৩০ দিন ধরে নিখোঁজ, ছবি হাতে নাতনিকে খুঁজছেন ৭১ বছরের নানা
গায়ে গামছা জড়ানো। হাতে ১০ বছরের নাতনি রিথি আক্তারের ছবি। অসুস্থ শরীর নিয়ে ৭১ বছর বয়সী ইসমাইল শেখ ছুটে বেড়াচ্ছেন নাতনির সন্ধানে। কখনো আত্মীয়ের বাড়ি, কখনো আশপাশের এলাকা, আবার কখনো দূরের কোথাও নাতনির খোঁজ মিলতে পারে এমন খবর পেলেই সেখানে ছুটে যাচ্ছেন তিনি।
এক মাস ধরে নিখোঁজ রিথির অপেক্ষায় দিন কাটছে পরিবারের। নাতনিকে ফিরে পাওয়ার আশায় প্রতিদিনই নতুন করে খোঁজ শুরু করেন নানা ইসমাইল। শারীরিক অসুস্থতার কারণে কোনো দিন বের হতে না পারলে বাড়িতেই নাতনির ছবি হাতে বসে থাকেন তিনি।
গাজীপুরের শ্রীপুর উপজেলার বরমী ইউনিয়নের লাকচতল ভিটিপাড়া গ্রামের রিথি আক্তার লাকচতল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের চতুর্থ শ্রেণির শিক্ষার্থী। গত ২৯ আগস্ট বিকেল ৪টার দিকে কাউকে কিছু না বলে বাড়ি থেকে বের হওয়ার পর থেকে তার আর সন্ধান মেলেনি। এ ঘটনায় শ্রীপুর থানায় সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করেছে পরিবার।
.png)
রিথি শাহাদাত হোসেন ও জোনাকি আক্তারের মেয়ে। প্রায় নয় বছর আগে তার বাবা-মায়ের বিচ্ছেদ হয়। পরে মা অন্যত্র বিয়ে করে চলে গেলে রিথি ও তার বড় বোন নানা ইসমাইল শেখ ও নানি নুরজাহান বেগমের কাছে বড় হতে থাকে।
পরিবারের সদস্যরা জানান, নিখোঁজ হওয়ার দিন দুপুরে হাঁসের বাচ্চা খুঁজে না পাওয়ায় নানি রিথির সঙ্গে কিছুটা রাগ করে কথা বলেন। পরে পাশের বাড়ির সমবয়সী এক শিশুর কাছে নিজের অভিমানের কথা বলে রিথি। বিকেল ৪টার দিকে কাউকে কিছু না জানিয়েই বাড়ি থেকে বের হয়ে যায় সে।
সন্ধ্যা হলেও রিথি বাড়িতে না ফেরায় পরিবারের সদস্যরা প্রথমে আশপাশের বিভিন্ন জায়গায় খোঁজ করেন। আত্মীয়স্বজনের বাড়ি এবং সম্ভাব্য বিভিন্ন স্থানে খোঁজ করেও কোনো সন্ধান না পেয়ে পরে থানায় জিডি করা হয়।
মঙ্গলবার দুপুরে রিথিদের বাড়িতে গিয়ে দেখা যায়, বাড়ির বাইরে চেয়ারে বসে আছেন নানা ইসমাইল শেখ। অসুস্থ শরীর নিয়েও হাতে নাতনির ছবি। রিথির প্রসঙ্গ উঠতেই বারবার আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন তিনি।
ইসমাইল শেখ বলেন, “এমন কোনো দিন নাই যে আমি তারে খুঁজতে বাইর হইছি না। আজকা আমি অসুস্থ, তাই যাইতে পারতেছি না। কালকা ময়মনসিংহ রেলস্টেশনে খুঁজতে যাইয়াম।”
কথা বলতে বলতে কান্নায় ভেঙে পড়েন তিনি। বলেন, “যে যার কাছে যাইতে কইছে, তার কাছেই গেছি। কবিরাজের পর কবিরাজ ধরছি। কিন্তু কেউ নির্দিষ্ট কোনো জায়গার কথা কইতে পারে নাই।”
রিথির একটি ছবি হাতে নিয়ে ইসমাইল শেখ বলেন, “এই যে, এইডা রিথি। আমার রিথিরে যদি কোনো জায়গায় পান, তারে আমার বুকের মাইদ্দে ফিরায়া দিবাইন।”
বাড়ির উঠানে রিথির পোশাক দেখিয়ে তিনি বলেন, “এইযে রিথির কাপড়। এইগুলা পইরা রইছে। কিছুই নিয়া যায় নাই। ঘুমের মধ্যে মনে হয় রিথি আমারে ভাই কইয়া ডাকতাছে। খুব কষ্ট হয়।”
স্ট্রোকের পর শারীরিকভাবে অসুস্থ রিথির নানি নুরজাহান বেগমও নাতনির জন্য কাতর। শারীরিক অক্ষমতার কারণে তিনি বাইরে গিয়ে খোঁজ করতে পারেন না। ঘর থেকে রিথির স্কুলব্যাগ ও বই বের করে তিনি বলেন, “রিথি আমার আর তার নানার লগো গোমাইতো। সন্তানের মতো গু-মুত ফালায়া ডাংগর করছি মা ছাড়া। খালি মনে হয়, অক্কন যদি আয়া পরতো, তে তো ভালা অইতো।”
নুরজাহান আরও বলেন, “রিথি আমার সব কাজ কইরা দিত। আমারে গোসল হরাইয়া দিতো। রান্না করলে জাল দিয়া দিতো। এখন খালি পরান পোড়ে।”
রিথির মামাতো বোন আফরিন আক্তার বলেন, ছোটবেলা থেকেই তারা রিথিকে নিজেদের সন্তানের মতো করে বড় করেছেন। এক মাস ধরে তার নিখোঁজ থাকার বিষয়টি পরিবারকে ভেঙে দিয়েছে।
আফরিন বলেন, “রাতে ঘুমিয়ে থাকলে মনে হয়, সে আমাকে ডাকছে। আগে সারাক্ষণ সে আমাকে ডাকত, খোঁজত। এখন আর কেউ ডাকে না। তাকে খুব মিস করছি। পড়াশোনার কাজেও আমি তাকে সহযোগিতা করতাম। আমরা সবাই রিথির জন্য অপেক্ষা করছি।”
তিনি বলেন, “আমার দাদা রিথির ছবি হাতে নিয়ে প্রতিদিন বিভিন্ন এলাকায় গিয়ে খোঁজেন। আমরা যে যেখানে পারছি খুঁজছি। দাদার কষ্ট অনেক। তিনি কান্নাকাটি করেন, ঘুমের মধ্যে রিথির নাম ধরে ডাকেন। রিথিকে খুঁজে পেতে সবার সহযোগিতা চাই।”
স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, রিথি শান্ত স্বভাবের শিশু ছিল। বিদ্যালয়েও সে মেধাবী শিক্ষার্থী হিসেবে পরিচিত। তার নিখোঁজের ঘটনায় পরিবার ও স্থানীয়দের মধ্যে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
শ্রীপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মোহাম্মদ শাহীনুর আলম বলেন, “সাধারণ ডায়েরির আলোকে পুলিশ কাজ করছে। একই সঙ্গে সামাজিক ও পারিবারিকভাবেও শিশুটির খোঁজ করা দরকার।”
রিথির পরিবারের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, কোথাও তার সন্ধান পাওয়া গেলে শ্রীপুর থানায় অথবা পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে যোগাযোগ করতে অনুরোধ করা হয়েছে।