ঢাকা,  বুধবার   ০৪ নভেম্বর ২০২৬, ১৯ কার্তিক ১৪৩৩

[ জাতীয় ]

সেনাবাহিনী নিয়ে অপপ্রচার এবং আন্তর্জাতিক অঙ্গনের প্রকৃত চিত্র

নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশিত: ১৭:৩৫, ৪ নভেম্বর ২০২৬
সেনাবাহিনী নিয়ে অপপ্রচার এবং আন্তর্জাতিক অঙ্গনের প্রকৃত চিত্র
ছবি সংগৃহীত

বিশ্বজুড়ে জাতিসংঘের শান্তিরক্ষা মিশন সংকোচন, বাজেট হ্রাস এবং ভূরাজনৈতিক পরিবর্তনের প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশের শান্তিরক্ষী সদস্যসংখ্যা কমে যাওয়ার বিষয়টি নিয়ে বিভ্রান্তিকর তথ্য ছড়ানোর অভিযোগ উঠেছে। সম্প্রতি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে, বিশেষ করে ‘নিউইয়র্ক বাংলা লাইফ’ ইউটিউব চ্যানেলে প্রকাশিত শেখ হাসিনার কথিত ভিডিও ও অডিও বার্তায় বাংলাদেশ সেনাবাহিনী এবং দেশের সামগ্রিক পরিস্থিতি নিয়ে বিভিন্ন দাবি করা হয়। সংশ্লিষ্ট মহলের মতে, এসব বক্তব্যের মাধ্যমে বাস্তব পরিস্থিতি সম্পর্কে বিভ্রান্তি সৃষ্টি এবং সেনাবাহিনীকে উসকানি দেওয়ার চেষ্টা করা হচ্ছে।

ভিডিও বার্তার শেষাংশে ‘প্রতিটি ফোঁটা রক্তের হিসাব নেওয়ার’ হুঁশিয়ারি দেওয়া হয়। বিশ্লেষকদের মতে, এ ধরনের বক্তব্য দেশের বর্তমান স্থিতিশীলতা বিনষ্টের অপচেষ্টা হতে পারে। ছাত্র-জনতার আন্দোলনে সহস্রাধিক মানুষের মৃত্যুর ঘটনায় তৎকালীন সরকারের দায়ের বিষয়টি সামনে রেখে তারা বলছেন, এ ধরনের বক্তব্যের মাধ্যমে রাজনৈতিক দায় এড়ানোর পাশাপাশি প্রবাসীদের আবেগকে কাজে লাগিয়ে দেশে অস্থিতিশীলতা সৃষ্টির চেষ্টা করা হচ্ছে।

তবে এসব বক্তব্যের বিপরীতে জাতিসংঘের শান্তিরক্ষা মিশনে বাংলাদেশের অবস্থান, বিভিন্ন দেশে দ্বিপাক্ষিক সামরিক সহযোগিতা এবং নতুন জনবল নিয়োগের যে তথ্য রয়েছে, তাতে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশের সামরিক সম্পৃক্ততার একটি ভিন্ন চিত্র পাওয়া যায়।

বাংলাদেশের শান্তিরক্ষী সদস্যসংখ্যা কমে যাওয়াকে কোনো অভ্যন্তরীণ ব্যর্থতা বা আন্তর্জাতিক গ্রহণযোগ্যতা হারানোর প্রমাণ হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। ২০১৮ সালের পর থেকে বিশ্বব্যাপী জাতিসংঘের শান্তিরক্ষা কার্যক্রম ক্রমাগত সংকুচিত হচ্ছে। ভূরাজনৈতিক পরিবর্তন, বিভিন্ন অঞ্চলে সংঘাতের ধরন পরিবর্তন এবং জাতিসংঘের নজিরবিহীন বাজেট সংকটের কারণে একাধিক মিশনে জনবল ও কার্যক্রম কমানো হচ্ছে। বিশেষ করে জাতিসংঘের প্রধান অর্থায়নকারী দেশগুলোর মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের নীতিগত পরিবর্তন, অর্থায়নে অনিশ্চয়তা এবং বকেয়া অর্থের কারণে শান্তিরক্ষা কার্যক্রমে আর্থিক চাপ বেড়েছে। এর প্রভাবে ২০২৬-২৭ অর্থবছরে জাতিসংঘের শান্তিরক্ষা বাজেট ১০ শতাংশের বেশি কমিয়ে ৫ দশমিক ১ বিলিয়ন ডলারে নামিয়ে আনা হয়েছে।

এই আর্থিক সংকটের কারণে বিশ্বব্যাপী জাতিসংঘের শান্তিরক্ষী সদস্যসংখ্যা প্রায় ২৫ শতাংশ পর্যন্ত কমানো হয়েছে বলে জানা গেছে। পশ্চিম আফ্রিকার মালিতে মিশন বন্ধের পর গত ১ নভেম্বর ২০২৬ তারিখে পশ্চিম সাহারায় ৩৫ বছর ধরে চলা মিশনও বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। বিশ্বব্যাপী শান্তিরক্ষা মিশনের পরিধি কমলেও বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক অঙ্গনে নিজেদের অবস্থান ধরে রেখেছে। নিয়মিতভাবে শীর্ষ শান্তিরক্ষী প্রেরণকারী দেশগুলোর তালিকায় বাংলাদেশ প্রথম থেকে চতুর্থ অবস্থানের মধ্যে রয়েছে।

সংশ্লিষ্ট সূত্রের তথ্যানুযায়ী, জাতিসংঘের সামগ্রিক মিশন সংকোচনের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে বিভিন্ন দেশের শান্তিরক্ষী সদস্যসংখ্যা কমেছে। ফলে বাংলাদেশের সদস্যসংখ্যা হ্রাসকে এককভাবে দেশের কূটনৈতিক ব্যর্থতা বা সেনাবাহিনীর আন্তর্জাতিক গ্রহণযোগ্যতা কমে যাওয়ার প্রমাণ হিসেবে দেখানো সঠিক নয়। আনুপাতিক অংশগ্রহণের ক্ষেত্রে অনেক দেশের তুলনায় বাংলাদেশের অবস্থান সন্তোষজনক।

জাতিসংঘের নিয়মিত শান্তিরক্ষা মিশনের বাইরেও বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর ৩ হাজার ৪০০-এর বেশি সদস্য বিভিন্ন দেশে দ্বিপাক্ষিক ও হাইব্রিড সামরিক কার্যক্রমে নিয়োজিত আছেন বলে জানা যায়। এ ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য দুটি উদ্যোগ হলো—
অপারেশন কুয়েত পুনর্গঠন (ওকেপি): কুয়েতে পরিচালিত এই কার্যক্রমে মোট ৫ হাজার ৭৬৮ জন সদস্য রয়েছেন।
গ্লোবাল সিকিউরিটি ফোর্স (জিএসএফ): ২০২৬ সালের অক্টোবর থেকে ২০২৭ সালের জানুয়ারি পর্যন্ত হাইতিতে মোট ১ হাজার ৪০০ জন সদস্য সংযুক্ত করার প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে। এরই মধ্যে ২৩০ সদস্যের একটি অগ্রগামী দল হাইতিতে অবস্থান করছে।

কাতারের সঙ্গে সামরিক সহযোগিতায় বড় সম্প্রসারণ-
বাংলাদেশের সশস্ত্র বাহিনীর আন্তর্জাতিক গ্রহণযোগ্যতা ও দ্বিপাক্ষিক সামরিক সহযোগিতা কমে যাওয়ার পরিবর্তে সম্প্রসারিত হচ্ছে। বিশেষ করে কাতারের সঙ্গে সামরিক সহযোগিতার ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতির লক্ষ্য করা গেছে। ৩০ সেপ্টেম্বর ২০২৬ তারিখের অফিশিয়াল রেকর্ড অনুযায়ী, কাতারে কর্মরত বাংলাদেশ মিলিটারি কন্টিনজেন্টের (বিএমসি) মোট জনবল ৫ হাজার ৭৬৭ জনে উন্নীত হয়েছে। এছাড়া কাতারের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের (এমওআই) অধীন কোস্ট অ্যান্ড বর্ডার সিকিউরিটিতে (কিউসিবিএস) বর্তমানে বাংলাদেশ নৌবাহিনীর ১৩৭ জন সদস্য কর্মরত আছেন। আগামী ৫ নভেম্বর আরও ২৪ জন নৌবাহিনীর সদস্য সেখানে যোগ দেওয়ার কথা রয়েছে। ফলে এ বিভাগে বাংলাদেশের মোট মোতায়েন করা সদস্যসংখ্যা দাঁড়াবে ১৬১ জনে।

এছাড়া কাতার সশস্ত্র বাহিনীর বিভিন্ন পর্যায়ে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী, নৌবাহিনী ও বিমানবাহিনীর সদস্যদের জন্য আরও ৫০০টি পদে নিয়োগপ্রক্রিয়া চলমান রয়েছে। প্রয়োজনীয় আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন হলে আগামী চার থেকে পাঁচ মাসের মধ্যে এসব সদস্যকে কাতারে মোতায়েন করা হবে বলে জানা গেছে।

মধ্যপ্রাচ্যে বাংলাদেশের সামরিক সহযোগিতা সম্প্রসারণের অংশ হিসেবে সৌদি আরবেও নতুন মোতায়েনের তথ্য জানা গেছে। পরিকল্পনা অনুযায়ী, সেখানে দুটি ফ্রিগেট এবং একটি এয়ার ডিফেন্স (এডি) ব্যাটারিসহ মোট ১ হাজার নতুন সদস্য মোতায়েন করা হবে। এ উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে মধ্যপ্রাচ্যে বাংলাদেশের সামরিক সহযোগিতার পরিধি আরও বিস্তৃত হবে।

উল্লিখিত তথ্য-উপাত্ত বিশ্লেষণে দেখা যায়, জাতিসংঘের শান্তিরক্ষা মিশন সংকোচনের পাশাপাশি বিভিন্ন দেশের সঙ্গে বাংলাদেশের দ্বিপাক্ষিক সামরিক সহযোগিতার ক্ষেত্রেও নতুন সম্ভাবনা তৈরি হচ্ছে। বিশেষ করে কাতার, কুয়েত ও সৌদি আরবে বাংলাদেশের সামরিক সদস্যদের অংশগ্রহণ এবং নতুন নিয়োগের উদ্যোগ আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশের সশস্ত্র বাহিনীর সম্পৃক্ততার বিস্তৃত চিত্র তুলে ধরে।

সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, বৈশ্বিক অর্থনৈতিক ও ভূরাজনৈতিক পরিবর্তনের কারণে জাতিসংঘের শান্তিরক্ষা মিশনে সদস্যসংখ্যা কমলেও বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক সামরিক সহযোগিতা থেমে নেই। মধ্যপ্রাচ্যসহ বিভিন্ন অঞ্চলে দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক সম্প্রসারণের মাধ্যমে নতুন কর্মসংস্থান ও বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের সুযোগ সৃষ্টি হচ্ছে।

সব মিলিয়ে, বাংলাদেশের সশস্ত্র বাহিনীর আন্তর্জাতিক গ্রহণযোগ্যতা সংকটে পড়েছে—এমন দাবির সঙ্গে উল্লিখিত তথ্য-উপাত্তের সামঞ্জস্য পাওয়া যায় না। জাতিসংঘের মিশন সংকোচনের বৈশ্বিক বাস্তবতা এবং বিভিন্ন দেশের সঙ্গে বাংলাদেশের দ্বিপাক্ষিক সামরিক সহযোগিতার সম্প্রসারণ বিবেচনায় না নিয়ে শুধু শান্তিরক্ষী সদস্যসংখ্যার পরিবর্তন দিয়ে দেশের সামরিক সক্ষমতা বা আন্তর্জাতিক অবস্থান মূল্যায়ন করা বিভ্রান্তিকর।

ডেইলি-বাংলাদেশ/এসআই
লিংক সফলভাবে কপি হয়েছে!