সৌদিতে নিরাপত্তা উদ্বেগ, বিপাকে বাংলাদেশগামী ও প্রবাসী যাত্রীরা
ইয়েমেনের ইরান-সমর্থিত হুতি বিদ্রোহীদের ধারাবাহিক ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলায় সৌদি আরবের রাজধানী রিয়াদে নিরাপত্তা পরিস্থিতির অবনতি হয়েছে। হামলার পর কিং খালিদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের কার্যক্রম বন্ধ থাকায় আন্তর্জাতিক বিমান চলাচলে বড় ধরনের বিপর্যয় দেখা দিয়েছে।
এর প্রভাব পড়েছে ঢাকার হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরেও।
বাংলাদেশ বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের (বেবিচক) তথ্য অনুযায়ী, শনিবার রাত থেকে মঙ্গলবার (১৩ অক্টোবর) রাত পর্যন্ত ঢাকা থেকে সরাসরি ও ট্রানজিট রুটের মোট ৮২টি ফ্লাইট বাতিল বা স্থগিত হয়েছে। এতে ভোগান্তিতে পড়েছেন ১৩ হাজার ৭১ জন যাত্রী। ক্ষতিগ্রস্ত ফ্লাইটগুলোর মধ্যে ৩২টি সরাসরি এবং ৫০টি ট্রানজিট ফ্লাইট।
ফ্লাইট বাতিলের কারণে সবচেয়ে বেশি বিপাকে পড়েছেন সৌদি আরবপ্রবাসী বাংলাদেশিরা। ছুটি শেষে কর্মস্থলে যোগ দিতে দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে ঢাকায় এসে অনেকেই জানতে পারছেন তাঁদের নির্ধারিত ফ্লাইট বাতিল হয়েছে।
চাঁপাইনবাবগঞ্জের সৌদিপ্রবাসী মো. মাহিরুল জানান, দুই মাসের ছুটিতে দেশে ফেরার সময়ই তিনি ফিরতি টিকিট সংগ্রহ করেছিলেন। গত রোববার রিয়াদে যাওয়ার কথা থাকলেও বিমানবন্দরে এসে ফ্লাইট বন্ধের খবর পান।
তিনি বলেন, আগে থেকে ফ্লাইট বাতিলের বিষয়টি জানানো হলে এমন ভোগান্তিতে পড়তে হতো না।
পরে ঢাকা থেকে দুবাই হয়ে সৌদি আরবের আল কাসিমে যাওয়ার জন্য অন্য একটি এয়ারলাইনসের টিকিট সংগ্রহ করেন মাহিরুল। তবে ভিসার মেয়াদ প্রায় শেষ হওয়ায় সময়মতো কর্মস্থলে পৌঁছাতে পারবেন কি না, তা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেন তিনি।
নিরাপত্তাঝুঁকির কারণে আগামী ১৭ অক্টোবর পর্যন্ত ঢাকা থেকে রিয়াদ ও দাম্মামগামী সব ফ্লাইট স্থগিত করেছে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনস।
মঙ্গলবার প্রকাশিত এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে সংস্থাটি জানায়, যাত্রীদের নিরাপত্তার স্বার্থে এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। পরিস্থিতি বিবেচনায় পরবর্তী ফ্লাইটসূচি জানানো হবে।
জরুরি প্রয়োজনে সৌদি আরবে যাতায়াতের জন্য জেদ্দা ও মদিনা আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর ব্যবহারের পরামর্শ দিয়েছে বিমান। পাশাপাশি টিকিট ও ভ্রমণসংক্রান্ত তথ্যের জন্য নিকটস্থ বিক্রয়কেন্দ্রে যোগাযোগ করতে বলা হয়েছে।
সৌদি আরবের কিং খালিদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে একাধিক হামলার ঘটনায় প্রাণহানি ও বহু মানুষ আহত হওয়ার খবর পাওয়া গেছে।
আন্তর্জাতিক সংবাদ সংস্থা এপির প্রতিবেদন অনুযায়ী, শনিবারের ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় ১২ জন নিহত এবং তিন শতাধিক মানুষ আহত হন। পরদিন রোববার বিমানবন্দরের যাত্রী টার্মিনালে আরেকটি হামলায় একজন পাকিস্তানি নাগরিক নিহত ও ১১ জন আহত হন।
হুতি বিদ্রোহীরা এসব হামলার দায় স্বীকার করেছে। ধারাবাহিক হামলার পর বিমানবন্দরের কার্যক্রম স্থগিত এবং বিভিন্ন এয়ারলাইনসের ফ্লাইটসূচিতে পরিবর্তন আনা হয়েছে।
হামলার পর সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমানের নিরাপত্তা নিয়েও উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
মার্কিন সংবাদমাধ্যম দ্য ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল-এর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, নিরাপত্তাঝুঁকির মধ্যে যুবরাজ কঠোর নিরাপত্তাবেষ্টিত প্রাসাদগুলো থেকে কার্যক্রম পরিচালনা করছেন। তাঁকে ঘিরে নিরাপত্তাব্যবস্থাও জোরদার করা হয়েছে।
সৌদি আরব ও হুতি বিদ্রোহীদের মধ্যে চলমান সংঘাত নতুন করে তীব্র হয়েছে। রিয়াদে হামলার পাশাপাশি সৌদি বাহিনীর পক্ষ থেকেও হুতি-নিয়ন্ত্রিত এলাকায় পাল্টা সামরিক অভিযান চালানোর খবর পাওয়া গেছে।
হুতি বিদ্রোহীদের দাবি, সৌদি আরবের বিভিন্ন সামরিক ও গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা লক্ষ্য করে তারা হামলা চালিয়েছে। অন্যদিকে সৌদি নেতৃত্বাধীন বাহিনী একাধিক ড্রোন প্রতিহত করার দাবি করেছে।
পাল্টাপাল্টি হামলায় মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তা পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠেছে। এর প্রভাব পড়ছে আন্তর্জাতিক বিমান চলাচল, ব্যবসা-বাণিজ্য এবং আঞ্চলিক স্থিতিশীলতার ওপর।
ফ্লাইট বাতিল, বিলম্ব কিংবা সময়সূচি পরিবর্তনের কারণে যাত্রীদের ভোগান্তি কমাতে সংশ্লিষ্ট এয়ারলাইনসগুলোকে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দিয়েছে বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষ।
নির্দেশনা অনুযায়ী, ফ্লাইটের পরিবর্তিত সময়সূচি সম্পর্কে যাত্রীদের এসএমএস, ফোনকলসহ কার্যকর যোগাযোগমাধ্যমে আগাম জানাতে হবে।
এদিকে পরিস্থিতি স্বাভাবিক না হওয়া পর্যন্ত সৌদিগামী যাত্রীদের বিমানবন্দরে রওনা দেওয়ার আগে সংশ্লিষ্ট এয়ারলাইনসের সঙ্গে যোগাযোগ করে ফ্লাইটের সর্বশেষ অবস্থা নিশ্চিত করার পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে।