ঢাকা,  রোববার   ২০ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ৪ আশ্বিন ১৪৩৩

Advertisement
[ অর্থনীতি ]

তিন মাসে কোটিপতির ক্লাবে আরও ৫ হাজার!

মো. শাহজাহান মো. শাহজাহান
প্রকাশিত: ১৭:৩১, ২০ সেপ্টেম্বর ২০২৬
তিন মাসে কোটিপতির ক্লাবে আরও ৫ হাজার!
তিন মাসে ব্যাংক খাতে মোট আমানত বেড়েছে ৫২ হাজার ৪১৯ কোটি টাকা

মূল্যস্ফীতি, ব্যবসা-বাণিজ্যে ধীরগতি এবং সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় ক্রমাগত বাড়ার মধ্যেও দেশের ব্যাংক খাতে এক কোটি টাকার বেশি অর্থ থাকা হিসাবের সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। চলতি বছরের এপ্রিল-জুন প্রান্তিকে এ ধরনের হিসাব বেড়েছে ৫ হাজারেরও বেশি। একই সময়ে এসব হিসাবে জমা অর্থও বেড়েছে ১৬ হাজার কোটি টাকার বেশি।

বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ প্রকাশিত প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত মার্চ শেষে ব্যাংক খাতে এক কোটি টাকার বেশি অর্থ থাকা হিসাবের সংখ্যা ছিল ১ লাখ ৩৬ হাজার ৪৮৫। জুন শেষে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১ লাখ ৪১ হাজার ৫৬২টিতে। অর্থাৎ তিন মাসে এ ধরনের হিসাব বেড়েছে ৫ হাজার ৭৭টি। এর আগে গত বছরের ডিসেম্বর শেষে এক কোটি টাকার বেশি অর্থ থাকা ব্যাংক হিসাবের সংখ্যা ছিল ১ লাখ ৩৪ হাজার ৪৪টি। অর্থাৎ ছয় মাসে এ ধরনের হিসাব বেড়েছে ৭ হাজার ৫১৮টি। এই বৃদ্ধি অর্থনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ বাস্তবতাকে সামনে এনেছে—যেখানে একদিকে সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতা চাপে, অন্যদিকে বড় অঙ্কের আমানত ক্রমেই কেন্দ্রীভূত হচ্ছে।

Advertisement

তবে ব্যাংকে এক কোটি টাকার বেশি অর্থ থাকা হিসাবকে সরাসরি ‘কোটিপতির সংখ্যা’ হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। কারণ এসব হিসাবে ব্যক্তি ছাড়াও বিভিন্ন ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান, সরকারি সংস্থার অর্থ রয়েছে। একই ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান একাধিক ব্যাংক হিসাবও পরিচালনা করতে পারে। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য বলছে, মার্চ শেষে এক কোটি টাকার বেশি অর্থ থাকা হিসাবগুলোতে মোট আমানতের স্থিতি ছিল ৮ লাখ ৫৯ হাজার ১৬২ কোটি টাকা। জুন শেষে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৮ লাখ ৭৫ হাজার ৬৬০ কোটি টাকায়। তিন মাসে এসব হিসাবে আমানত বেড়েছে ১৬ হাজার ৪৯৮ কোটি টাকা। অর্থাৎ শুধু হিসাবের সংখ্যা নয়, এসব হিসাবে থাকা অর্থের পরিমাণও বেড়েছে। মোট আমানত বৃদ্ধির সঙ্গে এর তুলনা করলে বোঝা যায়, ব্যাংক খাতে আমানত বৃদ্ধির একটি বড় অংশ উচ্চ অঙ্কের হিসাবগুলোতেই জমা হচ্ছে কি না—সেটিও গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন।

চলতি বছরের মার্চ থেকে জুন—এই তিন মাসে ব্যাংক খাতে মোট আমানত বেড়েছে ৫২ হাজার ৪১৯ কোটি টাকা। মার্চ শেষে মোট আমানতের স্থিতি ছিল ২১ লাখ ৫৮ হাজার ২৪ কোটি টাকা। জুন শেষে তা বেড়ে হয়েছে ২২ লাখ ১০ হাজার ৪৪৪ কোটি টাকা। একই সময়ে ব্যাংক হিসাবের মোট সংখ্যাও বেড়েছে। মার্চ শেষে মোট হিসাব ছিল ১৮ কোটি ২৬ লাখ ১২ হাজার ১৫টি। জুন শেষে তা বেড়ে হয়েছে ১৮ কোটি ৬৩ লাখ ৮৪ হাজার ৫৮৮টি। তিন মাসে হিসাব বেড়েছে ৩৭ লাখ ৭২ হাজার ৫৭৩টি। উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, মোট আমানতের প্রায় ৪০ শতাংশই এখন এক কোটি টাকার বেশি থাকা হিসাবগুলোতে কেন্দ্রীভূত। অর্থাৎ প্রতি ১০০ টাকা আমানতের মধ্যে প্রায় ৪০ টাকাই বড় অঙ্কের হিসাবে জমা হচ্ছে। এই কেন্দ্রীভবন অর্থনীতির কাঠামোগত বৈশিষ্ট্যকে আরও স্পষ্ট করে তুলেছে।

বৈষম্যের চিত্র কতটা স্পষ্ট—এ প্রশ্ন এখন অর্থনীতির আলোচনায় জোরালো হয়ে উঠেছে। ব্যাংক খাতে উচ্চ অঙ্কের আমানত বাড়ার প্রবণতা এমন এক সময়ে দেখা যাচ্ছে, যখন সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় এখনো চাপে রয়েছে। দীর্ঘদিনের উচ্চ মূল্যস্ফীতিতে মানুষের প্রকৃত আয় কমেছে, অন্যদিকে ব্যবসা-বিনিয়োগে দুর্বলতা ও কর্মসংস্থানের অনিশ্চয়তাও রয়েছে। খাদ্য, জ্বালানি, পরিবহন ও স্বাস্থ্য খরচ বাড়ার কারণে নিম্ন ও মধ্যবিত্ত পরিবারগুলো হিমশিম খাচ্ছে। এই বাস্তবতায় ব্যাংকে বড় অঙ্কের আমানত বৃদ্ধির তথ্য অর্থনীতিতে সম্পদ ও আয়ের বণ্টন নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তুলতে পারে। 

বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর মো. মোস্তাকুর রহমান বিষয়টি নিয়ে বলেন, এক কোটি টাকার বেশি আমানত থাকা হিসাবের সংখ্যা বৃদ্ধি অর্থনীতিতে তারল্যের ইতিবাচক দিক নির্দেশ করে। তবে আমরা স্পষ্ট করে বলতে চাই, এসব হিসাবকে সরাসরি ব্যক্তিগত কোটিপতির সংখ্যা হিসেবে দেখা যাবে না। ব্যক্তি, প্রতিষ্ঠান ও সরকারি সংস্থার হিসাব মিলিতভাবে এখানে অন্তর্ভুক্ত। কেন্দ্রীয় ব্যাংক আমানতের ধরন আরও বিস্তারিতভাবে বিশ্লেষণ করে নীতিগত সিদ্ধান্ত নেবে। আমাদের লক্ষ্য হলো এই তারল্যকে উৎপাদনশীল খাতে প্রবাহিত করা।

অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেন বলেন, উচ্চ অঙ্কের আমানত বৃদ্ধি একদিকে ব্যাংকিং খাতে তারল্য বাড়ায়, অন্যদিকে সম্পদের কেন্দ্রীভবনের চিত্রও তুলে ধরে। মূল্যস্ফীতির চাপে সাধারণ মানুষ যখন হিমশিম খাচ্ছে, তখন বড় অঙ্কের আমানত বৃদ্ধি আয় ও সম্পদ বৈষম্যের প্রশ্ন সামনে আনে। এই অর্থ যদি উৎপাদনশীল বিনিয়োগে না যায়, তাহলে কর্মসংস্থান ও প্রবৃদ্ধিতে তার প্রভাব সীমিত থাকবে। কেন্দ্রীয় ব্যাংক ও সরকারকে নীতিমালা এমনভাবে সাজাতে হবে যাতে বড় আমানতকারীরা বিনিয়োগে উৎসাহিত হন।

সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) সম্মাননীয় ফেলো অধ্যাপক মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, ব্যাংক খাতে কোটি টাকার হিসাব বৃদ্ধি অর্থনীতির একটি বাস্তবতা। কিন্তু ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের হিসাব আলাদা করে দেখার ব্যবস্থা না থাকলে সম্পদের প্রকৃত বণ্টন বোঝা কঠিন। সরকার ও কেন্দ্রীয় ব্যাংকের উচিত আরও স্বচ্ছ তথ্য প্রকাশ করা, যাতে নীতি নির্ধারণ সহজ হয়। একইসঙ্গে উচ্চ আয়ের অর্থকে শিল্প, কৃষি ও অবকাঠামো খাতে প্রবাহিত করার প্রণোদনা বাড়াতে হবে। অন্যথায় অর্থনীতির ভারসাম্যহীনতা বাড়বে।

অর্থনীতিবিদ ড. সেলিম রায়হান বলেন, আমানত বৃদ্ধি ইতিবাচক হলেও এর কেন্দ্রীভবন উদ্বেগের বিষয়। যদি বড় অঙ্কের অর্থ শুধু ব্যাংকে জমা থাকে এবং ঋণ বিতরণে গতি না থাকে, তাহলে অর্থনীতির চাহিদা তৈরি হবে না। মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ তৈরি করা জরুরি। অন্যথায় বৈষম্য আরও বাড়বে এবং সামাজিক স্থিতিশীলতায় চাপ পড়বে।

সিনিয়র আইনজীবী ব্যারিস্টার তানিয়া আমির বলেন, ব্যাংক হিসাবের তথ্য গোপনীয়তা সংরক্ষণের আওতায় থাকে। তবে জ্ঞাত আয় বহির্ভূত সম্পদ বা অর্থপাচারের সন্দেহ থাকলে দুদক বা সংশ্লিষ্ট সংস্থা তদন্ত করতে পারে। শুধু হিসাব সংখ্যা বৃদ্ধি দিয়ে কাউকে অভিযুক্ত করা যায় না, তবে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা জরুরি। আইনগত কাঠামোকে আরও কার্যকর করতে হবে যাতে অবৈধ অর্থের প্রবাহ রোধ করা যায়।

সুশাসনের জন্য নাগরিকের (সুজন) সম্পাদক ড. বদিউল আলম মজুমদার বলেন, অর্থনীতিতে সম্পদের কেন্দ্রীভবন গণতন্ত্র ও সামাজিক ন্যায়বিচারের জন্য চ্যালেঞ্জ। ব্যাংকে বড় অঙ্কের আমানত বাড়লেও সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতা যদি না বাড়ে, তাহলে বৈষম্য আরও বাড়বে। সরকারের উচিত নীতিমালা এমনভাবে প্রণয়ন করা যাতে উচ্চ আয়ের অর্থ উৎপাদনশীল খাতে বিনিয়োগ হয় এবং সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার মান উন্নত হয়। স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা ছাড়া অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি টেকসই হবে না।

গত কয়েক বছরের তথ্য পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, এক কোটি টাকার বেশি আমানত থাকা হিসাবের সংখ্যা ধারাবাহিকভাবে বাড়ছে। ২০২১ সালের শেষে যা ছিল প্রায় এক লাখের কাছাকাছি, তা এখন দেড় লাখের কাছাকাছি পৌঁছেছে। 

ডেইলি-বাংলাদেশ//এসআই
লিংক সফলভাবে কপি হয়েছে!