যুক্তরাষ্ট্রে কি ফিরছে বাধ্যতামূলক সেনা নিয়োগ?
ইরানকে ঘিরে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে উত্তেজনা এবং সম্ভাব্য সামরিক সংঘাতের প্রেক্ষাপটে তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধের আশঙ্কা নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। এরই মধ্যে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্সের কয়েকটি পূর্বনির্ধারিত কর্মসূচি বাতিলের ঘটনায় নানা প্রশ্ন উঠেছে। সম্ভাব্য সংঘাত বিস্তৃত হলে যুক্তরাষ্ট্রের সাধারণ নাগরিকদেরও বাধ্যতামূলকভাবে সামরিক বাহিনীতে যোগ দিতে হতে পারে কি না, তা নিয়েও আলোচনা চলছে।
তবে যুক্তরাষ্ট্রে নতুন করে বাধ্যতামূলক সামরিক নিয়োগ বা ‘ড্রাফট’ চালুর কোনো সিদ্ধান্ত কিংবা পরিকল্পনার ইঙ্গিত এখন পর্যন্ত পাওয়া যায়নি।
সম্প্রতি এ বিষয়ে একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে দ্য ইকোনমিক টাইমস। এতে বলা হয়েছে, সপ্তাহান্তে আইওয়া ও কানসাসে নির্ধারিত নির্বাচনী সমাবেশ বাতিল করেছিলেন ট্রাম্প। একই সময়ে মিনেসোটার সেন্ট ক্লাউডে ভ্যান্সের ‘ওয়ার অন ফ্রড’ শীর্ষক সংবাদ সম্মেলনও বাতিল করা হয়।
তবে কর্মসূচি বাতিলের কারণ হিসেবে ইরান পরিস্থিতির কোনো সংশ্লিষ্টতা নিশ্চিত করা হয়নি। মার্কিন সংবাদমাধ্যমগুলোর প্রতিবেদন অনুযায়ী, ট্রাম্পের সমাবেশগুলো টেলিফোনের মাধ্যমে প্রচারণা চালানোর পরিকল্পনার অংশ হিসেবে বাতিল করা হয়েছিল। পরে আইওয়া ও কানসাসের সমাবেশ আবারও আয়োজনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। অন্যদিকে ভ্যান্সের মিনেসোটা সফর বাতিলের কারণও আনুষ্ঠানিকভাবে জানানো হয়নি।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইরানকে ঘিরে সংঘাত দীর্ঘস্থায়ী হলে তা যুক্তরাষ্ট্রের নিরাপত্তা ও সামরিক স্বার্থে বড় ধরনের প্রভাব ফেলতে পারে। মার্কিন সিনেটর ক্রিস মারফিও সংঘাত আরও বাড়লে মার্কিন সেনারা ঝুঁকির মুখে পড়তে পারেন বলে সতর্ক করেছেন।
যুদ্ধে কি ডাকা হতে পারে সাধারণ নাগরিকদের?
তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধের মতো বড় ধরনের সংঘাত তৈরি হলে স্বেচ্ছাসেবী সেনাদের পাশাপাশি সাধারণ নাগরিকদেরও সামরিক বাহিনীতে নিয়োগের প্রশ্ন সামনে আসতে পারে। স্বেচ্ছায় পর্যাপ্তসংখ্যক মানুষ সেনাবাহিনীতে যোগ না দিলে সরকার বাধ্যতামূলক সামরিক নিয়োগ বা ‘কনস্ক্রিপশন’ চালুর বিষয়টি বিবেচনা করতে পারে।
ভিয়েতনাম যুদ্ধের সময় যুক্তরাষ্ট্রে এ ধরনের ব্যবস্থা চালু ছিল। ১৯৬৯ সালে লটারি পদ্ধতিতে সেনা নিয়োগের ব্যবস্থা করা হয়। সে সময় ১৮ থেকে ২৬ বছর বয়সী পুরুষদের জন্মতারিখের ভিত্তিতে লটারির মাধ্যমে সামরিক বাহিনীতে যোগদানের জন্য বাছাই করা হতো। যাদের জন্মতারিখের লটারি নম্বর আগে আসত, তাদের সেনাবাহিনীতে ডাকার সম্ভাবনাও আগে থাকত।
তবে বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রে নতুন করে বাধ্যতামূলক সেনা নিয়োগ চালুর কোনো ঘোষণা নেই। দেশটির সামরিক বাহিনী ১৯৭৩ সাল থেকে স্বেচ্ছাসেবী নিয়োগের ভিত্তিতে পরিচালিত হচ্ছে।
যুক্তরাষ্ট্রের ১৮ থেকে ২৫ বছর বয়সী প্রায় সব পুরুষ নাগরিক ও নির্দিষ্ট শ্রেণির অভিবাসীর জন্য সিলেক্টিভ সার্ভিস সিস্টেমে নিবন্ধন বাধ্যতামূলক। তবে এই নিবন্ধন সামরিক বাহিনীতে যোগদানের নির্দেশ নয়। জাতীয় জরুরি পরিস্থিতিতে প্রয়োজন হলে সম্ভাব্য সেনা নিয়োগের জন্য ব্যক্তিদের তালিকা তৈরির ব্যবস্থা এটি। দেশটিতে নতুন করে ড্রাফট চালু করতে প্রেসিডেন্ট ও কংগ্রেসের অনুমোদন প্রয়োজন।
যুদ্ধে সেনা পাঠানোর সম্ভাবনা কতটা?
প্রতিবেদনে সামরিক কৌশল বিশ্লেষক ক্রিস্টোফার লির বক্তব্য তুলে ধরা হয়েছে। তাঁর মতে, ভিয়েতনাম যুদ্ধে প্রায় নয় বছর ধরে যুক্তরাষ্ট্রের ১৮ লাখ পুরুষকে বাধ্যতামূলকভাবে সামরিক বাহিনীতে নিয়োগ করা হয়েছিল। এ সংখ্যা দেশটির মোট জনসংখ্যার প্রায় ৭ শতাংশ ছিল।
তবে ইরানের সঙ্গে সম্ভাব্য সংঘাতের ধরন বিবেচনায় যুক্তরাষ্ট্রের সাধারণ নাগরিকদের বাধ্যতামূলকভাবে সেনাবাহিনীতে নিয়োগের প্রয়োজন হওয়ার সম্ভাবনা কম বলে মনে করেন তিনি।
ক্রিস্টোফার লির বিশ্লেষণ অনুযায়ী, পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলে নৌ ও বিমান অভিযানই সংঘাতের প্রধান অংশ হতে পারে। ইরানে স্থলবাহিনী পাঠানোর প্রয়োজনীয়তা নিয়েও তিনি প্রশ্ন তুলেছেন।
যুক্তরাজ্যেও সামরিক প্রস্তুতি নিয়ে আলোচনা
প্রতিবেদনে যুক্তরাজ্যের সামরিক প্রস্তুতির বিষয়টিও উঠে এসেছে। দেশটির চারটি পারমাণবিক অস্ত্রবাহী সাবমেরিনের মধ্যে তিনটি একই সময়ে সমুদ্রে অবস্থান করছে বলে জানিয়েছে দ্য টাইমস। প্রতিবেদনে এ ঘটনাকে বিরল হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
এ ছাড়া যুক্তরাজ্যে সেনাবাহিনীর রিজার্ভে যোগ দেওয়ার ক্ষেত্রে পুরুষদের সর্বোচ্চ বয়সসীমা ৫৫ থেকে বাড়িয়ে ৬৫ বছর করা হয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
সাবেক ব্রিটিশ সেনাপ্রধান লর্ড ড্যানাটের মতে, বড় ধরনের যুদ্ধ শুরু হলে প্রথমে সেনাবাহিনীর রিজার্ভ সদস্যদের কাজে লাগানো হতে পারে। এরপর নিয়মিত রিজার্ভ সদস্যদের ফিরিয়ে আনা এবং পরিস্থিতি অনুযায়ী বাধ্যতামূলক নিয়োগের বিষয়টি বিবেচনায় আসতে পারে।
তবে যুক্তরাষ্ট্র বা যুক্তরাজ্য—কোনো দেশই বর্তমানে সাধারণ নাগরিকদের জন্য নতুন করে বাধ্যতামূলক সামরিক নিয়োগ চালুর ঘোষণা দেয়নি। ফলে তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধের আশঙ্কা এবং সাধারণ নাগরিকদের যুদ্ধে পাঠানোর আলোচনা এখনো সম্ভাবনা ও বিশ্লেষণের পর্যায়েই রয়েছে।
সূত্র: দ্য ইকোনমিক টাইমস