ঢাকা,  শুক্রবার   ০৯ অক্টোবর ২০২৬, ২৩ আশ্বিন ১৪৩৩

[ দেশজুড়ে ]

বজ্রপাতের ভয়াবহতা দেখে ২৪ বছর ধরে তালবীজ রোপণ করছেন আবুল কালাম

গাজী শাহাদত হোসেন ফিরোজী
প্রকাশিত: ১১:৫৮, ৯ অক্টোবর ২০২৬
বজ্রপাতের ভয়াবহতা দেখে ২৪ বছর ধরে তালবীজ রোপণ করছেন আবুল কালাম
বজ্রপাত থেকে মানুষকে রক্ষার প্রত্যয় নিয়ে ২৪ বছর ধরে সিরাজগঞ্জের বিভিন্ন এলাকায় তালবীজ রোপণ ও গাছের পরিচর্যা করে আসছেন আবুল কালাম আজাদ। ছবি: ডেইলি বাংলাদেশ

সিরাজগঞ্জ শহরের সয়াধানগড়া মধ্যপাড়া গ্রামের আবুল কালাম আজাদ। পেশায় দর্জি হলেও গাছ লাগানো ও পরিচর্যা করাই তাঁর নেশা। বজ্রপাত থেকে মানুষকে রক্ষার প্রত্যয় নিয়ে টানা ২৪ বছর ধরে বিভিন্ন স্থানে তালবীজ রোপণ করে যাচ্ছেন তিনি। এ পর্যন্ত তাঁর হাতে বোনা হয়েছে সাড়ে ১১ হাজার তালবীজ। পাশাপাশি রোপণ করেছেন অন্তত দুই হাজার খেজুরবীজ। নিজের উপার্জনের একটি অংশ ব্যয় করে সাইকেলে চড়ে নিয়মিত গাছগুলোর পরিচর্যাও করেন তিনি। স্থানীয়দের কাছে পরিচিতি পেয়েছেন ‘তালগাছপ্রেমী’ হিসেবে।

আবুল কালামের এই উদ্যোগের শুরু ২০০২ সালে। সেদিন কালিয়াহরিপুর ইউনিয়নের কল্যাণী গ্রামে মামার বাড়িতে দাওয়াত খেতে গিয়েছিলেন তিনি। দুপুরে বাড়িটিতে ছিলেন ১৫ থেকে ২০ জন আত্মীয়স্বজন। হঠাৎ বৃষ্টির সঙ্গে শুরু হয় একের পর এক বজ্রপাত।

আবুল কালাম আজাদ বলেন, হঠাৎ তাঁর চোখের সামনে একটি বজ্রপাত আঘাত হানে বাড়ির উঠানে থাকা উঁচু একটি তালগাছে। বিকট শব্দে কেঁপে ওঠে পুরো বাড়ি। চোখের পলকে বজ্রপাতের আঘাতে গাছটি চিরে ছিন্নভিন্ন হয়ে যায়।

তাঁর ভাষায়, তালগাছটি যেন বুক পেতে সেদিন সবাইকে রক্ষা করেছিল। গাছটি পুড়ে গেলেও বাড়িতে থাকা কারও কোনো ক্ষতি হয়নি। পরে স্থানীয়দের আলোচনায় তিনি জানতে পারেন, উঁচু তালগাছে বজ্রপাত আঘাত হানতে পারে এবং গাছের মাধ্যমে বিদ্যুৎ মাটিতে প্রবাহিত হতে পারে।

সেই ঘটনা তাঁর মনে গভীর রেখাপাত করে। মাঠে-ঘাটে বেশি করে তালগাছ থাকলে বজ্রপাতের ঝুঁকি মোকাবিলায় তা কাজে আসতে পারে, এমন ভাবনা থেকেই তালবীজ রোপণে আগ্রহী হয়ে ওঠেন তিনি। এরপর শুরু হয় তাঁর দীর্ঘ পথচলা।

সাইকেলে চড়ে গাছের পরিচর্যা

তালবীজ রোপণ করেই দায়িত্ব শেষ করেন না আবুল কালাম। গাছের পরিচর্যার জন্যও নিয়মিত ছুটে যান বিভিন্ন এলাকায়। গ্রীষ্মের তীব্র গরম, বর্ষার বৃষ্টি কিংবা শীতের সকাল, আবহাওয়া যেমনই হোক, প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম নিয়ে সাইকেলে বেরিয়ে পড়েন তিনি।

সঙ্গে থাকে কোদাল, পানির বোতল ও দা। চারার গোড়ায় আগাছা জন্মালে পরিষ্কার করেন। বৃষ্টিতে মাটি সরে গেলে অন্য জায়গা থেকে মাটি এনে গোড়ায় দেন। পাশাপাশি স্থানীয় বাসিন্দাদেরও গাছ রক্ষা ও পরিচর্যায় উৎসাহিত করেন।

সিরাজগঞ্জ শহরের কাটাখালি, ইলিয়ট ব্রিজ, সিরাজগঞ্জ সরকারি কলেজ, সিরাজগঞ্জ মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, শহররক্ষা বাঁধের ক্রসবার-৩ ও ৪ নম্বর এলাকা, সিরাজগঞ্জ-কাজীপুর সড়ক এবং সদর উপজেলার কালিয়াহরিপুর, বহুলী ও শিয়ালকোল ইউনিয়নের বিভিন্ন স্থানে তালবীজ রোপণ করেছেন তিনি।

এ ছাড়া এসব এলাকার সড়ক ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের আশপাশে অন্তত দুই হাজার খেজুরবীজ বুনেছেন।

চার টাকা খরচে একটি বীজ

তালবীজ সংগ্রহের জন্যও নানা পথ বেছে নিয়েছেন আবুল কালাম। কোথাও তালবীজের সন্ধান পেলেই ছুটে যান সেখানে। অনেকেই নিজ উদ্যোগে তাঁর কাছে বীজ পৌঁছে দেন। এ ছাড়া শহরের আবর্জনার স্তূপ ও তাল ব্যবসায়ীদের কাছ থেকেও বীজ সংগ্রহ করেন তিনি।

আবুল কালাম জানান, একটি তালবীজ রোপণ করতে সব মিলিয়ে প্রায় চার টাকা খরচ হয়। নিজের উপার্জনের একটি অংশ তিনি এ কাজে ব্যয় করেন। দীর্ঘদিন ধরে এভাবে গাছ লাগাতে গিয়ে অর্থ ও শ্রম দুটোই দিতে হচ্ছে তাঁকে।

শুরুর দিকে তাঁর এই উদ্যোগ পরিবারের সদস্যরা ভালোভাবে নেননি। প্রতিবেশীদের অনেকেও বিরক্ত হতেন। তবে সময়ের সঙ্গে তাঁদের মনোভাব বদলেছে। এখন পরিবারের সদস্যদের পাশাপাশি এলাকার অনেকেই তাঁর কাজে সহযোগিতা করছেন।

তিন কিলোমিটারজুড়ে তালগাছ

সম্প্রতি সিরাজগঞ্জ শহররক্ষা বাঁধের ক্রসবার-৩ এলাকায় গিয়ে দেখা যায়, বাঁধের বিভিন্ন স্থানে বেড়ে উঠেছে আবুল কালামের লাগানো তালগাছ। আট থেকে দশ বছর বয়সী অনেক গাছই এখন বেশ বড় হয়েছে।

বাঁধের প্রধান ফটক থেকে বিসিক শিল্পপার্ক এলাকার বেলুটিয়া পর্যন্ত প্রায় তিন কিলোমিটার অংশে তাঁর লাগানো দুই হাজারের বেশি তালগাছ দেখা যায়।

বাঁধের পাশের বাসিন্দা আবুল হাশেম বলেন, আবুল কালামের মতো নিঃস্বার্থ মানুষ খুব কম দেখা যায়। পরিবারের আপত্তি কিংবা স্থানীয়দের বিরূপ আচরণ, কোনো কিছুই তাঁকে গাছ লাগানো থেকে বিরত রাখতে পারেনি। নিজের জমি না থাকলেও সরকারি জায়গার পাশে তালগাছ লাগিয়ে যাচ্ছেন তিনি।

আবুল হাশেমের মতে, আবুল কালামের এই উদ্যোগ এলাকার মানুষের কাছে ইতিবাচক দৃষ্টান্ত হয়ে উঠেছে। তাঁর দীর্ঘদিনের প্রচেষ্টার কারণেই স্থানীয়রা তাঁকে ‘তালগাছপ্রেমী’ হিসেবে চেনেন।

উদ্যোগের পাশে থাকার আশ্বাস প্রশাসনের

সিরাজগঞ্জ সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মামুন খান বলেন, তালগাছের প্রাকৃতিক ও পরিবেশগত উপকারিতা অপরিসীম। দীর্ঘ ২৪ বছর ধরে একজন মানুষ নিজ উদ্যোগে তালগাছ লাগিয়ে যাচ্ছেন, এটি নিঃসন্দেহে মহৎ কাজ।

তিনি আরও বলেন, আবুল কালাম কোনো ধরনের সহযোগিতা চাইলে উপজেলা প্রশাসন তাঁর পাশে দাঁড়াবে।

নিজের সীমিত সামর্থ্য নিয়েই বছরের পর বছর গাছ লাগিয়ে যাচ্ছেন আবুল কালাম আজাদ। তাঁর স্বপ্ন, একদিন সিরাজগঞ্জের সড়ক, বাঁধ ও খোলা প্রান্তর তালগাছে ভরে উঠবে। তাঁর এই উদ্যোগ শুধু সবুজায়ন নয়, প্রকৃতি সংরক্ষণ ও বজ্রপাত সম্পর্কে জনসচেতনতা তৈরিতেও ভূমিকা রাখবে।

ডেইলি-বাংলাদেশ/সিরাজগঞ্জ/এমকে
ট্যাগ: সিরাজগঞ্জ
লিংক সফলভাবে কপি হয়েছে!