ঢাকা,  শনিবার   ১৭ অক্টোবর ২০২৬, ১ কার্তিক ১৪৩৩

[ ফিচার ]

কোন পথে আসে আর যায় মহামূল্যবান সাপের বিষ

ফিচার ডেস্ক
প্রকাশিত: ১৬:২০, ২৬ ডিসেম্বর ২০২০
কোন পথে আসে আর যায় মহামূল্যবান সাপের বিষ
ছবি: সাপের বিষ সংগ্রহ

সরীসৃপ প্রাণীর মধ্যে সাপ অন্যতম। পৃথিবীর প্রায় সব দেশেই এই প্রাণীটি দেখা যায়। ভয় আর আতঙ্কই বেশি কাজ করে এই প্রাণীর ব্যাপারে। পৃথিবীতে সাপের প্রায় ২,৯০০টিরও বেশি প্রজাতি রয়েছে। বিশ্বের যেকোনো অঞ্চলের বন জঙ্গলে পরিপূর্ণ এলাকা, আদিবাসী অধ্যূষিত অঞ্চল, পাহাড়ি জনপদ, নদী বা জলাশয়ের আশেপাশে থাকা জনবসতির মানুষের কাছে খুব পরিচিত প্রাণী সাপ।

সরীসৃপ এই প্রাণীর কামড়ে বিশ্বে প্রতিবছর প্রায় এক লাখ মানুষের মৃত্যু হলেও প্রাণী হিসেবে সাপ কিন্তু আগ্রাসী বা ভীতিকর প্রাণী নয়। তবে সাপের বিষ যেমন মরণঘাতি তেমনি উপকারীও বটে! নানান রকম ওষুধ বানাতে প্রয়োজন হয় এই বিষের। দামেও খুব চড়া এই বিষ। এই নিয়ে চোরাচালানিদেরও রমরমা ব্যবসা। দেশের আইনের চোখ ফাঁকি দিয়ে প্রচুর পরিমাণে সাপের বিষ আমদানি রফতানি করা হচ্ছে। কোন পথে আসছে এই বিষ, আর যাচ্ছেই বা কোন পথে। 

বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকার দক্ষিণখান এলাকা থেকে কাঁচের জারে রক্ষিত অবস্থায় প্রায় নয় কেজি ওজনের সাপের বিষসহ কয়েকজনকে আটক করেছে র‍্যাব। এমন প্রায়ি খবরের শিরোনামে দেখা যায় সাপের বিষ পাচারের তথ্য। এই নিয়ে মানুষের মনে আছে নানান প্রশ্ন। উদ্ধারকৃত এই বিষের মূল্য আনুমানিক পঁচাত্তর কোটি টাকা হতে পারে।  

এই বিষ পাচার হচ্ছে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে ধারণা করা হয় বেশি মুনাফার লোভে পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্ত থেকে সাপের বিষ সংগ্রহ করে চোরাচালান করে আসছে এসব চক্র। এর আগেও কয়েক বছর ধরে সাপের বিষ উদ্ধারের খবর নিয়মিতই পাওয়া যাচ্ছে। ২০১৭ সালে ঢাকা থেকেই ১২ পাউন্ড সাপের বিষ উদ্ধার করেছিল পুলিশ তখন যার মূল্য ছিল প্রায় ৬৮ কোটি টাকা। তার আগের বছর চুয়াডাঙ্গা থেকে বারো কোটি টাকা মূল্যের বিষ উদ্ধার করা হয়েছিল। অন্যদিকে ২০১৬ সালে পশ্চিমবঙ্গে জলপাইগুড়িতে প্রায় আড়াইশ কোটি টাকা মূল্যের সাপের বিষ উদ্ধারের ঘটনা বেশ আলোচনার জন্ম দিয়েছিল।

কোথা থেকে আসে বিষ, যায়ই বা কোথায়
আইন শৃঙ্খলা বাহিনীর মতে, এসব বিষ কাচের জার আকারে প্যাকেটজাত করা হয়। এসব জারের গায়ে অনেক সময় দেখা যায় জার উৎপাদনের স্থানের নাম। মূলত পাচারকারীরা সাপের বিষ পাচারের রুট হিসেবে বাংলাদেশকে ব্যবহার করে আসছে। বাংলাদেশ থেকে ইন্দোনেশিয়া ও মালয়েশিয়াসহ বিভিন্ন দেশে বিষ পাচার হয়। আবার কখনো সেসব দেশ থেকে এনেও অন্য দেশে নেয়া হয়। 

আরো পড়ুন: উড়োজাহাজ উড়িয়ে বিশ্বকে তাক লাগিয়ে দিল সাত বছরের শিশু

প্রসঙ্গত বাংলাদেশের আইনে সাপের বিষের লেনদেন বা ক্রয় বিক্রয় এবং পাচার দণ্ডনীয় অপরাধ। তারপরে আইন শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কর্মকর্তাদের ধারণা বছরে অন্তত একশ কোটি টাকা মূল্যের বিষ পাচার হয় বাংলাদেশকে রুট হিসেবে ব্যবহার করে। ফেনী, বেনাপোল, সাতক্ষীরা, যশোর, কুমিল্লাসহ কয়েকটি এলাকায় একাধিক চক্র গড়ে ওঠেছে যারা সাপের বিষ সংগ্রহ ও চোরাচালানের সাথে জড়িত বলে পুলিশের ধারণা।

সাপের কামড়ে বছরে শত শত মানুষ মারা যায় বিষ দিয়ে কি আসলেই ওষুধ তৈরি হয়? 

ঔষধ প্রশাসনের কর্মকর্তারা বলছেন দেশীয় কোনো প্রতিষ্ঠান ঔষধ তৈরিতে সাপের বিষ ব্যবহার করেনা। তবে উদ্ধারকৃত এসব আসলেই সাপের বিষ কিনা তা আগে পরীক্ষা করে দেখা দরকার। কয়েক বছর আগে এমন উদ্ধার করা সাপের বিষের নমুনা পরীক্ষার সুযোগ আমার হয়েছিল। সেগুলো বিষ ছিল না। তবে সেগুলো কি তা আমিও নিশ্চিত নই। মনে হয়েছিল মাদক জাতীয় কিছু হতে পারে। স্বল্প মাত্রায় সাপের বিষ দিয়ে মাদকের প্রচলন কোথাও কোথাও রয়েছে। তবে যা উদ্ধার হয়েছে তা নিয়ে যথাযথ পরীক্ষা হওয়া দরকার। 

এছাড়া কোথাও কোথাও সাপের বিষ ব্যবহার করে এক ধরণের যৌন উত্তেজক সামগ্রী তৈরি হয় যা অনেক দেশে পাচারও হয়। সাপের বিষে জিংক_সালফাইড নামক রাসায়নিক যৌগ পাওয়া যায়। সাপের বিষ মূলত একধরণের লালা জাতীয় পদার্থ, যাতে বিভিন্ন টক্সিক পদার্থ থাকে। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে সাপের বিষ ওষুধ তৈরিতে কাজে লাগে। তবে বাংলাদেশের ঔষধ প্রশাসনের কর্মকর্তারা বলছেন দেশীয় কোনো প্রতিষ্ঠান ঔষধ তৈরিতে সাপের বিষ ব্যবহার করে না।

আরো পড়ুন: গোখরার সঙ্গে তার বসবাস, ৩০ বছরে উদ্ধার করেছেন ৫২,০০০ সাপ

তবে ২০১৭ সাল থেকে অ্যান্টিভেনম তৈরির লক্ষ্যে একটি প্রকল্প নেয়া হয়। পাঁচ বছর মেয়াদি এ প্রকল্পে যুক্ত রয়েছে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগ, টক্সিকোলজি সোসাইটি অব বাংলাদেশ এবং জার্মানির গ্যেটে বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকেরা। প্রকল্পের জরিপের কাজ অর্থাৎ দেশি সাপের প্রায় সব ধরনের প্রজাতির ওপর জরিপ চালানো শেষ হয়েছে।

এছাড়া সবচেয়ে বিষধর সাপের প্রজাতি সংগ্রহ এবং সেগুলোর লালনপালনের জন্য লোকজনকে প্রশিক্ষণ দেয়ার কাজও চলছে। বিষধর সাপের জীবনযাপন ও দংশন প্রক্রিয়া সম্পর্কে পুরোপুরি জানার পরই অ্যান্টিভেনম তৈরির কাজটি সফল হবে বলে বিশেষজ্ঞরা মনে করেন।

ডেইলি-বাংলাদেশ/কেএসকে
লিংক সফলভাবে কপি হয়েছে!