ভাবতে হয় না।
এটা মগজের (ব্রেন) শক্তি বাঁচানোর দারুণ কৌশল। কিন্তু এর উল্টো দিকও আছে: পুরোনো প্যাকেটটা সবসময় হাতের কাছে, আর নতুনটা এখনো তৈরিই হয়নি।
৩. “যেমন আছে তেমনই থাক” প্রবণতা
অর্থনীতিবিদ Samuelson ও Zeckhauser এর নাম দিয়েছেন Status Quo Bias। নতুন বিকল্প ভালো হলেও মানুষ প্রায়ই বর্তমান অবস্থাটাই বেছে নেয়, কারণ পরিবর্তনের সম্ভাব্য ক্ষতি মগজের (ব্রেন) কাছে লাভের চেয়ে বেশি ভারী মনে হয়।
নতুন করে দেখুন
আপনি পরিবর্তন করতে পারেন না, এমন নয়।
আপনি পরিবর্তনকে “পরিবর্তন” হিসেবে দেখাচ্ছেন বলেই ব্রেন বাধা দিচ্ছে।
তাই বলে ব্রেন জেদি নয়।
ব্রেন শুধু পরিচিতি ভালোবাসে।
তাহলে কৌশলটা সহজ: নতুন জিনিসকে পুরোনো জিনিসের ছদ্মবেশ দিন।
Brain Hack: নতুন অভ্যাসকে পুরোনো রুটিনের সাথে বেঁধে দিন
যে কাজটা আপনি এমনিতেই প্রতিদিন করেন, সেটা আপনার “নোঙর”। নতুন অভ্যাসটাকে ঠিক ওই নোঙরের পরে জুড়ে দিন।
BJ Fogg এই পদ্ধতির একটা সহজ সূত্র দিয়েছেন:
“আমি যখন [পুরোনো কাজ] করব, তার ঠিক পরে [নতুন ছোট কাজ] করব।” যেমন:
• সকালে চা ঢালার পর, ২ পৃষ্ঠা পড়ব
• ফজরের নামাজের পর, ৫ মিনিট হাঁটব
• রাতে ফোন চার্জে দেওয়ার পর, ৩ লাইন লিখব
কেন এটা কাজ করে?
মনোবিজ্ঞানী Peter Gollwitzer এই ধরনের “যদি–তাহলে” পরিকল্পনার নাম দিয়েছেন Implementation Intention। ৯৪টি গবেষণার একটি মেটা-অ্যানালাইসিসে দেখা গেছে, শুধু লক্ষ্য ঠিক করার চেয়ে “কখন, কোথায়, কী করব” আগে থেকে ঠিক করে রাখলে কাজটা হওয়ার সম্ভাবনা উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়ে।
কারণ তখন ব্রেনকে আর নতুন করে সিদ্ধান্ত নিতে হয় না।
পুরোনো কাজটাই সংকেত হয়ে নতুন কাজটাকে ডেকে আনে।
ব্রেন তখন বলে: “এটা তো নতুন কিছু না। এটা তো চায়েরই অংশ।”
একটা ফ্যাক্ট
অভ্যাস তৈরিতে “২১ দিন” লাগে, এই কথাটা জনপ্রিয় হলেও গবেষণায় টেকে না।
ইউনিভার্সিটি কলেজ লন্ডনের গবেষক Phillippa Lally-র গবেষণায় একটা অভ্যাস স্বয়ংক্রিয় হতে গড়ে লেগেছে ৬৬ দিন। মানুষভেদে সময়টা ১৮ দিন থেকে ২৫৪ দিন পর্যন্ত।
আর সবচেয়ে ভালো খবর: মাঝে একদিন বাদ পড়লে পুরো প্রক্রিয়া নষ্ট হয় না। তাই তাড়াহুড়ো নয়। ধৈর্য। ধারাবাহিকতা।
শেষ কথা
পরিবর্তনের সাথে যুদ্ধ করলে ব্রেন রাবার ব্যান্ডের মতো আপনাকে পেছনে টানবে। পরিবর্তনকে পরিচিতির পোশাক পরালে সে নিজেই আপনাকে এগিয়ে দেবে।
মনে রাখতে হবে, বড় পরিবর্তন এক লাফে আসে না। আসে পুরোনো রুটিনের গায়ে একটা একটা ছোট সেলাই দিয়ে।
সূত্র : Soul Wellness