চুম্বন- এক আশ্চর্য অগ্নিশিখা
গাঢ় চুম্বন আমার কাছে আবেগের সবচেয়ে নিবিড়, গভীর, মোহময় অভিব্যক্তি মনে হয়। শরীরী ভালোবাসার সমস্ত ভাষার মধ্যে এ যেন এক অনন্য কবিতা। চুম্বন কেবল দুটি অধরের স্পর্শ নয়, বরং দুটি পৃথক অস্তিত্বের মাঝখানে গড়ে ওঠা অদৃশ্য দূরত্বটুকু মুছে দিয়ে মন ও শরীরকে একই অনুভূতির স্রোতে ভাসিয়ে দেওয়ার এক আশ্চর্য অগ্নিশিখা।
ভালোবাসা প্রকাশের সবচেয়ে নীরব অথচ গভীর মাধ্যম — চুম্বন। যেখানে শব্দ থেমে যায়, সেখানে শুরু হয় তার ভাষা। বলা হয়ে থাকে, ঠোঁটের নিঃশব্দ ভাষা— চুম্বন। প্রেমের তীব্র আকুতি, স্নেহের উচ্ছ্বাস, আশ্লেষের হর্ষ, ব্যথার সমবেদনা, বিদায়ের সংকেতও প্রকাশিত হয় চুম্বনের মাধ্যমে।
- ইতিহাসবিদদের মতে, ষষ্ঠ শতকে ফ্রান্সে নাচের শেষে সঙ্গীকে চুম্বন করার এক ধরনের প্রথা প্রচলিত ছিল। আবার রোমানরা চুম্বনকে তিনটি ভাগে বিভক্ত করেছিল ‘অস্কুলাম’, যা বন্ধুত্বের নিদর্শন হিসেবে গালে দেওয়া হতো; ‘বাসিয়াম’, যা ঠোঁটে চুম্বন; আর ‘সুভিয়াম’, যা ছিল গভীর আবেগময় চুম্বন।
সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এই অভ্যাস বদলেছে, তবে অনুভূতির গভীরতা রয়ে গেছে একই।
চোখের পাতা ধীরে নেমে আসে। পৃথিবী তার সমস্ত কোলাহল নিয়ে ক্রমশ দূরে সরে যায়। ঠিক তখনই, যখন অপর প্রান্তের মানুষটির উষ্ণ ওষ্ঠ নিঃশব্দে এসে ছুঁয়ে যায় অধর, মনে হয় সহস্র হিমশৈল যেন একসঙ্গে ভেঙে পড়ছে মনের অতলান্তিক গভীরে।
তাদের বরফশীতল খণ্ডগুলো স্নায়ুর অলিগলি বেয়ে ছুটে যাচ্ছে অজানা কোনো গন্তব্যের দিকে, অথচ সেই শীতলতারই ভেতর কোথাও জ্বলে উঠছে এক দুর্নিবার আগুন।
মস্তিষ্কের গভীরে যেন ঘটে যায় এক নীরব মহাবিস্ফোরণ। অনুভূতির অণু-পরমাণুগুলো আলোর কণার মতো ছড়িয়ে পড়ে চেতনার প্রতিটি প্রান্তে। সময় থমকে দাঁড়ায়, শ্বাসের ছন্দ হারিয়ে যায় তার চেনা ব্যাকরণ। আর বুকের গভীরে জন্ম নেয় এমন এক আলোড়ন যার কোনো ভাষা নেই, অথচ যার প্রতিটি স্পন্দন অনায়াসে হৃদয়ের মধ্যস্থলে ভেদ করে।
কী অদ্ভুত বৈপরীত্য!
একই শরীরের ভেতর আগ্নেয়গিরির লাভা আর মেরুপ্রদেশের তুষারপাত যেন পাশাপাশি ঘটে চলেছে। কোথাও দাউদাউ করে জ্বলে উঠছে আকাঙ্ক্ষার আগুন, কোথাও আবার নেমে আসছে বরফগলা নদীর মতো এক নিবিড় প্রশান্তি।
উত্তাপ আর শীতলতা, অস্থিরতা আর সমর্পণ, উন্মাদনা আর অপার্থিব নীরবতা। সবটা মিলেমিশে তৈরি করছে এমন এক অনুভূতি, যার কাছে ভাষা বারবার পরাজিত হয়।
তখন আর মনে থাকে না পৃথিবী তার নিজস্ব নিয়মে আদৌ চলছে কি না। শুধু মনে হয়, মহাবিশ্বের সমস্ত নক্ষত্র বুঝি এক মুহূর্তের জন্য তাদের কক্ষপথ বদলে ফেলেছে। সমস্ত দূরত্ব এসে আশ্রয় নিয়েছে দুটি মানুষের মধ্যবর্তী সামান্য ব্যবধানে।
আচ্ছা, পৃথিবীতে এমন কোনো মুহূর্ত কি সত্যিই আছে, যখন একই সঙ্গে অগ্ন্যুৎপাত ও তুষারপাত ঘটে? যখন মানুষ একই অনুভূতিতে পুড়ে যায়, আবার সেই অনুভূতির কাছেই আশ্চর্য প্রশান্তিতে শীতল হয়ে আসে?
হয়তো আছে!
হয়তো তার নামই চুম্বন!
যেখানে দুটি ঠোঁটের সামান্য স্পর্শে শরীরের ভেতর জেগে ওঠে একটি গোটা মহাবিশ্ব, আর দুটি মানুষের নীরবতার মধ্যে লেখা হয়ে যায় এমন এক কবিতা, যার অর্থ বোঝার জন্য কোনো শব্দের প্রয়োজন হয় না।
চুম্বন কোনো অন্যায় নয়- যদি তা ভালোবাসায় ভেজা হয়।
চুম্বন শুধু ঠোঁটে নয়, হৃদয়ের অতলের আকাঙ্খা।
একটা চুম্বন মানে একটা অমর কবিতা।

চোখ বুজে ফেলার সঙ্গে সঙ্গে ঠিক যখন আচমকা অপর প্রান্তের মানুষটির আলতো ওষ্ঠ নিজের অধরে অনুভব করা যায়, মনে হয় হাজার হাজার হিমশৈল হুড়মুড়িয়ে ভেঙেচুরে স্নায়ুতন্ত্রের মধ্যে দিয়ে অণু পরমাণু খন্ডাংশ হয়ে এলোপাথাড়ি ছুটে চলেছে নিরুদ্দেশের ঠিকানায়।
সম্পর্কের ঘনিষ্ঠতা বাড়ানোর পাশাপাশি চুম্বন মানসিক ও শারীরিক স্বাস্থ্যের উপর ইতিবাচক প্রভাব ফেলে একথা বলেছেন চিকিৎসকরা।
চুম্বন বিষয়ক পড়াশোনার নাম হল ফিলেমেটোলজি। অনেকেই বলে থাকেন যে প্রথম চুম্বনের মোহ অন্যরকম, যা কখনই ভোলা যায় না। কিন্তু বিজ্ঞান কিছুটা ভিন্ন কথাই বলে। চুম্বনে মূলত স্বাদ, শব্দ এবং গন্ধ এই ৩ টি বিষয়ই কাজ করে।
- গবেষণায় দেখা গেছে যে প্রায় ৫৯ শতাংশ পুরুষ এবং প্রায় ৬৬ শতাংশ নারী প্রথম চুম্বনের প্রতি একেবারেই আসক্ত নন বা প্রথম চুম্বন তাদের ততটা ভালো লাগে না। আরেকটি গবেষণায় দেখা যায় যে পুরুষের তুলনায় নারীরাই চুম্বনে বেশি আনন্দ পেয়ে থাকেন।
জেনে নিন চুম্বন সংক্রান্ত কিছু তথ্য
- শরীরের অন্যান্য অংশের তুলনায় ১০০ গুণ অধিক সংবেদনশীল হল ত্বক। প্রত্যেক ব্যক্তির ত্বক ও ঠোঁটের সংবেদনশীলতা পৃথক পৃথক। তবে ঠোঁট হাতের তুলনায় ১০০ থেকে ২০০ গুণ বেশি সংবেদনশীল।
- গবেষণা অনুযায়ী, চুম্বনের সময় শরীরের ১৪৬টি মাংসপেশির মধ্যে সামঞ্জস্য স্থাপন জরুরি। এর মধ্যে ৩৪টি মুখের ও ১১২টি অন্য পেশি উপস্থিত।
- একটি চুম্বনের সময় ২৮০ ধরনের ব্যাকটেরিয়া শরীরে প্রবেশ করে। অন্য দিকে তীব্র স্মুচের ফলে প্রায় ৫০ লক্ষ ব্যাকটেরিয়া একে অপরের শরীরে প্রবেশ করে যায়। কিন্তু এই ব্যাকটেরিয়া ক্ষতিকর হয় না।
- স্বাস্থ্যের পক্ষে উপকারী এই স্মুচ। চুম্বনের সময় শরীরের ব্যাকটেরিয়া প্রবেশ করলেও, অন্য কিছু ব্যাকটেরিয়া আসার ফলে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা মজবুত হয়। এ ছাড়া দাঁত ও মুখের স্বাস্থ্যের জন্যও চুম্বন উপযোগী।
- চুম্বনের সময় যাঁরা ডান দিকে ঘুরে বা ঝুঁকে যান, তাঁদের ভালো কিসার মনে করা হয়।