ভারত মহাসাগরের পূর্ব আফ্রিকা উপকূলে গত কয়েক মাসে পণ্যবাহী জাহাজে জলদস্যুদের আক্রমণের ঘটনা দ্রুত বেড়েছে। এসব ঘটনা বাণিজ্যিক জাহাজের নাবিক, জাহাজ পরিচালনাকারী কোম্পানি এবং সরকারগুলোর মাথাব্যাথার বড় কারণ হয়ে উঠেছে।
সোমালি জলদস্যুদের সবশেষ শিকার বাংলাদেশি পতাকাবাহী জাহাজ এমভি আবদুল্লাহ। কয়লাবাহী ওই জাহাজের ২৩ নাবিক এখন তাদের হাতে জিম্মি। জাহাজ কোম্পানির পাশাপাশি সরকারের তরফ থেকে জলদস্যুদের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও এখনো তাদের সাড়া মেলেনি। ফলে দেশে উৎকণ্ঠার প্রহর গুণছে পরিবারগুলো। সবশেষ খবরের তথ্য বলছে, জিম্মি নাবিকদেরসহ জাহাজটিকে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে সোমালি উপকূলের দিকে।
.png)
কিভাবে জাহাজ টার্গেট করে সোমালিয়ান জলদস্যুরা
সোমালিয়ান জলদস্যুরা প্রথমে পছন্দ মতো নানা হিসেব মিলিয়ে একটি জাহাজকে টার্গেট করে। মূলত পণ্যবাহী জাহাজকেই নিজেদের লক্ষ্যবস্তু বানায় এরা। আন্তর্জাতিক নৌরুটে চলাচল করা পণ্যবাহী জাহাজের গতি যেমন সাধ্যের মধ্যে থাকে। তেমন পাল্টা আঘাতের ঝুঁকিও থাকে কম। ১৮ থেকে ২০ নটিক্যাল মাইল গতিতে চলা এসব জাহাজে হুট করেই পরিকল্পনা মতো নৌকা নিয়ে উঠে যায় দস্যুরা। তাদের কাঁধে ঝোলানো থাকে একে-৪৭ এর মতো মারণাস্ত্র। ফলে তাদের সামনে নাবিকরাও অসহায় হয়ে পড়েন। বাধ্য হন দস্যুদের কথা মতো জাহাজ চালাতে।

এরপর শুরু হয় দস্যুদের আসল খেলা। জিম্মি করা নাবিকদের দিয়েই তারা কাঙ্ক্ষিত মুক্তিপণের বিষয়টি জানায় যথাযথ কর্তৃপক্ষকে। ফোনে নিজ পরিবারের সঙ্গে কথা বলার সুযোগও দেয় জিম্মিদের। এরপর তাদের কাছ থেকে ফোন কেড়ে নেয়। যাতে স্বজনদের উদ্বেগ, উৎকণ্ঠা বাড়ে; বিপরীত প্রান্তে ভয়ংকর রকম ভীতি তৈরি হয়।
অপহৃতদের সোমালিয়ার জঙ্গলে বন্দী করে রাখা হয়। হাঁকা হয় বিশাল মুক্তিপণ। চলে দর কষাকষি। মুক্তিপণ না পাওয়া পর্যন্ত অপহৃতদের জঙ্গলেই আটকে রাখা হয়। বন্দীদের খুব একটা খাবারও দেয় না দস্যুরা।
জলদস্যু শেয়ারবাজার
জলদস্যুরা জিম্মি করার মতো জাহাজ সব সময় পায় না। পেলেও সেই অভিযান সফল হবে, তারও নিশ্চয়তা নেই। তাই একেকটি অভিযানে জলদস্যুদের অনেক অর্থ বেরিয়ে যায়। সফল হলে মুক্তিপণের বিপুল অর্থ মেলে। আর ব্যর্থ হলে করার কিছু নেই। এসব কারণে জলদস্যুরা অভিযানে অর্থায়নের জন্য সোমালিয়ার জনগণের ওপর ভরসা করে।
সোমালিয়ায় একটি ‘জলদস্যু শেয়ারবাজার’ আছে। সেখানে বিনিয়োগকারীরা সম্ভাব্য অভিযানের শেয়ার কেনে। ৭২টির বেশি জলদস্যু গ্রুপের সমন্বয়ে এই শেয়ারবাজার গঠিত। এসব গ্রুপকে তারা ‘সামুদ্রিক কোম্পানি’ বলে থাকে। বিনিয়োগকারীরা আশা করে, তাদের অর্থায়ন করা গ্রুপ ‘জ্যাকপট’ পেয়ে যাবে। অনেক মুক্তিপণ নিয়ে ফিরবে।
তবে সেখানে শুধু অর্থ দিয়েই শেয়ার কেনাবেচা হয় না। বরং বিনিয়োগকারীরা একে-৪৭ রাইফেল বা রকেটচালিত গ্রেনেডের বিনিময়েও শেয়ার কিনতে পারে।
খুব অল্প অর্থ পায়
একেকটি ‘সফল’ অভিযান থেকে মুক্তিপণ হিসেবে লাখ লাখ ডলার জলদস্যুদের হাতে আসে। তবে সেই অর্থের সামান্যই অভিযানে অংশ নেওয়া জলদস্যুদের পকেটে ঢোকে। যারা ছোট ডিঙিনৌকা নিয়ে জিম্মি করার মতো জাহাজের সন্ধানে উত্তাল সাগরে ভেসে বেড়ায় কিংবা গুলি ছুড়ে জাহাজ জিম্মি করে, তারা মুক্তিপণের ভাগের ৩০ হাজার থেকে ৭৫ হাজার ডলার পায়। যারা বন্দুক কিংবা জাহাজে ওঠার মই নিয়ে এগিয়ে আসে, তাদের ভাগে অতিরিক্ত ১০ হাজার ডলার।
তাহলে লাখো ডলারের বাকি ভাগ কোথায় যায়? উত্তরটা সহজ, জলদস্যু শেয়ারবাজারের বিনিয়োগকারীদের পকেটে। মুক্তিপণ পাওয়া গেলে সবার আগে বিনিয়োগকারী ও আরো কিছু স্টেকহোল্ডার তাদের ভাগের অর্থ কেটে রাখে। এ ছাড়া বিদ্যালয় ও হাসপাতাল পরিচালনার মতো কাজে সংশ্লিষ্ট সম্প্রদায়কে কিছু অর্থ দেওয়া হয়। বাকি যা থাকে, তা অভিযানে অংশ নেওয়া জলদস্যুরা ভাগ করে নেয়।

যেভাবে চলে অভিযান
সোমালিয়ার জলদস্যুদের জাহাজ জিম্মি করার প্রক্রিয়াটি বেশ সোজাসাপটা। তবে পরিস্থিতিভেদে তা জটিল হতে পারে। বিনিয়োগকারী পাওয়ার পর জলদস্যুরা দুটি দলে ভাগ হয়ে যায়। একটি দল জিম্মি করার মতো জাহাজ খুঁজতে নৌকা নিয়ে সাগরে ভেসে বেড়ায়। জাহাজ খুঁজে পেলে, অন্ধকারের মধ্যে সেটার পাশে চলে যাওয়ার চেষ্টা করে। এরপর গুলি ছুড়তে ছুড়তে জাহাজের ডেকে ওঠার চেষ্টা করে তারা। সফল হলে পরে সেই জাহাজ সোমালিয়ার উপকূলে নিয়ে যায় এই দল।
এরপর মাঠে নামে আরেকটি দল। মুক্তিপণের আলোচনা শেষ না হওয়া পর্যন্ত তারা জাহাজ পাহারা দেয়। মুক্তিপণের অর্থ পাওয়ার পরই তারা জাহাজ ছেড়ে যায়। এর মধ্যে দৃশ্যপটে আসে ব্যবসায়ী। নোঙর করা জাহাজের নাবিক ও ক্রুদের খাওয়ানোসহ যাবতীয় খরচ বহন করে সে। পরে মুক্তিপণের ভাগ থেকে খরচ করা অর্থ সুদসহ ফেরত পায় সে।
যারা জাহাজ পাহারা দেয়, তারা একেকজন ১৫ হাজার ডলার পায়। মূল বিনিয়োগকারী মুক্তিপণের ৩০ শতাংশ নেয়। বাকি বিনিয়োগকারীরা নিজ নিজ শেয়ার অনুযায়ী ভাগ পায়। ‘অ্যাংকরিং রাইট’ অনুযায়ী সংশ্লিষ্ট সম্প্রদায় একটা ভাগ পায়। এরপর যা থাকে, সেটা বাকি জলদস্যুরা ভাগ করে নেয়।
ভুলে যুদ্ধজাহাজে হামলা
সোমালিয়ার উপকূলে জলদস্যুদের দৌরাত্ম্য কমাতে সশস্ত্র যুদ্ধজাহাজ টহল দেয়। জলদস্যুরা জানে, একে-৪৭ কিংবা গ্রেনেড নিয়ে এসব যুদ্ধজাহাজের মোকাবিলা করা সম্ভব নয়। এরপরও তাদের ঝুঁকি নিতে হয়। অভিযানে গিয়ে অনেক সময় তারা ভুল করে ফেলে। বাণিজ্য জাহাজ মনে করে যুদ্ধজাহাজের মুখোমুখি হওয়ার ঘটনাও ঘটে।

সাধারণত গুলি ছুড়তে ছুড়তে জাহাজে উঠে পড়ে সেটার নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার চেষ্টা করে জলদস্যুরা। এমনই এক অভিযানে গিয়ে ২০১০ সালের এপ্রিলে বাণিজ্য জাহাজ মনে করে মার্কিন যুদ্ধজাহাজ অ্যাশল্যান্ডে গুলি ছোড়ে জলদস্যুরা। তখন অ্যাশল্যান্ড থেকে পাল্টা গুলি ছুড়লে এক জলদস্যু নিহত হয়। আটক করা হয় বাকিদের।
তারা যে জলদস্যু, সেটা অবশ্য কেউই স্বীকার করেনি। বলেছিল, তারা সবাই পাচারকারী। ইয়েমেনে মানুষ নিয়ে যাচ্ছিল। তাদের নৌকা ডুবে গেছে। জাহাজের নাবিকদের দৃষ্টি আকর্ষণে গুলি ছুড়েছিল।
২০১০ সালে অন্য একটি ঘটনায় কিছু জলদস্যু বাণিজ্য জাহাজ ভেবে ইউএসএস নিকোলাসে আক্রমণ করেছিল। পরে তারা তাদের ভুল বুঝতে পেরে পালিয়ে যায়। ইউএসএস নিকোলাস থেকে পাল্টা গুলি ও ধাওয়া করা হয়। আটক করা হয় পাঁচ জলদস্যুকে। একই বছরে ডাচ যুদ্ধজাহাজ এইচএনএলএমএস ট্রম্পে ভুলবশত অভিযান চালাতে গিয়ে আটক হয়েছিল ১৩ জলদস্যু।
বিশ্বজুড়েই বাড়ছে জলদস্যুদের উপদ্রব
২০২৩ সালের এক পরিসংখ্যান বলছে, বিশ্বের গুরুত্বপূর্ণ জাহাজ চলাচলের পথে জলদস্যুদের উপদ্রব বেড়ে চলেছে। এটি যে ক্রমবর্ধমান তা দুই বছরের চিত্রের দিকে তাকালে স্পষ্ট হবে।
২০২২ সালে সমুদ্রপথে ১১৫টি সশস্ত্র ডাকাতি ও জলদস্যুতার ঘটনা ঘটে। পরের বছরে এই সংখ্যা বেড়ে দাঁড়ায় ১২০। এই তথ্য দিয়েছে ইংল্যান্ডের আইসিসি ইন্টারন্যাশনাল মেরিটাইম ব্যুরো (আইএমবি)। তারা তাদের পাইরেসি অ্যান্ড আর্মড রবারির প্রতিবেদনে বলে, জাহাজের নাবিকদের নিরাপত্তা দিনকে দিন হুমকির মুখে পড়ছে।

২০২২ সালে ৪১ জন নাবিককে জিম্মি করেছিল সোমালি জলদস্যুরা। পরের বছর তাদের হাতে জিম্মি হয় ৭৩ জন। নাবিক অপহরণের ঘটনাও এই দুই বছরে ২ থেকে বেড়ে ১৪ হয়।
উদ্ভূত পরিস্থিতিতে উদ্বেগ জানিয়ে ইন্টারন্যাশনাল মেরিটাইম অর্গানাইজেশনের (আইএমও) এক মুখপাত্র বলেন, “পুরো বিশ্ব শিপিং ও নাবিকের ওপর নির্ভরশীল। এ কারণে জাহাজ ও মালবাহী জাহাজ কোনোভাবেই হামলার লক্ষ্য হওয়া উচিৎ নয়।”
নাবিকদের নিরাপত্তার প্রসঙ্গ টেনে ওই মুখপাত্র বলেন, “বৈরী পরিস্থিতিতে এই নিরাপরাধ নাবিকরা কাজ করে যাচ্ছেন এবং তা করতে গিয়ে হামলার শিকার হচ্ছেন। তাদের নিরাপত্তাকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়া প্রয়োজন।”
লন্ডনভিত্তিক সামুদ্রিক নিরাপত্তা সংস্থা ড্রায়াড গ্লোবালের তথ্য অনুযায়ী, হর্ন অব আফ্রিকা বা সোমালি উপদ্বীপের উপকূল থেকে ভারতের উপকূল পর্যন্ত অঞ্চল ‘উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ’ হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে।
এই অঞ্চলে ২৫টি দেশ আছে। এই দেশগুলোর প্রতিটিরই নিজস্ব নৌবাহিনী থাকলেও অঞ্চলটি এতটাই বিশাল যে তাদের পক্ষে সাগরে জাহাজের পুরোপুরি নিরাপত্তার ব্যবস্থা করা সম্ভব নয়।
কেবল হর্ন অব আফ্রিকা বা ভারতের উপকূল নয়, আফ্রিকার পশ্চিমে গিনি উপসাগরেও সম্প্রতি জলদস্যুদের তৎপরতা বেড়েছে। ২০২৩ সালে ওই উপসাগরে ২২টি জাহাজ আক্রান্ত হয়।

এর আগের বছর তাদের হাতে আক্রান্ত জাহাজের সংখ্যা ছিল ১৯। অবশ্য ২০২০ থেকে ২০২৩ সাল এই চার বছরে জলদস্যুরা সবচেয়ে বেশি সফল হয় ২০২০ সালে। সে বছর তারা গিনি উপসাগরে ৮১টি জাহাজে ডাকাতি করে।
জলদস্যুদের কবলে পড়ছে সিঙ্গাপুর প্রণালীতে চলাচলরত জাহাজগুলোও। তবে এই প্রণালীতে সংঘটিত অপরাধকে ‘ছোটখাটো সুযোগসন্ধানী অপরাধ’ বলে মনে করে আইসিসি ইন্টারন্যাশনাল মেরিটাইম ব্যুরো (আইএমবি)।
যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্রদের পদক্ষেপ
সাগরে নিরাপত্তা ও নজরদারি বাড়াতে চলতি বছরের ১ ফেব্রুয়ারি ভারতকে প্রায় ৪০০ কোটি ডলার মূল্যের ড্রোন ও সামরিক সরঞ্জাম বিক্রির অনুমোদন দিয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন।
সোমালি জলদস্যুদের মোকাবেলায় গঠিত অপারেশন আটালান্টার এক মুখপাত্র জানান, হর্ন অব আফ্রিকায় জলদস্যুদের দৌরাত্ম্য দমনে নিয়োজিত নৌবাহিনীর জোটকে আরো শক্তিশালী করা হবে।
ওই মুখপাত্র বলেন, পূর্ব আফ্রিকায় আমরা শিগগিরই আরো জাহাজ ও সেনা মোতায়েন করব। সমুদ্রপথে নিরাপত্তা নিশ্চিতে আন্তর্জাতিক অংশীদারদের সঙ্গে আমরা একযোগে কাজ করা অব্যাহত রাখব।