কেন ২৬ সেকেন্ড পরপর কাঁপে পৃথিবী?
পৃথিবীতে প্রায় প্রতি ২৬ সেকেন্ড পরপর একটি মৃদু, নিয়মিত ভূকম্পন রেকর্ড করা হয়। কয়েক দশক ধরে এই স্পন্দন নিয়ে গবেষণা চললেও এর সুনির্দিষ্ট উৎস ও উৎপত্তির প্রক্রিয়া নিয়ে এখনো বিজ্ঞানীদের মধ্যে মতভেদ রয়েছে। সমুদ্রের ঢেউয়ের আঘাত, সমুদ্রতলের গঠন কিংবা আগ্নেয়গিরির কার্যকলাপ—কোনটি এর পেছনে দায়ী, তা নিশ্চিতভাবে প্রতিষ্ঠিত হয়নি।
বিজ্ঞানীদের কাছে এই ঘটনা ‘২৬-সেকেন্ড মাইক্রোসিজম’ বা পৃথিবীর নিয়মিত স্পন্দন নামে পরিচিত। ১৯৬০-এর দশকের শুরুর দিকে কলাম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের লামন্ট-ডোহার্টি জিওলজিক্যাল অবজারভেটরির ভূতাত্ত্বিক জ্যাক অলিভার এই স্পন্দন পর্যবেক্ষণ ও নথিভুক্ত করেন। তবে সে সময়ের যন্ত্রপাতি ও গবেষণার সীমাবদ্ধতার কারণে এর উৎস সম্পর্কে বিস্তারিত ব্যাখ্যা পাওয়া যায়নি।
পরবর্তী গবেষণায় স্পন্দনটির সঙ্গে পশ্চিম আফ্রিকার উপকূলবর্তী গিনি উপসাগরের বাইট অব বনি অঞ্চলের যোগসূত্রের ইঙ্গিত পাওয়া যায়। তবে ঠিক কীভাবে ওই অঞ্চল থেকে নিয়মিত এই কম্পন তৈরি হচ্ছে, তা নিয়ে এখনো একাধিক ব্যাখ্যা রয়েছে।
সমুদ্রের ঢেউ, নাকি আগ্নেয়গিরি—কোনটি দায়ী?
একটি ব্যাখ্যা অনুযায়ী, দক্ষিণ আটলান্টিক মহাসাগরে সৃষ্ট দীর্ঘ ঢেউ গিনি উপসাগরের উপকূলে পৌঁছে সমুদ্র ও ভূত্বকের মধ্যে বিশেষ ধরনের কম্পন তৈরি করতে পারে। ২০১৩ সালের একটি গবেষণায় বাইট অব বনি অঞ্চলে একই ধরনের ভূকম্পন সৃষ্টিতে সমুদ্রের ঢেউয়ের ভূমিকার পক্ষে প্রমাণ তুলে ধরা হয়েছিল।
অন্যদিকে, গবেষকদের একটি অংশ ভূগর্ভস্থ আগ্নেয়গিরির কার্যকলাপ বা তরল পদার্থে পূর্ণ ফাটলের অনুরণনকে সম্ভাব্য কারণ হিসেবে বিবেচনা করছেন। গিনি উপসাগরের কাছাকাছি সাঁও তোমে আগ্নেয়গিরি অঞ্চলে অন্য একটি নিয়মিত কম্পনের উৎস পাওয়া গেলেও, সেটিই ২৬ সেকেন্ডের স্পন্দনের কারণ—এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যায়নি।
২০২৬ সালের এপ্রিলে প্রকাশিত Nature Communications-এর একটি গবেষণায় সমুদ্রের দীর্ঘ ঢেউ এবং ২৬ সেকেন্ডের ভূকম্পন সৃষ্টির সময়ের মধ্যে সম্পর্কের প্রমাণ পাওয়া যায়। গবেষকদের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, দূরবর্তী ঝড়ের কারণে তৈরি ঢেউ গিনি উপসাগর এলাকায় পৌঁছালে এই স্পন্দন জোরালো হতে পারে। তবে ঠিক কোন প্রক্রিয়ায় স্পন্দন তৈরি হয়, তা এখনো পুরোপুরি ব্যাখ্যা করা যায়নি।
এই স্পন্দনকে সাধারণ ভূমিকম্পের সঙ্গে এক করে দেখা ঠিক নয়। এটি দীর্ঘ সময় ধরে শনাক্ত হওয়া একটি নির্দিষ্ট কম্পাঙ্কের দুর্বল ভূকম্পন সংকেত। গবেষণায় এর সঙ্গে বড় কোনো প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের সরাসরি সম্পর্ক প্রতিষ্ঠিত হয়নি।
প্রায় ছয় দশক ধরে গবেষণার পরও পৃথিবীর এই নিয়মিত স্পন্দনের উৎপত্তি নিয়ে প্রশ্ন রয়ে গেছে। নতুন গবেষণায় সমুদ্রের ঢেউয়ের ভূমিকা সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ সূত্র মিললেও, রহস্যটির পূর্ণ সমাধানে আরও পর্যবেক্ষণ ও গবেষণা প্রয়োজন।