ঢাকার টাকার বাজার
মতিঝিল থেকে রিকশায় শাহবাগ যাচ্ছিলাম। পৌঁছে ভাড়া দিতে গিয়ে ঘটলো বিপত্তি। পকেটে থাকা পঞ্চাশ টাকার নোটটি ছেঁড়া। রিকশাচালক নিতে রাজি হচ্ছেন না, তার ওপর নেই ভাংতি টাকা। পরে ব্যাগ হাতড়ে অনেক কষ্টে খুচরো দিয়ে ভাড়া দিলাম। বিরক্তও লাগছিল, ছেঁড়া টাকাটা নিয়ে এখন কী করব?
আপনিও কি কখনো এমন সমস্যার মুখোমুখি হয়েছেন? বাস্তবে সবাই কম-বেশি এমন পরিস্থিতিতে পড়ে যান। কিন্তু ছেঁড়া নোট পাল্টে নেয়ার কথা অনেক সময়ই মাথায় আসে না। আসলে ছেঁড়া–ফাটা নোট বদলে নেয়ার বিষয়ে সামান্য ধারণা না থাকার কারণে অনেককেই এই ভোগান্তি পোহাতে হয়। অনেক সময় ছেঁড়া বড় নোট বাজারে চলবে কি-না, এই দুশ্চিন্তায় উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েন গ্রাহক। ব্যাগের এক কোনায় পড়েই থাকে অচল নোটটি।
এই ছেঁড়া নোট নিয়ে আপনি সরাসরি চলে যেতে পারেন গুলিস্তান কিংবা মতিঝিলের নির্দিষ্ট কয়েকটি জায়গায়। জায়গা মতো পৌঁছলেই কানে আসবে এই কথা- ‘টাকা দেন, টাকা নেন’। সময় করে আমিও ব্যাগে পড়ে থাকা অচল নোটটির বদলে নতুন নোট নিয়ে নিলাম, যদিও পাঁচ টাকা কম পেলাম। তাতে মন্দ কি! জানা গেল, বছরের পর বছর ধরে এসব স্থানে প্রতিদিন বসে টাকার হাট। নতুন টাকার পসরা সাজিয়ে বসেন দোকানিরা, কেনেন পুরনো ছেঁড়া টাকা।
রাজধানীর গুলিস্তান-মতিঝিলে প্রতিদিন অন্তত ৪০টি টাকার দোকান বসে। এখানকার দোকানিরা নতুন টাকা বিক্রি করেন, আর ছেঁড়া টাকা কেনেন। শুধু পুরুষ নয়, এখানে আছেন নারী বিক্রেতাও। টাকা বিক্রি হয় নোট হিসেবে। দুই, পাঁচ, দশ, ২০, ৫০ ও ১০০ টাকার নতুন নোট হাজার হিসেবে বিক্রি হয়। সারা বছরই বিক্রি হয় নতুন টাকা। তবে সবচেয়ে বেশি বিক্রি হয় ঈদ-পার্বনের সময়।
প্রতিদিন সকাল আটটার দিকে নানা ঢঙয়ে নতুন টাকার পসরা সাজিয়ে বসেন বিক্রেতারা। আর রাত নয়টা-দশটা পর্যন্ত খোলা থাকে টাকার দোকান। বিক্রেতারা জানান, সবচেয়ে বেশি বিক্রি হয় ১০ টাকা ও ২০ টাকার নতুন নোট। দুই টাকা ও পাঁচ টাকার নোটের চাহিদা থাকলেও এতে নতুন নোটের সংকট বেশি।

গুলিস্তান শপিং কমপ্লেক্সের সামনের দোকানি ফয়সাল জানান, যদি কেউ ১০ টাকার নোটের এক হাজার টাকা নেন, তার কাছ থেকে অতিরিক্ত ৪০ টাকা রাখা হয়। ২০ টাকার নতুন নোট হাজারে ২০ টাকা, ৫০ টাকা হাজারের দাম রাখা হয় ৬০ টাকা, ১০০ টাকার ১০ হাজারের দাম রাখা হয় ৬০ টাকা। তবে ৫০০ ও ১০০০ টাকার নতুন নোট বিক্রি হয় না। তাই রাখাও হয় কম।
মনোবিজ্ঞানীদের মতে, নতুন টাকা কেনা মানুষের শখ। কারো শখ; আর কারো বা ব্যবসা। কেউ শখ করে কেনেন নতুন টাকা। আর কারো নতুন টাকা বিক্রি থেকে উপার্জিত অর্থে চলে সংসার। গুলিস্তানের আরেক দোকানি মোবারক বলেন, নতুন নোট ব্যাংক থেকে সংগ্রহ করি। নির্ধারিত কিছু লোক আছে, যারা নতুন নোট ব্যাংক থেকে তুলে আমাদের কাছে পাইকারি দামে বিক্রি করেন। সেই টাকা আমরা খুচরা দরে বিক্রি করি। প্রায় ১৬/১৭ বছর ধরে করছি টাকার ব্যবসা। প্রতিদিন যা আয় হয়, তাতে ডাল-ভাত খেয়ে সংসার চলে। চলে ছেলে সন্তানদের পড়াশোনা।
পুরাতন ছেড়া টাকা কেনা প্রসঙ্গে মোবারক হোসেন বলেন, টাকা ছিঁড়ে এমন অবস্থা হয়, আর কেউ নিতে চায় না। তখন সেই ছেঁড়া টাকাই আমাদের কাছে আসে। ছেঁড়া টাকা শতকরা ১০ টাকা কম দেয়া হয়। পুরাতন ছেঁড়া একশ’ টাকায় দেয়া হয় ৯০ টাকা। কোনো কোনো ক্ষেত্রে বেশি পুরাতন বা বেশি ছেঁড়া হলে, নোট হিসেবে ৮০ টাকাও দেয়া হয়।
বিক্রেতাদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, সারা বছরের তুলনায় ঈদের সময় নতুন টাকার বিক্রি অনেক বেশি। তখন দামও একটুকু বেশি পাওয়া যায়। বিশেষ করে ওই সময়টাতে যারা রাজধানী ছেড়ে পরিবার-পরিজনের সঙ্গে ঈদ উদযাপনে গ্রামে যান, তারাই কেনেন নতুন টাকা। তখন ক্রেতা সামলাতেও হিমশিম খেতে হয় তাদের। সারা বছরের কম বিক্রির হিসেবটা ঈদের সময়ে পুষিয়ে নেন তারা।
গুলিস্তানের টাকার হাটে কথা হয় তরুণ শোভনের সঙ্গে। দশটা ১০০ টাকার নতুন নোট কিনেছেন তিনি। কেন কিনছেন নতুন নোট জিজ্ঞাসা করতেই সরল ভঙ্গিমায় উত্তর, গার্লফ্রেন্ডের সঙ্গে দেখা করতে যাচ্ছেন তিনি। চোখের সামনে নতুন টাকা বাঁধলো, তাই গার্লফ্রেন্ডকে দেয়ার জন্য কিনছেন নতুন নোট। অকপটে বলেন, নতুন টাকা পেলে গার্লফ্রেন্ড খুব খুশি হবে।
সম্প্রতি ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের পক্ষ থেকে ফুটপাতে হকার বসার বিষয়ে কড়াকড়ির কারণে পথে বসার উপক্রম হয়ে পড়েছে এই টাকা ব্যবসায়ীদের। একটু সুযোগ নিয়ে বসার চেষ্টা করলেই পুলিশ ও সিটি করপোরেশনের নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকা স্বেচ্ছাসেবকরা তাড়া করেন। তখন টাকার ব্যাগ নিয়ে পালাতে হয় তাদের। মাঝেমধ্যে দেখা দেয় ছিনতাইকারীচক্র। তারা হঠাৎ করেই টাকার বান্ডেল নিয়ে দৌড় দেয়।