উপজেলার কয়েকটি এলাকায় এখনো টিকে আছে বাঁশের তৈরি এসব সিলিং ও বেড়া তৈরির কাজ। এ শিল্পের সঙ্গে এখনো অন্তত ৩০ থেকে ৪০টি পরিবার জড়িত। পৈত্রিক সূত্রে পাওয়া এই পেশা ধরে রেখেছেন তারা। এ কাজ থেকে যা আয় হয়, তা দিয়েই চলছে তাদের সংসার।
জানা গেছে, গ্রামীণ এলাকায় একসময় এ সিলিংয়ের ব্যাপক চাহিদা ছিল। বাঁশ দিয়ে তৈরি বিশেষ এই বেড়া ও সিলিং রোদের তাপ কমিয়ে দেয়, ফলে গরমে ঘর ঠান্ডা রাখতে সহায়ক। স্থানীয়ভাবে বাঁশ দিয়ে তৈরি ঘরের সিলিংকে ‘ঘরের কাড়’ নামেও ডাকা হয়। এছাড়া এই সিলিংয়ের ওপর বিভিন্ন জিনিসপত্র রাখা যায়। নানা রঙের আলপনা দিয়ে সাজালে এর সৌন্দর্যও বেড়ে যায়। এ কারণেই অনেকে একে ‘গরিবের এসি’ বলে থাকেন।
.png)
সিলিং ও বেড়া তৈরিতে সাধারণত তল্লা, মুলি ও নলি বাঁশ, সুতলি, গুণা, তারকাটা, দা, সাবল, হাতুড়ি ও করাতের প্রয়োজন হয়। এসব উপকরণ সহজেই স্থানীয় বাজারে পাওয়া যায়। একটি মাঝারি আকারের বাঁশ কয়েকটি খণ্ডে কেটে ফালটা দা দিয়ে পাতলা করে চেঁছে ‘চটা’ তৈরি করা হয়। পরে এসব চটা শীতল পাটির মতো বুনে তৈরি করা হয় সিলিং ও বেড়া।
একটি সমান জায়গায় ১০ হাত প্রস্থ রেখে ৫০ থেকে ১০০ হাত লম্বা দুটি বাঁশের কাঠামো তৈরি করা হয়। প্রতি এক হাত সিলিং বা বেড়া তৈরিতে প্রায় ১২টি চটার প্রয়োজন হয়। এই চটাগুলো বুনন কৌশলে বসিয়ে বাহারি নকশার সিলিং তৈরি করা হয়। প্রতিদিন তিনজন কারিগর মিলে প্রায় ৬০ থেকে ৮০ হাত সিলিং বা বেড়া তৈরি করতে পারেন।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, উপজেলার কোদালিয়া চৌরাস্তা বাজার, তারাকান্দি বাজার, পুলেরঘাট বাজার, জাঙ্গালিয়া বাজার, মির্জাপুর বাজার, মটখলা বাজার ও আলীশাহা বাজার এলাকায় এই শিল্প এখনো টিকে আছে। প্রতিদিন সকাল থেকে বিকেল পর্যন্ত চলে সিলিং ও বেড়া তৈরির কাজ। গরমের সময় এটির চাহিদা তুলনামূলক বেশি থাকে। তাপ শোষণ করে ঘরের তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণে রাখতে বাঁশের সিলিং সহায়ক।
এই সিলিং তৈরির জন্য বিশেষ ধরনের মুলি বাঁশ ব্যবহার করা হয়। এসব বাঁশ মূলত গাজীপুরের শ্রীপুর, উজলী ও মাওনা এলাকার পাহাড়ি অঞ্চল থেকে সংগ্রহ করা হয়।
উপজেলার কোদালিয়া চৌরাস্তা বাজার এলাকায় প্রায় ৪০ বছর ধরে এ শিল্পের চর্চা চলছে। সেখানে গিয়ে দেখা যায়, ভোরের আলো ফোটার আগেই শুরু হয় কারিগরদের কর্মব্যস্ততা। কেউ নতুন সিলিং বুনছেন, আবার কেউ রং করছেন। আগে এখানে নিয়মিত ১০ থেকে ১৫ জন কারিগর কাজ করতেন। এখন সেই সংখ্যা কমে দাঁড়িয়েছে পাঁচজনে।
কোদালিয়া চৌরাস্তা বাজারের প্রধান কারিগর আবদুল জলিল প্রায় ৩০ বছর ধরে এ শিল্পের সঙ্গে জড়িত। তার দলে রয়েছেন আরো দুইজন কারিগর।
কারিগর আবদুল জলিল বলেন, এই সিলিং তৈরি করা বেশ কষ্টসাধ্য। কিন্তু পরিশ্রম অনুযায়ী আয় খুব একটা হয় না। বাঁশের দাম বেড়েছে, পরিবহন খরচও বেশি। তবুও শিল্পটাকে বাঁচিয়ে রাখার চেষ্টা করছি। এখনো মানুষের কাছে এর কিছু চাহিদা রয়েছে। বেড়ার ধরন অনুযায়ী দাম নির্ধারণ করা হয়।
আরেক কারিগর মেনু মিয়া বলেন, এই কাজ করে সংসার চালানো এখন খুব কঠিন। ছোটবেলা থেকে এই কাজ শিখেছি। অনেকেই এর মধ্যে অন্য পেশায় চলে গেছেন। সরকার যদি সহযোগিতা করত, তাহলে এ শিল্প টিকিয়ে রাখতে আমাদের উৎসাহ বাড়ত।
পাকুন্দিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) রূপম দাস জানান, ঐতিহ্যবাহী এ শিল্পকে টিকিয়ে রাখতে কারিগরদের সরকারি সহায়তার আওতায় আনার উদ্যোগ নেয়া হবে।