কারাম উৎসবের রঙে মেতে উঠেছে চলনবিলের আদিবাসী পল্লী
ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠান, প্রকৃতির বন্দনা আর ঝুমুর নৃত্যের ছন্দে সিরাজগঞ্জের চলনবিলাঞ্চলের আদিবাসী পল্লীগুলো এখন উৎসবমুখর। ভাদ্র মাসের পার্শ্ব একাদশী উপলক্ষে শুরু হয়েছে আদিবাসীদের ঐতিহ্যবাহী ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক আয়োজন কারাম উৎসব।
সিরাজগঞ্জ জেলা আদিবাসী বহুমুখী উন্নয়ন সংস্থার খৈচালা নির্মল মাহাতো বলেন, সময়ের সঙ্গে আদিবাসীদের অনেক ধর্মীয় রীতি, আচার ও অনুষ্ঠান হারিয়ে যাচ্ছে বা সংকুচিত হয়ে পড়ছে। তবে কারাম উৎসব এখনো তাদের সংস্কৃতির জীবন্ত নিদর্শন হিসেবে টিকে আছে।
.png)
বর্ষায় প্রকৃতি যখন সবুজে ভরে ওঠে, খাল-বিল ও নদী-নালা পানিতে পূর্ণ হয় এবং কৃষিকাজে কিছুটা বিরতি আসে, তখনই পালিত হয় এ উৎসব। আদিবাসীদের কাছে কারাম শুধু ধর্মীয় আয়োজন নয়; এটি তারুণ্য, ঐক্য, আনন্দ ও সামাজিক বন্ধনেরও প্রতীক।
পঞ্জিকা অনুযায়ী, ভাদ্র মাসের পার্শ্ব একাদশী থেকে কারাম উৎসব শুরু হয়। সোমবার বিশেষভাবে প্রস্তুত ‘জাঁওয়া’ ডালায় বীজ থেকে চারাগাছ গজানোর মাধ্যমে এবারের আয়োজন শুরু হয়েছে। মূল পূজা ও ধর্মীয় আচার সম্পন্ন হচ্ছে বুধবার রাতে।
চলনবিলের সাতটি উপজেলার অন্তত ৪৫ থেকে ৫০টি গ্রামে মাহাতো, কুর্মি, সাঁওতাল, ওঁরাও, বড়াইক, পাহান, মাহালি உள்ளிட்ட বিভিন্ন আদিবাসী সম্প্রদায়ের হাজারো মানুষ বংশপরম্পরায় এ উৎসব পালন করছেন।
আদিবাসীদের বিশ্বাস, পরিবারের মঙ্গল ও ফসলের ভালো ফলনের আশায় কারাম পূজা করা হয়। এ উপলক্ষে গ্রামের খোলা জায়গায় মাটিতে কারাম গাছের ডাল পুঁতে ফুল ও ফিতা দিয়ে সাজানো হয়। এরপর মাটির প্রদীপ জ্বালিয়ে গভীর রাত পর্যন্ত চলে পূজা, প্রার্থনা ও নানা সাংস্কৃতিক আয়োজন।
আদিবাসী শিক্ষার্থী মৌমিতা মাহাতো বলেন, প্রাচীন রীতি অনুযায়ী কারাম গাছের ডাল কেটে পূজা করা হয়। এ কারণে অনেক এলাকায় এ আয়োজনকে **‘ডাল পূজা’**ও বলা হয়। কারাম উৎসবে অংশগ্রহণকারীদের, যাদের ‘কেরমেতি’ বলা হয়, পাঁচ থেকে সাত দিন আমিষ, তেল, হলুদসহ বিভিন্ন মসলা জাতীয় খাবার থেকে বিরত থাকতে হয়। তাদের বিশ্বাস, নিয়ম ভঙ্গ করলে জাঁওয়ায় অঙ্কুরিত বীজ উৎপন্ন হবে না।
‘জাঁওয়া’ হলো একটি প্রতীকী ধারক। এতে মাটি, মুগ, কুর্থি, ছোলা உள்ளிட்ட বিভিন্ন বীজ অঙ্কুরিত করে রাখা হয়। আদিবাসীদের কাছে জাঁওয়া প্রকৃতির সন্তানের মতো। এর পরিচর্যা ও সংরক্ষণ প্রকৃতির শক্তির প্রতি শ্রদ্ধা ও পূজারই একটি অংশ।
মঙ্গলবার রাতে ছিল পূজার চূড়ান্ত আয়োজন। এ রাতে কেরমেতিরা বাড়ির আঙিনায় কারাম গাছের ডাল পুঁতে শাপলা ফুল, শসা ও ফিতা দিয়ে সাজান। ডালের গোড়ায় ডালা রেখে কাঁসার থালায় বরণডালা নিয়ে পূজায় অংশ নেন তারা। প্রদীপ জ্বালিয়ে শুরু হয় রাতের আরাধনা, যা চলে গভীর রাত পর্যন্ত।
ধর্মীয় আনুষ্ঠানিকতার পাশাপাশি কারাম উৎসবকে ঘিরে আদিবাসী পল্লীগুলোতে বসে লোকজ সংস্কৃতির আসর। চলে ঐতিহ্যবাহী ঝুমুর নৃত্য ও লোকগান। শিশু থেকে বৃদ্ধ—সব বয়সী মানুষ এতে অংশ নিয়ে উৎসবের আনন্দ ভাগ করে নেন।
কারাম উৎসব তাই শুধু একটি ধর্মীয় আচার নয়; প্রকৃতি, ফসল, বংশপরম্পরা ও মানুষের পারস্পরিক সম্পর্ককে ঘিরে গড়ে ওঠা আদিবাসী সংস্কৃতির গুরুত্বপূর্ণ অংশ। নানা পরিবর্তন ও প্রতিকূলতার মধ্যেও চলনবিলের মাটিতে সেই ঐতিহ্য এখনো টিকে আছে।