সূরা আলে ইমরান: উল্লেখযোগ্য আয়াত নাজিলের প্রেক্ষাপট ও অর্থ (পর্ব-৫)
নাওয়াস ইবনে সামআন (রা.) থেকে বর্ণিত। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসালাম বলেন, কোরআন ও কোরআনের ধারক বাহকরা কেয়ামতের দিন এমনভাবে হাজির হবে যে, সূরা আল বাকারা ও আলে ইমরান তাদের আগে আগে থাকবে। নাওয়াস (রা.) বলেন, রাসূল (সা.) এ দু’টি সূরার আগমনের তিনটি উদাহরণ দিয়েছেন, আমি সেগুলো এখনও ভুলিনি। তিনি বলেন, (১) এ দু’টি সূরা ছায়ার -মতো আসবে, আর এতদুভয়ের মাঝে থাকবে আলো। (২) অথবা এ দু’টি কালো মেঘ খন্ডের ন্যায়। (৩) অথবা ডানা বিস্তারকারী পাখীর ন্যায় আসবে এবং তাদের সাথীর পক্ষ হয়ে বিতর্ক করবে (তিরমিযি-১১৬)।
وَدَّت طَّآئِفَةٌ مِّنْ أَهْلِ الْكِتَابِ لَوْ يُضِلُّونَكُمْ وَمَا يُضِلُّونَ إِلاَّ أَنفُسَهُمْ وَمَا يَشْعُرُونَ
অর্থ: (মুসলিমগণ!) কিতাবিদের একদল চায় যেন তোমাদেরকে বিপদগামী করতে পারে, অথচ তারা নিজেদেরকেই বিপদগামী করে। কিন্তু উপলব্ধি করে না। (আয়াত-৬৯)।
আরো পড়ুন >>> সূরা আলে ইমরান: ৫০-৬৮ নাম্বার আয়াত নাজিলের প্রেক্ষাপট ও অর্থ
শানে নুযুল: উল্লেখিত আয়াতগুলো ইহুদি আলেমদের কুচক্রান্ত ও মূর্খতা প্রসঙ্গে অবতীর্ণ হয়েছে। বর্ণিত আছে, ওহুদ যুদ্ধের সময় ইহুদিদের সরদার কা’ব ইবনে আশরাফ ও কতিপয় আলেম মহানবী (সা.) এর কয়েকজন সাহাবি, যেমন হজরত আম্মার, হুযায়ফা ও মাআয (রা.) প্রমূখকে ইসলাম ধর্ম ত্যাগ করে ইহুদি ধর্ম গ্রহণ করে বলে দেন যে, এসব দুষ্কর্ম তাদের নিজেদেরকেই ধ্বংসে নিমজ্জিত করছে, অন্য কাউকে পথভ্রষ্ট করতে পারবে না।
يَا أَهْلَ الْكِتَابِ لِمَ تَلْبِسُونَ الْحَقَّ بِالْبَاطِلِ وَتَكْتُمُونَ الْحَقَّ وَأَنتُمْ تَعْلَمُونَ.
অর্থ: হে কিতাবিগণ! তোমরা জেনে-বুঝে কেন সত্যকে মিথ্যার সঙ্গে মিশ্রিত করো এবং সত্য গোপন কর? (আয়াত: ৭১)।
শানে নুযুল: হজরত ইবনে আব্বাস (রা.) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আহলে কিতাব আব্দুলাহ ইবনে সাইফ, আদী ইবনে যায়েদ ও হারেছ ইবনে আউফ পরস্পরে বলল যে, চল আমরা মুহাম্মাদ ও তার সাথীদের প্রতি যা অবতরণ করা হয়, সকালে তার প্রতি ঈমান গ্রহণ করি আর সন্ধ্যায় তার প্রতি অবিশ্বাস প্রকাশ করি। যাতে করে তাদের ধর্মীয় ব্যাপারে তাদের মাঝে বিভ্রান্তি বা হজবরল সৃষ্টি হয়ে যায়। তাহলে আমরা যা করি তারাও আমাদের অনুসরণে তাই করে যাবে। ফলে তারা নিজেদের ধর্ম থেকে ফিরে আসবে। তাদের এমন বিভ্রান্তি কর কর্ম-সূচির জবাবে আল্লাহ আলোচ্য আয়াত নাজিল করেন। (ফতহুল কাদীর-৩৬২/১)।
وَقَالَت طَّآئِفَةٌ مِّنْ أَهْلِ الْكِتَابِ آمِنُواْ بِالَّذِيَ أُنزِلَ عَلَى الَّذِينَ آمَنُواْ وَجْهَ النَّهَارِ وَاكْفُرُواْ آخِرَهُ لَعَلَّهُمْ يَرْجِعُونَ.
অর্থ: কিতাবিদের একদল (অপর দলকে) বলল: ‘যে কালাম মুসলমানদের ওপর অবতীর্ণ করা হয়েছে তার ওপর তোমরা দিনের শুরুতে ঈমান আন এবং দিনের শেষে তা অস্বীকার কর। হয়ত এভাবে মুসলমানরাও (তাদের ধর্ম থেকে) বিমুখ হয়ে যাবে। (আয়াত-৭২)।
শানে নুযুল: কারো মতে অত্র আয়াতটি কেবলা পরিবর্তনের পর ইহুদিদের ষড়যন্ত্র উপলক্ষ্যে অবতীর্ণ হয়। বর্ণিত আছে যে, ইহুদিদের নেতা কা’ব ইবনে আশরাফ তার সাথীদের বলে যে, তোমরা মুসলমানদের ওপর ঈমান এনে দিনের প্রথম ভাগে কা’বার দিকে ফিরে নামাজ পড়বে আর দিনের শেষের দিকে ضحرة তথা বায়তুল মুকাদ্দাসের দিকে ফিরে নামাজ পড়বে। এতে মুসলমানরা ধারণা করবে যে, তারা তো আমাদের থেকে অধিক জ্ঞানী। ফলে তারা ইসলাম ত্যাগ করে ফিরে আসতে পারে।
وَلاَ تُؤْمِنُواْ إِلاَّ لِمَن تَبِعَ دِينَكُمْ قُلْ إِنَّ.
অর্থ: তোমাদের মধ্যে যারা ধর্ম মতে চলবে, তাদের ছাড়া আর কাউকে বিশ্বাস করবে না। বলে দিন, নিঃসন্দেহে হেদায়েত সেটাই, যে হেদায়াত আল্লাহ করেন। আর এসব কিছু এজন্য যে, তোমরা যা লাভ করেছিলে অন্য কেউ তা কেন প্রাপ্ত হবে। কিংবা তোমাদের পালনকর্তার সামনে তোমাদের ওপর তারা কেন প্রবল হয়ে যাবে। বলে দিন, মর্যাদা আল্লাহরই হাতে, তিনি যাকে ইচ্ছা দান করেন এবং আল্লাহ প্রাচুর্যময়ও সর্বজ্ঞ। (আয়াত: ৭৩)।
শানে নুযুল: হজরত আবু মালেক (রহ.) বলেন, ইহুদিদের পুরোহিতরা তাদের অধীনস্তদের বলত, তোমাদের ধর্মের অনুসারী ছাড়া তোমরা অন্য কাউকে বিশ্বাস করো না। আল্লাহ পাক তাদের জবাবে এ আয়াত নাজিল করেন।
وَمِنْ أَهْلِ الْكِتَابِ مَنْ إِن تَأْمَنْهُ بِقِنطَارٍ يُؤَدِّهِ إِلَيْكَ وَمِنْهُم مَّنْ إِن تَأْمَنْهُ بِدِينَارٍ لاَّ يُؤَدِّهِ إِلَيْكَ إِلاَّ مَا دُمْتَ عَلَيْهِ قَآئِمًا ذَلِكَ بِأَنَّهُمْ قَالُواْ لَيْسَ عَلَيْنَا فِي الأُمِّيِّينَ سَبِيلٌ وَيَقُولُونَ عَلَى اللَّهِ الْكَذِبَ وَهُمْ يَعْلَمُونَ.
অর্থ: আহলে কিতাবদের মধ্যে কিছু লোক এমন আছে, তোমরা তাদের নিকট বিপুল সম্পদ আমানত রাখলেও তারা তা ফিরিয়ে দেবে। আবার এমন লোকও আছে যার নিকট একটি দিনার আমানত রাখলেও সে তা ফিরিয়ে দেবে না যদি না তুমি তাদের মাথার ওপর দাঁড়িয়ে না থাকো। এর কারণ হচ্ছে, তারা বলে, উম্মীদের অধিকার নষ্ট করায় তাদের কোনো পাপ নেই। তারা আল্লাহ সম্পর্কে জেনে শুনেই মিথ্যা বলে। (আয়াত: ৭৫)
শানে নুযুল: এ আয়াতের শানে নুযুল সম্পর্কে হজরত ইবনে আব্বাস (রা.) হতে বর্ণিত আছে যে, জনৈক কোরেশী হজরত আব্দুলাহ ইবনে সালাম (রা.) এর নিকট (ইহুদি থাকা অবস্তায়) বার শত আওকিয়া পরিমাণ স্বর্ণ মুদ্রা গচ্ছিত রাখল, কিছুদিন পর আমানতকৃত স্বর্ণমুদ্রা সে ফেরত চাইলে তৎক্ষণাৎ সে তা তাকে দিয়ে দিল। অপর দিকে ফানখাজ ইবনে আযওয়ারা নামক ইহুদির নিকট একজন কোরেশী একটি মাত্র দিনার আমানত রাখল। যখন সে তার দিনারটি চাইল তখন সে অস্বীকার করে বলল, সে ইহুদি নয়, সে মূর্খ কাজেই তাদের সম্পদ আমাদের জন্য বৈধ। তাদের সম্পদ আত্মসাৎ করলে জবাবদিহী করতে হবে না, তাদের সম্পর্কেই উক্ত আয়াতটি অবতীর্ণ হয়।
إِنَّ الَّذِينَ يَشْتَرُونَ بِعَهْدِ اللهِ وَأَيْمَانِهِمْ ثَمَنًا قَلِيلاً أُوْلَئِكَ لاَ خَلاَقَ لَهُمْ فِي الآخِرَةِ.
অর্থ: যারা আল্লাহর নামে কৃত অঙ্গিকার এবং প্রতিজ্ঞা সামান্য মূল্যে বিক্রয় করে, আখেরাতে তাদের কোনো অংশ নেই। আর তাদের সঙ্গে কেয়ামতের দিন আল্লাহ পাক কথা বলবেন না। তাদের প্রতি দৃষ্টিও দেবেন না। আর তাদেরকে পরিশুদ্ধ ও করবেন না। বস্তুত: তাদের জন্য রয়েছে যন্ত্রনাদায়ক আজাব। (আয়াত: ৭৭)।
শানে নুযুল: (১) হজরত আশআছ (রা.) বলেন, জনৈক ইহুদি ও আমি একটি জমিতে অংশীদার ছিলাম। ইহুদি আমার অংশের ব্যাপারে অঙ্গিকার করে বসলো। আমি নবী করিম (সা.) এর কাছে মুকাদ্দামা পেশ করলাম। তিনি আমার কাছ প্রমাণ চাইলেন। আমি প্রমান পেশ করতে পারলাম না। তাই তিনি ইহুদীকে হলফ করে বলতে বললেন। আমি আরজ করলাম ইয়া রাসূলুলাহ! সেতো হলফ করে আমার সম্পদ নিয়ে যাবে। তখন আল্লাহ পাক উপরোক্ত আয়াত নাজিল করেন। (বুখারি শরিফ, মুসলিম, লুবাব)।
مَا كَانَ لِبَشَرٍ أَن يُؤْتِيَهُ اللهُ الْكِتَابَ وَالْحُكْمَ وَالنُّبُوَّةَ ثُمَّ يَقُولَ لِلنَّاسِ
অর্থ: কোনো মানুষকে আল্লাহর কিতাব, হেকমত ও নবুওয়াত দান করার পর সে বলবে না যে, তোমরা আল্লাহকে পরিহার করে আমার বান্দা হয়ে যাও এটা সম্ভব নয়। বরং তারা বলবে, তোমরা আল্লাহ ওয়ালা হয়ে যাও যেমন, তোমরা কিতাব শেখাতে এবং তোমরা নিজেরাও পড়তে। তাছাড়া তোমাদেরকে এ কথা বলা ও সম্ভব নয় যে, তোমরা ফেরেশতা ও নবীগণকে নিজেদের পালনকর্তা সাব্যস্ত করে নাও। তোমাদের মুসলমান হবার তারা কি তোমাদেরকে কুফুরী শিখাবে? (আয়াত: ৭৯)।
শানে নুযুল: হজরত হাসান বসরী (রহ.) বলেন, আমি এ তথ্য পেয়েছি যে, জনৈক ব্যক্তি আরজ করলেন ইয়া রাসূলুলাহ! আমরা পরস্পরে যেমন সালাম করে থাকি আপনাকেও তেমনি সালাম করি (অথচ আপনার তো বিশেষত্ব থাকা উচিত) সুতরাং আমাদের তীব্র আগ্রহ আমরা আপনার সামনে সিজদা করব। জবাবে তিনি এরশাদ করলেন, আমাকে সিজদা করার প্রয়োজন নাই। সম্মান করো এবং নবীর পরিবার পরিজনের হক আদায় কর। কেননা আল্লাহ ছাড়া সেজদা অন্য কারো সামনে সিজদা করার অনুমতি নেই। এ প্রসঙ্গে আল্লাহ পাক আলোচ্য আয়াত দুটি নাজিল করেন।
أَفَغَيْرَ دِينِ اللَّهِ يَبْغُونَ وَلَهُ أَسْلَمَ مَن فِي السَّمَاوَاتِ وَالأَرْضِ طَوْعًا وَكَرْهًا وَإِلَيْهِ يُرْجَعُونَ.
অর্থ: তারা কি চায় আল্লাহর দিনের পরিবর্তে অন্য দিন? যখন আকাশে ও পৃথিবীতে যা কিছু আছে সবকিছু ইচ্ছায় অথবা অনিচ্ছায় তার নিকট আত্মসমার্পন করেছে! আর তার দিকেই তারা প্রত্যানীত হবে। (আয়াত: ৮৩)।
শানে নুযুল: হজরত ইবনে আব্বাস (রা.) হতে বর্ণিত আছে যে, আহলে কিতাবগণ হজরত ইব্রাহিম (আ.) এর দ্বীন নিয়ে ঝগড়া করে মহানবী (সা.) এর নিকট মীমাংসার জন্য উপস্থিত হয়। তাদের উভয় দলই এ দাবি উত্থাপন করল তারা ইব্রাহিম (আ.) এর বেশি নিকটতম। রাসূল সালালাহু আলাইহি ওয়াসালাম বললেন, তোমরা উভয় দলই হজরত ইব্রাহিম (আ.) এর দ্বীন থেকে তৈরি, তথা তাঁর দ্বীনের ওপর কেউই নেই; বরং আমিই তাঁর দ্বীনের অনুসারী তখন তারা বলল, আমরা আপনার ফয়সালায় সন্তুষ্ট হতে পারিনি। আর আপনার দ্বীনও গ্রহণ করব না, তখন আল্লাহ তায়ালা উক্ত আয়াত নাজিল করেন।
وَمَن يَبْتَغِ غَيْرَ الإِسْلاَمِ دِينًا فَلَن يُقْبَلَ مِنْهُ وَهُوَ فِي الآخِرَةِ مِنَ الْخَاسِرِيْنَ
অর্থ: যে লোক ইসলাম ছাড়া অন্য কোনো ধর্ম তালাশ করে, কস্মিণকালেও তা গ্রহণ করা হবে না এবং আখেরাতে সে ক্ষতিগ্রস্ত। (আয়াত: ৮৫)।
শানে নুযুল: আলোচ্য আয়াত এক জামাত সম্পর্কে নাজিল হয়েছে, যারা ধর্মত্যাগী হয়েছিল। তারা ১২ জন মানুষ। তারা মদিনা ত্যাগ করে মক্কায় কাফেরদের নিকট গমন করেছিল। তাদের মাঝে হারেছ বিন সুয়াইদ আনসারীও ছিল। তাদের এভাবে ধর্মান্তরিত হওয়ার পরিণতি সম্পর্কে আলোচ্য আয়াত নাজিল হয়েছে। কুরতুবীর বর্ণনা মতে এ আয়াত অবতরণের পর তিনি ইসলাম গ্রহণ করেন। (রুহুল মাআনী:২১৫/২, কুরতুবী: ১২৬/৪)।
চলবে...