পরপর কয়েকজন প্রেসিডেন্ট ব্যয়বহুল বিদেশি যুদ্ধ শেষ করার প্রতিশ্রুতি দিলেও, গত প্রায় পঁচিশ বছরে যুক্তরাষ্ট্র অন্তত ১০টি দেশে সামরিক অভিযান চালিয়েছে। এসব অভিযানের মধ্যে রয়েছে পূর্ণমাত্রার আক্রমণ থেকে শুরু করে গোপন ড্রোন হামলা পর্যন্ত।
ব্রাউন বিশ্ববিদ্যালয়ের “কস্টস অব ওয়ার” প্রকল্প এবং অন্যান্য সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, এসব যুদ্ধে মার্কিন করদাতাদের আনুমানিক ৮ ট্রিলিয়ন ডলার ব্যয় হয়েছে এবং সরাসরি প্রায় ১০ লাখ মানুষের মৃত্যু ঘটেছে।
.png)
যেসব দেশে যুক্তরাষ্ট্র বোমা হামলা চালিয়েছে
প্রেসিডেন্ট জর্জ ডব্লিউ বুশ “ওয়ার অন টেরর” শুরু করার পর থেকে যুক্তরাষ্ট্র নিম্নলিখিত দেশগুলোতে বোমা হামলা বা সামরিক আঘাত হেনেছে—
- আফগানিস্তান (২০০১–২০২১): আল-কায়েদাকে ধ্বংস করার উদ্দেশ্যে শুরু হওয়া এই অভিযান যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসে সবচেয়ে দীর্ঘ যুদ্ধ হয়ে ওঠে।
- ইরাক (২০০৩–২০১১): গণবিধ্বংসী অস্ত্র থাকার অভিযোগে শুরু হওয়া এই যুদ্ধ পরে মিথ্যা প্রমাণিত হয় এবং দীর্ঘমেয়াদি অস্থিতিশীলতা সৃষ্টি করে, যার ফলে আইএসআইএলের উত্থান ঘটে।
- পাকিস্তান (২০০০-এর দশকের মাঝামাঝি থেকে বর্তমান): আফগান সীমান্ত অঞ্চলে জঙ্গিদের লক্ষ্য করে সিআইএ ও মার্কিন সামরিক বাহিনী ব্যাপক ড্রোন হামলা চালিয়েছে।
- সোমালিয়া (২০০০-এর দশকের মাঝামাঝি থেকে বর্তমান): আল-শাবাব যোদ্ধাদের লক্ষ্য করে বিমান হামলা চালানো হয়েছে।
- ইয়েমেন (২০০২–বর্তমান): আল-কায়েদা ইন দ্য অ্যারাবিয়ান পেনিনসুলার বিরুদ্ধে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালানো হয়েছে।
- লিবিয়া (২০১১): ন্যাটোর নেতৃত্বাধীন অভিযানে যুক্তরাষ্ট্র অংশ নেয়, যার ফলে মুয়াম্মার গাদ্দাফির সরকার পতন ঘটে।
- সিরিয়া (২০১৪–বর্তমান): আইএসআইএলের বিরুদ্ধে দীর্ঘমেয়াদি সামরিক অভিযান চালানো হয়েছে।
- ইরান (২০২৬): সর্বশেষ সংঘাত, যেখানে নেতৃত্ব ও পারমাণবিক অবকাঠামো লক্ষ্য করে হামলা চালানো হয়েছে।
- কুয়েত, সংযুক্ত আরব আমিরাত, সৌদি আরব, বাহরাইন, ওমান, কাতার এবং ইরাক: ইরান সংঘাত ঘিরে সাম্প্রতিক প্রতিশোধমূলক হামলায় এসব দেশেও হতাহত ও ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে, যার ফলে যুদ্ধের পরিসর আরো বিস্তৃত হয়েছে।
উল্লেখ্য, এই তালিকায় সব গোপন অভিযান বা বিশেষ বাহিনীর অভিযান অন্তর্ভুক্ত নাও থাকতে পারে।
যুদ্ধের বিপুল অর্থনৈতিক ব্যয়
এই যুদ্ধগুলোর আর্থিক বোঝা ছিল অত্যন্ত বিশাল। ব্রাউন বিশ্ববিদ্যালয়ের ওয়াটসন ইনস্টিটিউটের হিসাব অনুযায়ী, ২০২৩ সাল পর্যন্ত ৯/১১–পরবর্তী যুদ্ধগুলোতে যুক্তরাষ্ট্র প্রায় ৫.৮ ট্রিলিয়ন ডলার ব্যয় করেছে।
এই ব্যয়ের মধ্যে রয়েছে—
- প্রতিরক্ষা বিভাগের সরাসরি ব্যয়: ২.১ ট্রিলিয়ন ডলার
- হোমল্যান্ড সিকিউরিটি ব্যয়: ১.১ ট্রিলিয়ন ডলার
- ভেটেরানদের চিকিৎসা ব্যয়: ৪৬৫ বিলিয়ন ডলার
- যুদ্ধের জন্য নেয়া ঋণের সুদ
পরবর্তী তিন দশকে ভেটেরানদের চিকিৎসা ব্যয়ের সম্ভাব্য ২.২ ট্রিলিয়ন ডলার যুক্ত করলে মোট ব্যয় প্রায় ৮ ট্রিলিয়ন ডলারে পৌঁছায়।
নতুন যুদ্ধ: ইরান
২০২৬ সালের ৬ মার্চ শুরু হওয়া ইরান যুদ্ধ দ্রুতই সেই ব্যয়ের তালিকা বাড়িয়ে দিচ্ছে।
এই সপ্তাহে সিনেটরদের সঙ্গে এক গোপন বৈঠকে ট্রাম্প প্রশাসনের কর্মকর্তারা জানান, যুদ্ধের প্রথম ছয় দিনেই যুক্তরাষ্ট্রের খরচ হয়েছে অন্তত ১১.৩ বিলিয়ন ডলার।
বৈঠকের সঙ্গে পরিচিত এক সূত্র জানায়, প্রথম দুই দিনেই ৫.৬ বিলিয়ন ডলারের অস্ত্র ব্যবহার করা হয়েছে।
কংগ্রেসের সহকারীরা মনে করছেন, হোয়াইট হাউস শিগগিরই জরুরি তহবিলের জন্য নতুন আবেদন জানাবে। যুদ্ধ কতদিন চলবে তার ওপর নির্ভর করে এই ব্যয় ৫০ বিলিয়ন ডলার বা তারও বেশি হতে পারে।
মানবিক ক্ষয়ক্ষতি
এই যুদ্ধগুলোর মানবিক ক্ষয়ক্ষতিও অত্যন্ত ভয়াবহ।
ব্রাউন বিশ্ববিদ্যালয়ের হিসাব অনুযায়ী, ২০০১ সালের পর যুক্তরাষ্ট্র নেতৃত্বাধীন যুদ্ধগুলোতে আফগানিস্তান, পাকিস্তান, ইরাক, সিরিয়া, ইয়েমেনসহ বিভিন্ন অঞ্চলে প্রায় ৯ লাখ ৪০ হাজার মানুষের সরাসরি মৃত্যু হয়েছে।
এতে যুদ্ধের কারণে স্বাস্থ্যব্যবস্থা ধ্বংস, খাদ্য সংকট বা রোগব্যাধির ফলে হওয়া পরোক্ষ মৃত্যুগুলো অন্তর্ভুক্ত নয়।
বর্তমান ইরান সংঘাতেও নিহতের সংখ্যা দ্রুত বাড়ছে। আল-জাজিরার তথ্য অনুযায়ী—
- ইরান: অন্তত ১,২৫৫ জন নিহত, ১২,০০০-এর বেশি আহত
- লেবানন: ৬৩৪ জন নিহত, ১,৫০০-এর বেশি আহত; প্রায় ৮ লাখ মানুষ বাস্তুচ্যুত
- ইরাক: ২৬ জন নিহত
- ইসরায়েল: ১৪ জন নিহত
- যুক্তরাষ্ট্র: ৭ জন সেনা নিহত
- কুয়েত, সংযুক্ত আরব আমিরাত, সৌদি আরব, বাহরাইন, ওমান ও কাতার: সম্মিলিতভাবে ১৫ জনের বেশি নিহত, বহু আহত।
জাতিসংঘের শিশু সংস্থা জানিয়েছে, সংঘাত তীব্র হওয়ার ফলে ১,১০০ শিশু নিহত বা আহত হয়েছে, এবং পরিস্থিতিকে তারা “ভয়াবহ মানবিক বিপর্যয়” বলে সতর্ক করেছে।
রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়া
যুদ্ধের আর্থিক ও মানবিক ক্ষয়ক্ষতি বাড়তে থাকায় কংগ্রেসের উভয় দলের সদস্যরা এখন আরো স্বচ্ছতা দাবি করছেন।
ডেমোক্র্যাট আইনপ্রণেতারা প্রশাসনের কর্মকর্তাদের প্রকাশ্যে সাক্ষ্য দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন, যাতে প্রেসিডেন্টের যুদ্ধ কৌশল, সম্ভাব্য সময়সীমা এবং যুদ্ধ-পরবর্তী ইরান পরিকল্পনা সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা পাওয়া যায়।
বুধবার কেনটাকিতে সফরকালে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প বলেন, “আমরা জিতেছি।” তবে একই সঙ্গে তিনি জানান, যুক্তরাষ্ট্র “কাজ শেষ করতে” সামরিকভাবে জড়িত থাকবে।
তিনি আরো দাবি করেন, যুদ্ধ শিগগিরই শেষ হতে পারে কারণ বোমা হামলার মতো “প্রায় কিছুই আর অবশিষ্ট নেই”—যদিও তিনি এ দাবির পক্ষে কোনো প্রমাণ দেননি।
৯/১১–পরবর্তী ইতিহাসে যুক্তরাষ্ট্রের এই নতুন অধ্যায় আবারও স্মরণ করিয়ে দিচ্ছে আধুনিক যুদ্ধের বিশাল মূল্য—প্রায় ৮ ট্রিলিয়ন ডলারের ব্যয় এবং লাখ লাখ মানুষের প্রাণহানি।
সূত্র: আল-জাজিরা