বনলতা সেনের নাটোরে স্বস্তির আলো
বাংলা সাহিত্যের প্রখ্যাত কবি জীবনানন্দ দাশের ‘বনলতা সেন’ কবিতার সঙ্গে নাটোরের নাম গভীরভাবে জড়িয়ে আছে। কাব্যপ্রেমীদের কাছে নাটোর মানেই যেন সেই চিরচেনা বনলতা সেন। কবির ভাষায়, ‘পাখির নীড়ের মতো চোখ তুলে নাটোরের বনলতা সেন।’
এই নাটোর আবারও আলোচনায় এসেছে এক বিদেশি পর্যটকের ল্যাপটপ চুরির ঘটনাকে কেন্দ্র করে। গত কয়েক দিন ধরে আমি ঘটনাটির খবর অনুসরণ করছিলাম। অবশেষে ১২ অক্টোবর সকালে ল্যাপটপ উদ্ধারের খবর দেখে মনে স্বস্তি ফিরে পেলাম।
জার্মানি থেকে বাংলাদেশে বেড়াতে এসেছিল আঠারো বছর বয়সী তরুণ ক্রিল ল্যান্ডার। দেশের বিভিন্ন দর্শনীয় স্থান ঘুরে তার ভারত যাওয়ার পরিকল্পনা ছিল। সে জন্য নাটোর রেলওয়ে স্টেশনে এসেছিল। সেখান থেকে দর্শনা হয়ে ভারতে যাওয়ার কথা ছিল তার। কিন্তু নাটোর স্টেশনে ঘটে যায় অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা।
রেলকর্মী পরিচয় দেওয়া এক প্রতারকের কাছে ব্যাগ রেখে এটিএম বুথে টাকা তুলতে গিয়েছিল সে। ফিরে এসে দেখে, লোকটিও নেই, ব্যাগটিও নেই।
- ব্যাগে ছিল তার প্রিয় ল্যাপটপ ও ক্যামেরা। ল্যাপটপে সংরক্ষিত ছিল গুরুত্বপূর্ণ তথ্য ও প্রয়োজনীয় নথিপত্র। পড়াশোনার পাশাপাশি খণ্ডকালীন কাজ করে সে ল্যাপটপটি কিনেছিল। তাই সেটি হারানো তার জন্য কেবল আর্থিক ক্ষতি ছিল না। এর সঙ্গে জড়িয়ে ছিল তার শ্রম, প্রয়োজন এবং ব্যক্তিগত স্মৃতি।
ঘটনার পর নাটোর সদর থানায় গিয়ে পুলিশের কাছে অভিযোগ জানায় সে। অসহায় অবস্থায় তার কান্নার দৃশ্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। সেই দৃশ্য আমাকে গভীরভাবে নাড়া দিয়েছিল।
বিদেশের মাটিতে নিজের প্রয়োজনীয় জিনিস হারালে কী অসহায় লাগতে পারে, তার অভিজ্ঞতা আমারও আছে। এ বছরের মে মাসে আমি যুক্তরাষ্ট্রে ছেলের কাছে গিয়েছিলাম। দেশে ফেরার দিন নিউইয়র্কের ম্যানহাটনের ডিল্যান্সি স্ট্রিট সাবওয়ে স্টেশনে আমার পিঠে ঝোলানো ব্যাগটি হারিয়ে ফেলি। আমরা জেএফকে বিমানবন্দরের উদ্দেশে ট্রেনে উঠেছিলাম। কিছুক্ষণ পর ছেলের বউ খেয়াল করল, আমার পিঠে ব্যাগ নেই। তার প্রশ্ন শুনে আমার ভেতরটা হঠাৎ শূন্য হয়ে গেল।
ব্যাগটিতে আমার পাসপোর্ট ছিল। সঙ্গে ছিল ল্যাপটপও। সেই ল্যাপটপে জমা ছিল আমার লেখালেখির নানা উপকরণ। ছিল সম্পন্ন ও অসম্পূর্ণ লেখা। ছিল কয়েকটি অপ্রকাশিত পাণ্ডুলিপিও। কিন্তু ব্যাগ হারানোর মুহূর্তে এসবের কথা ভাবতে পারিনি। আমার মাথায় তখন একটাই চিন্তা ঘুরছিল। পাসপোর্ট ছাড়া দেশে ফিরব কীভাবে? ট্রেন তখন চলছিল। কী করব, বুঝতে পারছিলাম না। অসহায় লাগছিল ভীষণ। মনে হচ্ছিল, সামনে যেন অন্ধকার ছাড়া আর কিছুই নেই।
পরের স্টেশনে নেমে আমার ছেলে হারানো ব্যাগের খোঁজে যোগাযোগের চেষ্টা করছিল। সে 'লস্ট প্রপার্টি' বিভাগে কথা বলার চেষ্টা করেও তাৎক্ষণিকভাবে সংযোগ পাচ্ছিল না। এদিকে ছেলের বউ আমাকে নিয়ে আবার আগের স্টেশনে ফিরে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিল।
আমরা দুজন অন্য ট্রেনে সেখানে পৌঁছালাম। তারপর দৌড়ে গেলাম সেই বেঞ্চের কাছে, যেখানে ব্যাগটি রেখেছিলাম। সৌভাগ্যক্রমে ব্যাগটি ঠিক সেখানেই ছিল। ছেলের বউ দ্রুত সেটি তুলে নিল। ব্যাগ ফিরে পেয়ে মনে হলো, বুকের ওপর থেকে বিশাল একটি পাথর নেমে গেছে।
আমার সঙ্গে স্ত্রী, ছেলে ও ছেলের বউ ছিল। তাদের উপস্থিতি আমাকে সাহস দিয়েছিল। কিন্তু ক্রিল ছিল বিদেশের মাটিতে একা। তার অসহায়ত্ব তাই আমি কিছুটা হলেও অনুভব করতে পারি। আমার ব্যাগ কেউ চুরি করেনি। অসাবধানতায় ফেলে এসেছিলাম। কিন্তু ক্রিলের ক্ষেত্রে ঘটেছে প্রতারণা।
একজন লোক নিজেকে রেলকর্মী পরিচয় দিয়ে তার বিশ্বাস অর্জন করেছে। সেই বিশ্বাসের সুযোগ নিয়ে ব্যাগ চুরি করেছে। ঘটনাটি আমাকে কষ্ট দিয়েছে। কারণ, একজন পর্যটকের সঙ্গে এমন আচরণ আমাদের দেশের আতিথেয়তার ভাবমূর্তিকে প্রশ্নের মুখে ফেলে।
তবে এই ঘটনার আরেকটি দিকও আমাকে আশাবাদী করেছে। ক্রিলের কান্নার ভিডিও দেখে বহু মানুষ তার পাশে দাঁড়িয়েছেন। সাংবাদিকেরা ছুটে গেছেন। তাকে সাহস দিয়েছেন, ভরসা দিয়েছেন।
পুলিশও অভিযোগ পাওয়ার পর তদন্ত শুরু করেছে। সিসিটিভি ফুটেজ পর্যালোচনা করে সন্দেহভাজন ব্যক্তির গতিবিধি বোঝার চেষ্টা করেছে। বিভিন্ন পুলিশ ইউনিট চুরি হওয়া মালামাল উদ্ধারে অভিযান চালিয়েছে। প্রথম দিকে ল্যাপটপের অবস্থান শনাক্ত করা নিয়েও নানা জটিলতা তৈরি হয়েছিল। তবু চেষ্টা থেমে থাকেনি।
এদিকে ক্রিলের দুর্ভোগের খবর দেখে ঢাকার জিগাতলার বাসিন্দা মুক্তি মাহমুদ তার পাশে দাঁড়িয়েছেন। নিজের ছেলের কথা মনে করে তিনি তরুণ পর্যটককে একটি নতুন ম্যাকবুক উপহার দেন। ১০ অক্টোবর সন্ধ্যায় হাজারীবাগ থানায় পুলিশের উপস্থিতিতে তার হাতে উপহারটি তুলে দেওয়া হয়।
মানুষের বিপদে মানুষের পাশে দাঁড়ানোর এই দৃশ্য আমাকে মুগ্ধ করেছে। নতুন ল্যাপটপ পেয়ে ক্রিল কিছুটা স্বস্তি পেয়েছিল। তবে উপহার পাওয়া আর নিজের হারানো ল্যাপটপ ফিরে পাওয়া এক বিষয় নয়। তার পুরোনো ল্যাপটপে থাকা তথ্য ও স্মৃতি নতুন যন্ত্রে ফিরে আসার নিশ্চয়তা ছিল না।
অবশেষে ১১ অক্টোবর রাতে এলো স্বস্তির খবর। নাটোর শহরের নিচাবাজার এলাকা থেকে পুলিশ ক্রিলের চুরি হওয়া ল্যাপটপ উদ্ধার করেছে। ১২ অক্টোবর সকালে খবরটি দেখে আমি আনন্দিত হয়েছি। ক্রিলও উদ্ধারের খবরে উচ্ছ্বাস প্রকাশ করেছে। তার পরিকল্পনা ছিল ঢাকা ছেড়ে চলে যাওয়ার।
কিন্তু ল্যাপটপ ফিরে পাওয়ার খবর পেয়ে সে সেটি হাতে নিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়। লেখাটি শেষ করার সময় পর্যন্ত ল্যাপটপটি তার হাতে পৌঁছেছে কি না, তা নিশ্চিত হতে পারিনি। আইনগত কিছু বিষয়ে আছে। সম্ভবত আদালতের অনুমোদন লাগবে। তবে ল্যাপটপ উদ্ধারের খবরেই আমার মনে আশার আলো জ্বলেছে।
আমাদের পুলিশকে নিয়ে নানা সময়ে অনেক সমালোচনা হয়। কোথাও দায়িত্বে অবহেলা, কোথাও অনিয়ম, কোথাও মানুষের প্রত্যাশা পূরণে ব্যর্থতার অভিযোগ ওঠে। কিন্তু তাই বলে পুলিশের ভালো কাজের প্রশংসা করতে কার্পণ্য করা উচিত নয়।
একজন বিদেশি পর্যটকের চুরি হওয়া ল্যাপটপ উদ্ধার করা অবশ্যই প্রশংসনীয় কাজ। নাটোর সদর মডেল থানা পুলিশসহ সংশ্লিষ্ট সদস্যদের আমি ধন্যবাদ জানাই। এই সাফল্য প্রমাণ করে, আন্তরিকতা ও নিষ্ঠা থাকলে কঠিন পরিস্থিতিতেও ভালো ফল পাওয়া সম্ভব। দায়িত্ব পালনের এমন দৃষ্টান্ত আরও দেখতে চাই।
আমার কাছে ঘটনাটি কেবল একটি ল্যাপটপ উদ্ধারের গল্প নয়। এটি মানবিকতা, দায়িত্ববোধ এবং মানুষের প্রতি মানুষের সহমর্মিতার গল্প। মুক্তি মাহমুদের উপহার, সাংবাদিকদের সহযোগিতা এবং পুলিশের অভিযান একই সঙ্গে বাংলাদেশের কয়েকটি সুন্দর দিক তুলে ধরেছে। ক্রিল দেশে ফিরে নিশ্চয়ই এই অভিজ্ঞতার কথা বলবে।
তার মনে বাংলাদেশের মানুষের ভালোবাসা ও সহযোগিতার স্মৃতি জায়গা করে নেবে বলে আমি আশা করি। একই সঙ্গে আমি চাই, চুরির সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিকে আইনের আওতায় আনা হোক। পর্যটকের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা আমাদের সবার দায়িত্ব।
নাটোরের নাম শুনলে আমার মনে বনলতা সেনের কথা আসে। কবিতার সেই নাটোরের সঙ্গে এবার যুক্ত হলো এক তরুণ বিদেশি পর্যটকের দুঃখ, মানুষের সহমর্মিতা এবং পুলিশের সাফল্যের গল্প। প্রথমে যে ঘটনা বাংলাদেশের জন্য বিব্রতকর হয়ে উঠেছিল, তার শেষটা আশাব্যঞ্জক হয়েছে। আমি মনেপ্রাণে চেয়েছিলাম, ক্রিল যেন তার ল্যাপটপ ফিরে পায়। সেই চাওয়া পূরণের খবর পেয়ে সত্যিই স্বস্তি পেয়েছি।
আমার বিশ্বাস, নিজের জিনিস ফিরে পাওয়ার আনন্দের পাশাপাশি সে বাংলাদেশ থেকে নিয়ে যাবে মানুষের প্রতি মানুষের ভালোবাসার একটি স্মরণীয় অভিজ্ঞতা। বনলতা সেনের নাটোর তাই আমার কাছে আবারও মানবিকতার শহর হয়ে উঠল।
লেখক: আবদুল হামিদ মাহবুব, সিনিয়র সাংবাদিক ও শিশুসাহিত্যিক। সাবেক সভাপতি মৌলভীবাজার প্রেসক্লাব ও যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক, মৌলভীবাজার বিএনএসবি চক্ষু হাসপাতাল।