অপরাধে জড়িত শিশুদের ৩৩ শতাংশের বিরুদ্ধে হত্যা মামলা: গবেষণা
দেশে অপরাধে জড়িয়ে পড়া শিশুদের একটি বড় অংশের বিরুদ্ধে হত্যা, ধর্ষণ, চুরি, মাদক ও অপহরণের মতো গুরুতর অপরাধের অভিযোগ রয়েছে। পুলিশ স্টাফ কলেজের (পিএসসি) এক গবেষণায় দেখা গেছে, অপরাধে জড়িত শিশুদের মধ্যে ৩২ দশমিক ৯২ শতাংশ হত্যা মামলার আসামি। গবেষণায় শিশুদের অপরাধে জড়িয়ে পড়ার পেছনে বন্ধুমহলের প্রভাব, দারিদ্র্য, পারিবারিক অস্থিতিশীলতা, মাদকের সংস্পর্শ ও অভিভাবকের নজরদারির ঘাটতিকে গুরুত্বপূর্ণ কারণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।
‘সোশিওইকোনমিক ডিটারমিন্যান্টস অব চিলড্রেন ইন কনফ্লিক্ট উইথ দ্য ল ইন বাংলাদেশ: আ ক্রিমিনোলজিক্যাল অ্যানালাইসিস’ শীর্ষক গবেষণাটি পিএসসি জার্নালের জুলাই-ডিসেম্বর ২০২৫ সংখ্যায় প্রকাশিত হয়। গবেষণাটি করেছেন প্রতিষ্ঠানটির গবেষণা ও প্রকাশনা বিভাগের পরিচালক মোহাম্মদ কামরুজ্জামান ও রামন চন্দ্র তালুকদার। এ নিয়ে একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে বণিক বার্তা।
গবেষণায় আট বিভাগের ১৬০টি থানার মামলা পর্যালোচনা করা হয়েছে। পাশাপাশি গাজীপুরের দুটি ও যশোরের একটি সরকারি শিশু উন্নয়ন কেন্দ্রের ৪০৪ শিশু এবং তাদের ১৫৬ অভিভাবকের সাক্ষাৎকার নেওয়া হয়।
গবেষণার তথ্য অনুযায়ী, অপরাধে জড়িত শিশুদের মধ্যে ৩২ দশমিক ৯২ শতাংশ হত্যা মামলার আসামি। ধর্ষণ, ধর্ষণে সহায়তা বা প্ররোচনার মামলায় আসামি ১৬ দশমিক ৮৩ শতাংশ শিশু। এ ছাড়া চুরির অভিযোগ রয়েছে ১৫ দশমিক ৮৪ শতাংশের বিরুদ্ধে, মাদক ব্যবহারের অভিযোগ ১০ দশমিক ৯৭ শতাংশের বিরুদ্ধে, অপহরণের অভিযোগ ১০ দশমিক ৪৫ শতাংশের বিরুদ্ধে এবং উত্ত্যক্ত করার অভিযোগ রয়েছে ৯ দশমিক ৬১ শতাংশের বিরুদ্ধে।
গবেষণায় দেখা গেছে, অপরাধ সংঘটনের সময় ৫২ দশমিক ৯৭ শতাংশ শিশু অন্য কারও সঙ্গে ছিল। তাদের মধ্যে ৮৬ দশমিক ৯২ শতাংশের সঙ্গী ছিল বন্ধু। এসব বন্ধুত্বের গড় মেয়াদ আট বছর।
গবেষকদের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, দীর্ঘদিনের বন্ধুত্ব, সমবয়সীদের চাপ এবং কিশোর গ্যাংয়ের প্রভাব শিশুদের অপরাধে জড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি বাড়াতে পারে।
গবেষণায় অন্তর্ভুক্ত শিশুদের ৪৪ দশমিক ৬ শতাংশের পরিবারের আয় ছিল ব্যয়ের তুলনায় কম। এসব পরিবারের গড় মাসিক আয় ১৯ হাজার ২৭৫ টাকা। এ ছাড়া ১৭ দশমিক ৮ শতাংশ শিশুর পরিবারের কোনো সদস্যের বিরুদ্ধে ফৌজদারি মামলা রয়েছে। এসব পরিবারের অভিযুক্ত সদস্যদের মধ্যে বাবার সংখ্যা সবচেয়ে বেশি।
গবেষণায় আরও দেখা যায়, ৩৩ দশমিক ৩৩ শতাংশ শিশু দীর্ঘ সময় ঘরের বাইরে কাটায়। তাদের বাইরে থাকার গড় সময় প্রায় আট ঘণ্টা। গবেষকদের মতে, পারিবারিক তদারকির অভাব, শিক্ষার সঙ্গে বিচ্ছিন্নতা এবং অনিয়ন্ত্রিত বন্ধুমহলের সংস্পর্শ শিশুদের অপরাধে জড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি বাড়াতে পারে।
শিশু-কিশোরদের অপরাধে জড়িয়ে পড়ার বিষয়টিকে অশনিসংকেত হিসেবে দেখছেন সুশাসনের জন্য নাগরিকের (সুজন) সম্পাদক ড. বদিউল আলম মজুমদার। তিনি বলেন, সামাজিক, পারিবারিক ও মনস্তাত্ত্বিক কারণ চিহ্নিত করে প্রতিরোধমূলক উদ্যোগ নিতে হবে। পাশাপাশি কাউন্সেলিং, পারিবারিক তত্ত্বাবধান, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানভিত্তিক সচেতনতা এবং পুনর্বাসনে গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন।
শিশু সুরক্ষা নিয়ে কাজ করা বিজন চৌধুরী বলেন, মানসম্মত শিক্ষার সুযোগের অভাব, দারিদ্র্য ও জীবিকার তাগিদে শিশুশ্রমে যুক্ত হওয়া অনেক শিশুকে ঝুঁকির মধ্যে ফেলে। অপরাধী চক্রের সদস্যরা শিশুদের মাদকাসক্ত করে বিভিন্ন অপরাধে ব্যবহার করতে পারে। এ পরিস্থিতি মোকাবিলায় ঝুঁকিতে থাকা শিশুদের নিরাপদ আশ্রয়, চিকিৎসা, পুনর্বাসন এবং শিক্ষায় ফিরিয়ে আনার ব্যবস্থা করতে হবে।
মানবাধিকারকর্মী ও সাবেক গুম কমিশনের সদস্য নূর খান লিটন বলেন, শিশুদের জিজ্ঞাসাবাদের ক্ষেত্রে তাদের বয়স ও মানসিক পরিপক্বতা বিবেচনায় নেওয়া জরুরি। প্রাপ্তবয়স্কদের মতো পদ্ধতিতে জিজ্ঞাসাবাদ বা বলপ্রয়োগ শিশুর মনে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। এতে সংশোধনের পরিবর্তে অপরাধপ্রবণতা বেড়ে যাওয়ার ঝুঁকি থাকে।
গবেষণার তথ্য ও বিশেষজ্ঞদের মতামত বলছে, শিশুদের অপরাধ থেকে দূরে রাখতে শুধু আইন প্রয়োগ নয়, বরং পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও সমাজের সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন। ঝুঁকিতে থাকা শিশুদের শনাক্ত করে সময়মতো সহায়তা, মানসিক পরিচর্যা, শিক্ষা ও পুনর্বাসনের সুযোগ নিশ্চিত করা গেলে তাদের অপরাধের পথে যাওয়া ঠেকানো সহজ হতে পারে।