ঢাকা,  মঙ্গলবার   ০৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ২৩ ভাদ্র ১৪৩৩

Advertisement
[ দেশজুড়ে ]

পেঁয়াজ-মরিচ-রসুনের বীজ স্বল্পতায় থমকে গেছে চাষাবাদ

কামরুজ্জামান মিন্টু, ময়মনসিংহ
প্রকাশিত: ১৪:৪৯, ২৬ নভেম্বর ২০২৪
পেঁয়াজ-মরিচ-রসুনের বীজ স্বল্পতায় থমকে গেছে চাষাবাদ
ছবি: ডেইলি বাংলাদেশ

ময়মনসিংহে অবস্থিত বাংলাদেশ পরমাণু কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট (বিনা) উচ্চ ফলনশীল পেঁয়াজ, মরিচ ও রসুন গত ৫ বছর আগে উদ্ভাবন করলেও চাষাবাদের আওতায় আনতে পারেনি। এতে কম উৎপাদনশীল জাত চাষ করতে বাধ্য হচ্ছেন কৃষকরা। যদিও দ্রুত সময়ের মধ্যে বীজ সংকট কাটিয়ে উঠার প্রচেষ্টা চালাচ্ছে প্রতিষ্ঠানটি।

ইনস্টিটিউট সূত্র জানায়, উন্নত জাতের এসব ফসল চাষ করতে কৃষকরা বেশ আগ্রহী। অনেকে বীজ সংগ্রহের জন্য নিয়মিত ইনস্টিটিউটে যোগাযোগ করছেন। কিন্তু বীজ স্বল্পতার কারণে দেওয়া হচ্ছে না। বীজ সংকট কাটিয়ে উঠতে বিনার প্রদর্শনী মাঠে বিস্তর জায়গাজুড়ে এসব মসলার ফসল চাষ করা হয়েছে।

বিনার উদ্ভাবিত মসলার জাতগুলোর মধ্যে রয়েছে- বিনাপেঁয়াজ-১, বিনাপেঁয়াজ-২, বিনামরিচ-১ ও বিনারসুন-১। এছাড়া নতুন উদ্ভাবিত বিনাহলুদ-১ জাতটি ছড়িয়ে দিতে নানা পরিকল্পনা করছেন গবেষকরা। চাষের আওতায় আনতে প্রথমে বীজ উৎপাদনের দিকেই জোড় দেওয়া হচ্ছে।

Advertisement

গবেষকরা জানান, শুধু শীতকালে পেঁয়াজ উৎপাদন করে দেশে পেঁয়াজের চাহিদা মেটানো সম্ভব না। এ জন্য গ্রীষ্মকালে পেঁয়াজ উৎপাদন করতে ২০০৬ সাল থেকে গবেষণা শুরু হয়। গবেষণার ধারাবাহিকতায় উন্নত বৈশিষ্ট্যের হওয়ায় বাণিজ্যিকভাবে চাষাবাদের জন্য ২০১৮ সালে বিনাপেঁয়াজ-১ ও বিনাপেঁয়াজ-২ নামে অনুমোদন দেয় জাতীয় বীজ বোর্ড।

বিনামরিচ-১ জাতের ফলন (গ্রিন চিলি) প্রতি হেক্টরে ৩০ থেকে ৩৫ টন পাওয়া যায়। জাতটি স্থানীয় জাতের তুলনায় ১৩০ থেকে ১৪০ ভাগ বেশি ফলন দেয়। আর বিনারসুন-১ জাতটি প্রতি হেক্টরে ১৩ থেকে ১৫ টন উৎপাদন করা সম্ভব। যা অন্যান্য জাতের তুলনায় প্রায় দেড় গুণ বেশি। বিনামরিচ-১ ও বিনারসুন-১ জাতগুলো উদ্ভাবনের জন্য ২০১২ সাল থেকে গবেষণা শুরু হয়। এরই ধারাবাহিকতায় ২০১৭ সালে ফলন পরীক্ষায় সন্তোষজনক হয়। ওই বছরই জাতীয় বীজ বোর্ড বাণিজ্যিকভাবে চাষাবাদের জন্য অনুমোদন দেয়।

বিনাপেঁয়াজ-১ ও বিনাপেঁয়াজ ২ খরিফ-১ মৌসুমে অর্থাৎ কন্দ উৎপাদন মৌসুমে এ দুই জাতের পেঁয়াজে তেমন কোনো পোকামাকড় ও রোগবালাইয়ের আক্রমণ হয় না। এ জাত অন্য জাতের চেয়ে অধিক কন্দ ও বীজ উৎপাদনে সক্ষম। এ ছাড়া এগুলোর কন্দের সংরক্ষণকাল স্বাভাবিক অবস্থায় দুই মাস বা তার চেয়ে বেশি এবং একই বছরে বীজ থেকে বীজ উৎপাদন করা সম্ভব, যা দেশে অন্য জাতের ক্ষেত্রে দেখা যায় না। উদ্ভাবিত এই দুই জাতের পেঁয়াজ হেক্টরপ্রতি ৮ থেকে ১০ টন উৎপাদন হবে।

রবি মৌসুমে অক্টোবর থেকে নভেম্বরের প্রথম সপ্তাহকে নির্ধারণ করে জমিতে বীজ বপন করতে হবে। খরিপ-১ মৌসুমে (গ্রীষ্মকালীন ফসল) কন্দ (পেঁয়াজের চারা) উৎপাদনের জন্য মধ্য জানুয়ারিতে বীজ বপন করতে হবে।

এ ছাড়া রবি মৌসুমে বীজের জন্য চারা রোপণ করলে অবশ্যই ডিসেম্বরের প্রথম সপ্তাহ থেকে মধ্য ডিসেম্বরেই (অগ্রহায়ণের তৃতীয় সপ্তাহ থেকে চতুর্থ সপ্তাহ) করতে হবে। খরিফ-১ মৌসুমে কন্দ উৎপাদনের জন্য চারা রোপণ করতে হবে মধ্য ফেব্রুয়ারি থেকে মার্চের প্রথম সপ্তাহ (ফাল্গুনের প্রথম থেকে দ্বিতীয় সপ্তাহ) পর্যন্ত।

মরিচের আবাদবিনামরিচ-১ ও বিনারসুন-১ এর উদ্ভাবক বিনার প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ও উদ্যানতত্ত্ব বিভাগের প্রধান ড. রফিকুল ইসলাম। তিনি বীজ সল্পতার বিষয়টি উল্লেখ করে বলেন, উদ্ভাবনের পরের বছর আমাদের কাছে পর্যাপ্ত বীজ ছিল। কিন্তু তখন কৃষকরা না জানার কারণে চাষাবাদের আওতায় আনা সম্ভব হয়নি। তখন থেকেই জাতগুলো সম্পর্কে কৃষকদের অবগত করার বিষয়ে জোড় দেওয়া হয়। গত কয়েক বছরে কৃষকদের পর্যাপ্ত বীজ দেওয়া হয়েছে। তারা এগুলো চাষ করে লাভবান হওয়ায় বীজ সংগ্রহের জন্য আমাদের সঙ্গে যোগাযোগ করছেন। কিন্তু বর্তমানে আমাদের কাছে পর্যাপ্ত বীজ না থাকায় দিতে পারছি না।

তিনি আরো বলেন, আগামী বছর উচ্চ ফলনশীল এসব মসলা সারাদেশের বেশিভাগ জেলায় চাষের আওতায় আনতে পরিকল্পনা নেয়া হয়েছে। এ জন্য বীজ উৎপাদনের দিকেই মনোযোগ দেওয়া হয়েছে।

মরিচের জাতটি সম্পর্কে ড. রফিকুল ইসলাম বলেন, প্রতি হেক্টরে ৩০ থেকে ৩৫ টন পাওয়া যায়। জাতটি স্থানীয় জাতের তুলনায় ১৩০ থেকে ১৪০ ভাগ বেশি ফলন দেয়। ঝাল তুলনামূলকভাবে কম ও সুগন্ধিযুক্ত এবং সাকুলেন্ট (পানি শোষণের ক্ষমতা)। এ গাছটি আকারে খাটো ও ঝোপালো। প্রথম মরিচ সংগ্রহের পর গাছে ফলনের সংখ্যা বৃদ্ধি পেতে থাকে। এটি আকারে বড় ও মাংসল।
চারা লাগানোর মাত্র ৩০ থেকে ৩৫ দিন পর গাছে ফুল আসা শুরু করে এবং পরবর্তী ২৮ দিনের মধ্যে কাঁচা মরিচ পাওয়া যায়। সাধারণত এভাবে ৯ থেকে ১২ বার কাঁচামরিচ তোলা যায়।

এছাড়া বিনারসুন-১ প্রচলিত জাতের তুলনায় কার্যক্ষমতা বেশি। রোপণের পর মাত্র ১৩৫ থেকে ১৪৫ দিনের মধ্যে রসুন ঘরে তোলা যায়। আকারে বড় হওয়ায় উৎপাদন বেশি হয়। এর প্রতিটি রসুনের কন্দে ২৪ থেকে ৩০টি কোয়া থাকে। উৎপাদন খরচ অনেক কম এবং রোগবালাই ও পোকামাকড়ের আক্রমণ প্রচলিত জাতের চেয়ে খুবই কম। ঝাঁজ বেশি হওয়ায় রান্নায় রসুনের পরিমাণও লাগবে কম।

বিনাহলুদ-১ সম্পর্কে ড. রফিকুল ইসলাম বলেন, ২০১৭ সালের শুরুতে পুরোদমে গবেষণা শুরু হয়। ২০১৯ সালে সন্তোষজনক ফলন পাওয়া যায়। একই বছর জাতীয় বীজ বোর্ড কৌলিক সারিটিকে বিনাহলুদ-১ নামে নিবন্ধন করে। কারণ, নতুন জাতটি প্রতি হেক্টরে ৩০ থেকে ৩৩ টন ফলন হয়। যা প্রচলিত জাতের তুলনায় প্রায় দ্বিগুণ। এতে গাঢ় হলুদ ও শুষ্ক পদার্থের পরিমাণ শতকরা ৩৮ থেকে ৪০ ভাগ। এটি পাহাড়ি ও সমতলে চাষ উপযোগী। সেদ্ধ করে শুকালে রঙের পার্থক্য হয় না এবং রান্নায় তিতাভাব থাকে না। লিফব্লচ ও রাইজোম রট রোগসহনশীল। বপনের ৩১০ দিনের মধ্যে ফলন সংগ্রহ করা যায়।

তিনি বলেন, জাতটি নতুন হলেও আমাদের কাছে পর্যাপ্ত বীজ ছিল। কিন্তু কৃষকরা জাতটি সম্পর্কে দ্রুত অবগত হওয়ায় নিজেরাসহ অনেকের মাধ্যমে যোগাযোগ করছে। আমরা সল্পমূল্যেসহ বিনামূল্যে বীজগুলো দিয়েছি। এজন্য বর্তমানে বীজের পরিমাণ কম। তবুও বীজ উৎপাদনের মাধ্যমে কৃষক পর্যায়ে হলুদের নতুন জাতটি ছড়িয়ে দেওয়া অব্যাহত রয়েছে।

এ বিষয়ে বাংলাদেশ পরমাণু কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউটের মহাপরিচালক ও বিনাপেঁয়াজ-১ ও বিনাপেঁয়াজ ২ এর উদ্ভাবক ড. আবুল কালাম আজাদ বলেন, বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তারা নতুন নতুন জাত উদ্ভাবনে নিরলসভাবে গবেষণা চালিয়ে যাচ্ছেন। কৃষকদের মাঝে উদ্ভাবিত বীজগুলো ছড়িয়ে দিতে আমাদের চেষ্টা চলছে। এ জন্য বীজ উৎপাদনের প্রতি সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। উচ্চফলন হওয়ায় কৃষকরা একবার চাষ করলে বারবার চাষ করতে চাইবে। তাই জাতগুলো ছড়িয়ে দিতে পারলে দেশে মসলার ফলন উৎপাদনে বিপ্লব ঘটবে।

ডেইলি-বাংলাদেশ/এমআই
লিংক সফলভাবে কপি হয়েছে!