কাটা পাহাড় রাস্তা একেক সময় সাজে একেক রূপে। দিনের আলো ফোটতেই শিক্ষার্থীদের পদচারণায় মুখর থাকে রাস্তাটি। শিক্ষার্থীরা ট্রেন বা বাস থেকে নেমে পায়ে হেঁটে বা সিএনজি-রিকশাযোগে ছুটে যান ক্লাসে। আনাগোনা শুরু হয় শিক্ষক- শিক্ষার্থী এবং বিভিন্ন শ্রেণি ও পেশার মানুষের। সন্ধ্যায় প্রেমিকযুগল হাতে হাত রেখে গল্প করে অথবা অভিমানের ঝাঁপি খুলে দেয় এই সড়কের ধারে বসেই। এই কাটা পাহাড় সড়ক যেন অসংখ্য যুগলের সম্পর্ক জোড়া লাগা ও ভেঙ্গে যাওয়ার নিরব সাক্ষী। কোনো দর্শনার্থী চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে ঘুরতে আসলে এই সড়কে হাঁটার অভিজ্ঞতাটুকু নিতে ভুলেন না কখনো। আর প্রাক্তন শিক্ষার্থীরা ক্যাম্পাসে বেড়াতে আসলে এই সড়কে দাঁড়িয়ে মুহূর্তটাকে ক্যামেরায় ফ্রেমবন্দি না করলে যেন তাদের ক্যাম্পাসে ছুটে আসাটা সার্থক হয় না।
প্রেম-বিরহ ছাড়াও বন্ধু-বান্ধবের আড্ডা, গান, শুটিং, জন্মদিন পালনেরও একটি আদর্শ জায়গা এই রাস্তা। সন্ধ্যা থেকে রাত, এমনকি গভীর রাতেও কাটা পাহাড় রাস্তা থেকে ভেসে আসে শিক্ষার্থীদের সম্মিলিত কণ্ঠে গানের সুর। মন খারাপের সময়ে সোডিয়াম লাইটের নিচে আলো-আঁধারি পরিবেশে হেঁটে প্রশান্তি খুঁজে পান অনেকে। এই সড়কে যে শুধু শিক্ষক-শিক্ষার্থী বা পথচারীর মুখরিত থাকে তা নয়, সন্ধ্যা হতেই এতে বিচরণ করতে শুরু করে বিভিন্ন বন্যপ্রাণী। পাহাড়ের গা ঘেঁষে উড়ে যায় পাখির ঝাঁক। দ্বিধাহীনভাবে রাস্তা পেরিয়ে চলে যায় বুনো শুয়োরের দল। সকালে দেখা মিলে মায়া হরিণের ঘাস খাওয়া কিংবা ছুটে চলার বিরল দৃশ্য।
.png)
বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী এহসান হাদি বলেন, আমার সবচেয়ে প্রিয় রাস্তা এটি। দুই পাশে উঁচু পাহাড়, মাঝখানে হেটে চলার অনুভূতি বলার বাইরে। বিশেষ করে শীতের সকালে তো মনে হয় যেন বরফের কোন দেশে আছি যখন রাস্তা ধরে ক্লাসে যাই।

আরেক শিক্ষার্থী নওরীন আখতার বলেন, হলে থাকাই সুবাদে এই রাস্তা দিয়েই সবসময় যাতায়াত করতে হয়। কখনো একা আবার কখনো দলবেঁধে। মায়ায় লেপটে আছে এই সড়কের স্মৃতিগুলো। মনে পড়ে একবার আমার জন্মদিনে হুটহাট করে বন্ধুরা সড়কের মাঝখানে কেক কেটে উদযাপন করে। আরো কত শত গল্প এখানে জমা হচ্ছে আমাদের। সন্ধ্যা ও নিয়ন বাতির আলোয় বসে বসে আড্ডা, গান, সত্যিই আনন্দের। চলে গেলে এসব খুবই পোড়াবে।
এত বিশেষত্ব থাকলেও এই রাস্তা জন্মের ইতিহাস কিন্তু ভিন্ন। বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠালগ্নে এখানে এমন কোনো রাস্তার অস্তিত্ব ছিল না। ১৯৬৬ সালে বিশ্ববিদ্যালয় যখন যাত্রা শুরু করে তখন বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন ভবন নির্মাণ সামগ্রী নিয়ে যাওয়ার জন্য পাহাড় কেটে ট্রাক চলাচল উপযোগী একটা রাস্তা তৈরি করা হয়। তখন শিক্ষার্থীদের আনা-নেয়ার জন্য স্টেশন ও হল থেকে বাসের ব্যবস্থা ছিল। এতে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রচুর টাকা ব্যয় হতো।
শিক্ষার্থীদের সহজে যাতায়াত ও বিশ্ববিদ্যালয়ের আর্থিক সাশ্রয়ের জন্য ১৯৯৯ সালে উপাচার্য ও সাবেক ইউজিসি চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. আব্দুল মান্নান সিন্ডিকেটে পাশ করিয়ে কাটা পাহাড় সড়কটি শিক্ষার্থীদের চলাচল উপযোগী করেন। শিক্ষার্থীদের স্বার্থেই বাস বন্ধ করে কাটা পাহাড় সড়ক চলাচল উপযোগী করায় গ্রেফতারি পরোয়ানা, হুমকি, আন্দোলনসহ নানা ঝক্কিঝামেলা পোহাতে হয় বলে জানান সাবেক ইউজিসি চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. আব্দুল মান্নান। যদিও এতে বিশ্ববিদ্যালয় আর্থিকভাবে অনেক লাভবান হয়। পরবর্তীতে প্রকৃতির অপরূপ শোভায় সুশোভিত হতে থাকে সড়কটি। পরিচিতি পায় একটি দর্শনীয় স্থান হিসেবে। পিচঢালা কালো রাস্তার দুই পাশে অতন্দ্র প্রহরীর মতো দাঁড়িয়ে থাকা পাহাড়ের সৌন্দর্যই আকৃষ্ট করে হাজারো প্রকৃতি প্রেমীকে। পাহাড় কেটে সড়কটি নির্মাণ করা হয় বলে এটি কাটা পাহাড় সড়ক নামে পরিচিতি পায়।