দরূদ দুশ্চিন্তা লাঘব এবং আল্লাহর ক্ষমা লাভের গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম
যে ব্যক্তি আমার ওপর একবার দরূদ পাঠ করে, আল্লাহ তার ওপর দশটি রহমত নাজিল করেন, তার দশটি গুনাহ মাফ করে দেন এবং তার মর্যাদা দশ ধাপ বৃদ্ধি করেন। সুনান আন-নাসাঈ, হাদিস: ১২৯৭; ইমাম আলবানী রহ. সহিহ বলেছেন)»
দরূদ এত বেশি পড়ুন, যেন আপনার জীবনই সাক্ষ্য দেয়—আপনি রাসূল ﷺ–এর প্রতি ভালোবাসায় পরিপূর্ণ ছিলেন
আল্লাহ তাআলা তাঁর প্রিয় নবী মুহাম্মদ ﷺ–এর প্রতি দরূদ ও সালাম পাঠ করার বিশেষ নির্দেশ দিয়েছেন। পবিত্র কুরআনে আল্লাহ বলেন:
«"নিশ্চয়ই আল্লাহ ও তাঁর ফেরেশতাগণ নবীর প্রতি দরূদ প্রেরণ করেন। হে ঈমানদারগণ! তোমরাও তাঁর প্রতি দরূদ ও সালাম প্রেরণ কর।"
(সূরা আল-আহযাব, ৩৩:৫৬)»
এই একটি আয়াতই প্রমাণ করে যে দরূদ পাঠ করা কেবল একটি নফল আমল নয়; বরং এটি আল্লাহর প্রিয় একটি ইবাদত এবং রাসূল ﷺ–এর প্রতি ভালোবাসার বাস্তব প্রকাশ।
অনেকেই বলেন, "এত দরূদ পড়ো যেন হাশরের মাঠে জিহ্বা সাক্ষ্য দেয় যে তুমি সবচেয়ে বেশি দরূদ পড়েছ।" এই কথাটি উপদেশ হিসেবে ভালো হলেও এটি কোনো সহিহ হাদিস নয়। তাই একে হাদিস বলে প্রচার করা উচিত নয়। তবে সহিহ হাদিসে এমন অসংখ্য ফজিলত এসেছে, যা আমাদেরকে অধিক পরিমাণে দরূদ পাঠে উদ্বুদ্ধ করে।
রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:
«"যে ব্যক্তি আমার ওপর একবার দরূদ পাঠ করে, আল্লাহ তার ওপর দশটি রহমত নাজিল করেন, তার দশটি গুনাহ মাফ করে দেন এবং তার মর্যাদা দশ ধাপ বৃদ্ধি করেন।"
(সুনান আন-নাসাঈ, হাদিস: ১২৯৭; ইমাম আলবানী রহ. সহিহ বলেছেন)»
ভাবুন, আপনি যদি প্রতিদিন ১০০ বার দরূদ পাঠ করেন, তবে আল্লাহর অগণিত রহমত, ক্ষমা ও মর্যাদা লাভের সুযোগ সৃষ্টি হয়। এ কারণেই সালাফে সালেহীন দরূদকে জীবনের নিয়মিত আমল বানিয়ে নিয়েছিলেন।
আরেকটি প্রসিদ্ধ সহিহ হাদিসে রাসূল ﷺ বলেছেন:
«"কিয়ামতের দিন আমার সবচেয়ে নিকটবর্তী হবে সেই ব্যক্তি, যে আমার ওপর সবচেয়ে বেশি দরূদ পাঠ করেছে।"
(জামি' আত-তিরমিযী, হাদিস: ৪৮৪; হাসান)»
এই হাদিস আমাদের জন্য বিরাট সুসংবাদ। পৃথিবীতে আমরা যত বেশি দরূদ পড়ব, ইনশাআল্লাহ কিয়ামতের দিন তত বেশি রাসূল ﷺ–এর নৈকট্য লাভের আশা করতে পারি।
আরেক হাদিসে এসেছে:
«"যে ব্যক্তি সকালে দশবার এবং সন্ধ্যায় দশবার আমার ওপর দরূদ পাঠ করবে, কিয়ামতের দিন সে আমার শাফাআত লাভ করবে।"
(এ হাদিস বিভিন্ন সনদে বর্ণিত; অনেক মুহাদ্দিস এর সনদের দুর্বলতার কথা উল্লেখ করেছেন। তাই এটি নিশ্চিত ফজিলত হিসেবে নয়, বরং সহায়ক বর্ণনা হিসেবে উল্লেখ করা হয়।)»
দরূদ এমন একটি আমল, যা দোয়া কবুলেরও অন্যতম মাধ্যম। সাহাবি উমর ইবনুল খাত্তাব (রা.) থেকে বর্ণিত আছে:
«"দোয়া আসমান ও জমিনের মাঝখানে ঝুলে থাকে; নবী ﷺ–এর ওপর দরূদ পাঠ না করা পর্যন্ত তা উপরে ওঠে না।"
(জামি' আত-তিরমিযী, হাদিস: ৪৮৬)»
তাই দোয়ার শুরুতে ও শেষে দরূদ পাঠ করা উত্তম।
আরেকটি সহিহ হাদিসে রাসূল ﷺ বলেছেন:
«"কৃপণ সেই ব্যক্তি, যার সামনে আমার নাম উচ্চারিত হলো অথচ সে আমার ওপর দরূদ পাঠ করল না।"
(জামি' আত-তিরমিযী, হাদিস: ৩৫৪৬; সহিহ)»
এ হাদিস আমাদের সতর্ক করে যে, রাসূল ﷺ–এর নাম শুনেও দরূদ না পড়া একজন মুমিনের জন্য বড় বঞ্চনার বিষয়।
সাহাবি উবাই ইবন কা'ব (রা.) একদিন রাসূল ﷺ–কে জিজ্ঞাসা করলেন, তিনি তাঁর দোয়ার কতটুকু অংশ দরূদের জন্য নির্ধারণ করবেন। বিভিন্ন পরিমাণ উল্লেখ করার পর তিনি বললেন, "আমি যদি আমার সমস্ত দোয়াই আপনার ওপর দরূদে ব্যয় করি?" তখন রাসূল ﷺ বললেন:
«"তাহলে তোমার সব চিন্তা দূর হবে এবং তোমার গুনাহ ক্ষমা করা হবে।"
(জামি' আত-তিরমিযী, হাদিস: ২৪৫৭; হাসান)»
এই হাদিসে বোঝা যায়, দরূদ মানুষের দুশ্চিন্তা লাঘব এবং আল্লাহর ক্ষমা লাভের একটি গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম।
দরূদ কেবল মুখের উচ্চারণ নয়; এটি নবী ﷺ–এর প্রতি ভালোবাসা, আনুগত্য ও অনুসরণের অঙ্গীকার। যে ব্যক্তি সত্যিকার অর্থে রাসূল ﷺ–কে ভালোবাসে, সে তাঁর সুন্নাহ অনুসরণ করারও চেষ্টা করে। তাই বেশি দরূদ পড়ার পাশাপাশি তাঁর আদর্শ অনুযায়ী জীবন গঠন করাও জরুরি।
আমরা প্রতিদিন অসংখ্য কাজে সময় ব্যয় করি। অথচ কয়েক মিনিট সময় বের করে যদি ৫০, ১০০ বা তারও বেশি বার দরূদ পাঠ করি, তবে তা আমাদের আখিরাতের জন্য অমূল্য সম্পদ হয়ে থাকবে। বিশেষ করে জুমার দিন ও রাত দরূদ পাঠের প্রতি বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
রাসূল ﷺ বলেছেন:
«"তোমাদের দিনগুলোর মধ্যে জুমার দিন সর্বোত্তম। তাই এ দিনে আমার ওপর বেশি বেশি দরূদ পাঠ করো।"
(সুনান আবু দাউদ, হাদিস: ১০৪৭; সুনান আন-নাসাঈ)»
সুতরাং, আমাদের লক্ষ্য হওয়া উচিত—লোক দেখানোর জন্য নয়, বরং আল্লাহর সন্তুষ্টি ও রাসূল ﷺ–এর ভালোবাসায় উদ্বুদ্ধ হয়ে অধিক পরিমাণে দরূদ পাঠ করা।
শেষে একটি কথা মনে রাখা দরকার: "হাশরের মাঠে জিহ্বা সাক্ষ্য দেবে, এই লোক সবচেয়ে বেশি দরূদ পড়েছে"—এটি সহিহ হাদিস নয়। কিন্তু সহিহ হাদিসে প্রমাণিত হয়েছে যে, যে ব্যক্তি বেশি দরূদ পাঠ করবে, সে কিয়ামতের দিন রাসূল ﷺ–এর অধিক নৈকট্য লাভ করবে, আল্লাহর রহমত, ক্ষমা ও উচ্চ মর্যাদা অর্জন করবে। তাই আসুন, আমরা প্রতিদিন নিয়মিত দরূদ পাঠের অভ্যাস গড়ে তুলি।
اللَّهُمَّ صَلِّ عَلَى مُحَمَّدٍ وَعَلَى آلِ مُحَمَّدٍ، كَمَا صَلَّيْتَ عَلَى إِبْرَاهِيمَ وَعَلَى آلِ إِبْرَاهِيمَ، إِنَّكَ حَمِيدٌ مَجِيدٌ، وَبَارِكْ عَلَى مُحَمَّدٍ وَعَلَى آلِ مُحَمَّدٍ، كَمَا بَارَكْتَ عَلَى إِبْرَاهِيمَ وَعَلَى آلِ إِبْرَاهِيمَ، إِنَّكَ حَمِيدٌ مَجِيدٌ।
আল্লাহ আমাদের সবাইকে অধিক পরিমাণে দরূদ পাঠ করার তাওফিক দান করুন এবং কিয়ামতের দিন রাসূলুল্লাহ ﷺ–এর শাফাআত ও নৈকট্য নসিব করুন। আমীন।
.png)