ঢাকা,  মঙ্গলবার   ০৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ২৩ ভাদ্র ১৪৩৩

Advertisement
[ সাক্ষাৎকার ]

ভেড়ার মাংসের পুষ্টিগুণ গরু বা ছাগলের চেয়ে বেশি

আবুল বাশার মিরাজ, বাকৃবি
প্রকাশিত: ১৭:২১, ৩ ফেব্রুয়ারি ২০২৪
ভেড়ার মাংসের পুষ্টিগুণ গরু বা ছাগলের চেয়ে বেশি
ছবি: ডেইলি বাংলাদেশ

গরু বা ছাগলের মাংসের চেয়ে ভেড়ার মাংসের পুষ্টিগুণ অনেক বেশি। গবেষণায় এমন তথ্যগুলো পেয়েছেন বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের (বাকৃবি) একদল গবেষক। ‘ভেড়ার মাংস জনপ্রিয়করণ’ শীর্ষক ঐ গবেষণার প্রধান গবেষক ছিলেন অধ্যাপক ড. সৈয়দ মোহাম্মদ এহসানুর রহমান। তার সঙ্গে কথা বলে ভেড়া পালন, ভেড়ার মাংসে পুষ্টিগুণ বেশি হওয়ার কারণসহ নানা বিষয়ে আদ্যোপান্ত জানার চেষ্টা করেছেন বাকৃবি প্রতিনিধি আবুল বাশার মিরাজ

ডেইলি বাংলাদেশ: দেশে বর্তমানে গবাদি পশুর সংখ্যা কতো? 

ড. সৈয়দ মোহাম্মদ এহসানুর রহমান: দেশে গবাদিপশুর সংখ্যা প্রতিনিয়ত বাড়ছে। আমাদের দেশে গবাদি পশু বলতে প্রধানত গরু, ছাগল ও ভেড়াকেই বুঝি। প্রাণিসম্পদ অধিদফতরের হিসেব অনুযায়ী, দেশের বর্তমানে গরুর সংখ্যা ২৫০ লাখ, ছাগলের সংখ্যা ২৭০ লাখ এবং ভেড়ার সংখ্যা মাত্র ৩৮ লাখ। 

Advertisement

ডেইলি বাংলাদেশ: ভেড়ার সংখ্যা এত কম হওয়ার কারণ কী?

ড. সৈয়দ মোহাম্মদ এহসানুর রহমান: বাংলাদেশের মানুষের ক্ষেত্রে ভেড়ার মাংস খাওয়ার অনীহার কারণেই মূলত ভেড়ার সংখ্যা কম। আমাদের দেশে ভেড়ার মাংস খাওয়া নিয়ে কিছু ভ্রান্ত ধারণা রয়েছে, যদিও সেগুলোর কোনটিও সত্যি নয়। এগুলো প্রচলিত ভ্রান্ত ধারণা দূরীভূত হলে ভেড়ার মাংস খাওয়ার চাহিদা বেশি হতো। যখন অটোমেটিকালি মানুষ ভেড়া পালন করত, সংখ্যাটি অনেক বেড়ে যেত।

ডেইলি বাংলাদেশ: ভেড়ার মাংস খাওয়া নিয়ে বাংলাদেশের মানুষের মধ্যে ভ্রান্ত ধারণা আছে, সে বিষয়ে যদি কিছু বলতেন?

ড. সৈয়দ মোহাম্মদ এহসানুর রহমান: চমৎকার একটি প্রশ্ন করেছেন। এটিই সত্য বাংলাদেশের মানুষের মধ্যে এখনো ভেড়ার মাংস খাওয়া নিয়ে কিছু অসত্য তথ্য ও ভ্রান্ত ধারণা প্রচলিত আছে। মানুষেরা মনে করেন ভেড়ার মাংসে গন্ধ রয়েছে। আবার অনেকে মনে করেন ভেড়ার মাংস কম পুষ্টিগুণসম্পন্ন, মাংসে কোলেস্টেরলের পরিমাণ বেশি প্রভৃতি অসত্য বিষয়। এসব অপপ্রচারের কারণেই মানুষ ভেড়ার মাংস খাওয়ার প্রতি অনীহা সৃষ্টি হয়েছে। 

ডেইলি বাংলাদেশ: ভেড়ার জাতসমূহের বিষয়ে যদি কিছু বলতেন?  

ড. সৈয়দ মোহাম্মদ এহসানুর রহমান: বিশ্বে প্রায় ১ হাজারের অধিক জাতের ভেড়া আছে। এগুলোর মধ্যে বরুলা মেরিনো, আওয়াসী, বালুচা, ব্লু-ডু-মেইন, চিভয়েট, ছোট-নাগপুরী, ভালা, ডরসেট, হ্যাম্পশায়ার, লিংকন, মেরিনো, নেলোর, নীলগীরি, সাফক, মাটন-মেরিনো, টিউনিস ও আফ্রিকান ডোয়ার্ফ ইত্যাদি। জাতগুলোকে তিনভাগে ভাগ করা হয়েছে। যথা: পশম উৎপাদনকারী, মাংস এবং দুধ উৎপাদনকারী। ইংল্যান্ডের সাউথ ডাউন এবং নরফক জাতের ভেড়ার শকরায়ণে তৈরি সাফক জাতের ভেড়া সবচেয়ে বড় যার ওজন ২০০-৩৫০কেজি।

ডেইলি বাংলাদেশ: ভেড়ার মাংস জনপ্রিয় করতে আপনার গবেষণার বিষয়ে যদি বলতেন? 

ড. সৈয়দ মোহাম্মদ এহসানুর রহমান: বাংলাদেশের মানুষের ভেড়ার মাংস খাওয়ার বিষয়ে বেশকিছু ভ্রান্ত ধারণা রয়েছে। সেসব ভ্রান্ত ধারণাগুলোর কারণেই  মানুষ ভেড়ার মাংস খেতে চায় না। আমি গবেষণায় সেসব বিষয়গুলোর বৈজ্ঞানিকভাবে সত্যতা বের করার চেষ্টা করেছি। ‘পপুলাররাইজিং শিপ মিট (মাটন) ইন বাংলাদেশ’ শীর্ষক গবেষণায় দেখেছি- গরু, ছাগলের মাংসের চেয়ে ভেড়ার মাংস অনেক বেশি পুষ্টিগুণসম্পন্ন। অনেক সময় দেখা যায়, বাজারে ভেড়ার মাংসকে ছাগলের মাংস বলে চালিয়ে বিক্রি করে, কিন্তু ক্রেতা এটি বুঝতেই পারে না। আমরা চাই ভেড়ার মাংস, ভেড়ার মাংস বলেই বিক্রি হোক। এছাড়াও ভেড়ার কোন জাতগুলো দেশের খামারিরা লালন পালন করলে লাভবান হতে পারে, সে বিষয়ের উপরও আমরা এই গবেষণাটি করি। ভেড়ার মাংসকে সবোর কাছে জনপ্রিয় করতে যত ধরনের উদ্যোগ গ্রহণ করা যায়, সেগুলো আমরা করার চেষ্টা করছি। 

ডেইলি বাংলাদেশ: ভেড়া মাংস গরু বা ছাগলের মাংস থেকে বেশি পুষ্টিকর-  কীভাবে বুঝলেন? 

ড. সৈয়দ মোহাম্মদ এহসানুর রহমান: গুরু, ছাগল ও ভেড়ার মাংসকে ল্যাবরেটরিতে পরীক্ষা করে ও সেগুলোর তুলনা থেকে আমরা এটা নিশ্চিত হয়েছি। যারা গরু বা ছাগলের মাংস খেতে অভ্যস্ত এরকম বিভিন্ন শ্রেণি- পেশার মানুষের ওপর এর আমরা ভেড়ার মাংস খাওয়ানোর মাধ্যমে প্যানেল টেস্ট করেছি। প্রত্যেকের ভেড়ার মাংস খেয়ে বলেছেন, ভেড়ার মাংস বেশি সুস্বাদু, মাংস নরম, রসালো এবং সহজে হজমযোগ্য। এই মাংসে আমিষ ও ক্যালরির পরিমাণ বেশি। অপরদিকে ক্ষতিকারক চর্বি ও কোলেস্টেরলের পরিমাণ কম। ভেড়ার মাংসে সোডিয়াম, পটাশিয়াম, কপার, ফসফরাস ও ওমেগা অ্যাসিড থাকায় ক্যান্সার প্রতিরোধী এবং বাচ্চাদের শারীরিক ও মানসিক বৃদ্ধি, টিস্যু গঠন ও রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ায়।

ডেইলি বাংলাদেশ: ভেড়ার মাংস যে কারণে পুষ্টিগুণ বেশি হয়, সে বিষয়টি যদি বলতেন?

ড. সৈয়দ মোহাম্মদ এহসানুর রহমান: গবেষণায় আমরা দেখেছি, ভেড়া অত্যন্ত নিম্নমানের খাদ্য গ্রহণ করে তা উন্নতমানের প্রোটিনে পরিণত করে। এছাড়া ভেড়ার মাংসে রয়েছে তুলনামূলক বেশি কপার, ফসফরাস, সোডিয়াম এবং পটাসিয়াম, ভিটামিন এ, ই এবং সি যা এন্টিঅক্সিডেন্ট হিসেবে কাজ করে। আর এই এন্টিঅক্সিডেন্ট শিরা ও ধমনীতে কোলেস্টেরল জমাট হতে বাঁধা প্রদান করে। 

ডেইলি বাংলাদেশ: ছাগল ও গরুর খামারের তুলনায় ভেড়ার খামারের সংখ্যা বাড়ছে না কেন?

ড. সৈয়দ মোহাম্মদ এহসানুর রহমান: ভেড়ার তুলনায় ছাগলের মাংস, চামড়া ও গরুর বিষয়টি অধিকমাত্রায় বাণিজ্যিকভাবে প্রচারিত হওয়াতে ভেড়ার খামারের পরিমাণ বাড়েনি। অপরদিকে, ভেড়ার মাংস ও চামড়া বিক্রয়, পশমের মূল্যের লাভের ব্যাপারটি অনেক মানুষ জানেই না। সঠিক প্রচারণার অভাবে দেশে ভেড়া পালনের পরিমাণ কম। বিভিন্ন অনুষ্ঠানে (বিয়ে, জন্মদিন, মিলনমেলা) যদি ভেড়ার মাংস খাওয়ার প্রচলন চালু করা যায় তবে ভেড়ার মাংসের চাহিদা বাড়বে, তখন খামারিরাও বৃহৎ পরিসরে ভেড়ার খামার করতে এগিয়ে আসবে। 

ডেইলি বাংলাদেশ: ভেড়ার রোগ প্রতিরোধ, লালন পালনের বিষয়ে যদি কিছু বলতেন?

ড. সৈয়দ মোহাম্মদ এহসানুর রহমান: ভেড়ার রোগ ক্ষমতা এমনিতেই অনেক বেশি। খুব বেশি রোগ-বালাই হয় না বলেই চলে, মৃত্যুহারও কম। তবে অবশ্যই আমাদের কে রোগ-প্রতিরোধ ক্ষমতাসম্পন্ন ভালো জাতের ভেড়ার পালন করতে হবে। খামারসহ সব পর্যায়ে পরিষ্কার পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখা, টিকা প্রদান, সুষম ও নিয়মিতভাবে খাদ্য সরবরাহ, জৈব-নিরাপত্তাসহ সম্ভাব্য সব বিষয়ে পদক্ষেপ গ্রহণ করে লালনপালন করলে দ্রুত অনেক বেশি লাভবান হওয়া সম্ভব। 

ডেইলি বাংলাদেশ: ভেড়ার পশমও কাজে লাগানো যায়, যা ছাগল কিংবা গরুর ক্ষেত্রে সম্ভব নয়, সে বিষয়ে যদি কিছু বলতেন? 

ড. সৈয়দ মোহাম্মদ এহসানুর রহমান: ভেড়ার পশম থেকে সোয়েটার, চাদর, কার্পেট, ম্যাট প্রভৃতি বানানো যায়। এসব সামগ্রী বাজারজাত করতে পারলে দেশের অর্থনীতিতে নতুন ক্ষেত্র সৃষ্টি হবে। একদিকে দেশের একটি বিরাট অংশের শীত নিবারণ যেমন হবে তেমনি পশমের চাহিদা বৃদ্ধি পাওয়ায় আরো বেশি করে ভেড়া চাষে আগ্রহী হবেন খামারিরা। এতে করে মাংস ঘাটতি মেটানোসহ দারিদ্র বিমোচন এবং আত্মকর্মসংস্থানেও বিরাট ভূমিকা রাখবে।

ডেইলি-বাংলাদেশ/কেবি
ট্যাগ: বাকৃবি
লিংক সফলভাবে কপি হয়েছে!