সড়ক অবরোধের কারণে একদিকে শ্রমিকদের দাবি উঠে এসেছে, অন্যদিকে ভোগান্তিতে পড়েছে সাধারণ মানুষ। চিকিৎসার জন্য ঢাকায় যাওয়া রোগী থেকে শুরু করে কর্মজীবী মানুষ, এমনকি শিক্ষার্থীরাও চরম দুর্ভোগের শিকার।
শ্রমিকদের বকেয়া বেতন নিয়ে ক্ষোভ: যে কারণে আন্দোলনে নামলেন তারা
.png)
বেক্সিমকো গ্রুপের শ্রমিকদের অভিযোগ, অক্টোবর মাসের বেতন ১২ তারিখের মধ্যে পরিশোধ করার কথা থাকলেও এখনো তাদের হাতে বেতন পৌঁছায়নি। দীর্ঘ বিলম্বে বেতন পরিশোধের কারণে তাদের সংসারে সংকট দেখা দিয়েছে। একজন বিক্ষুব্ধ শ্রমিক বলেন, আমাদের পরিবার এই বেতনের ওপর নির্ভরশীল। ঘর ভাড়া, বাজার খরচ, ওষুধসহ সব কিছুই এই টাকায় চলে। কিন্তু আমরা এখনো বেতন পাইনি। কর্তৃপক্ষ বারবার শুধু আশ্বাস দেয়, কিন্তু কোনো সমাধান আসে না। আমরা বাধ্য হয়ে রাস্তায় নেমেছি।
শ্রমিকরা জানিয়েছেন, তাদের আন্দোলনের পেছনে বারবার কর্তৃপক্ষের প্রতিশ্রুতি ভঙ্গের বিষয়টি বড় ভূমিকা রেখেছে। তারা বলছেন, বেতন না পেলে আমরা খাব কীভাবে? আমাদের সন্তানদের পড়াশোনা বন্ধ হয়ে যাবে। আমরা আর কোনো আশ্বাস শুনতে চাই না। আমাদের দাবি পূরণ না হলে আন্দোলন চলতেই থাকবে।
বিক্ষোভে অংশ নেয়া শ্রমিকরা বেক্সিমকো গ্রুপের বিভিন্ন শাখার কর্মী। এরমধ্যে রয়েছে বেক্সিমকো টেক্সটাইল লিমিটেড, বেক্সিমকো ডেনিম লিমিটেড, বেক্সিমকো ওয়াশিং লিমিটেড, বেক্সিমকো নিটিং, বেক্সিমকো গার্মেন্টস ইয়োলো, সাইনপুকুর সিরামিকস লিমিটেড এবং এসএস ফ্যাশনসহ আরো অনেক প্রতিষ্ঠান।
অবরোধের কারণে সড়কে অচলাবস্থা: ক্ষোভে ফুঁসছে যাত্রীরা
শ্রমিকদের সড়ক অবরোধের কারণে ঢাকা-টাঙ্গাইল মহাসড়কে সব ধরনের যান চলাচল বন্ধ হয়ে গেছে। মহাসড়কের দুই পাশে প্রায় ১০ কিলোমিটার দীর্ঘ যানজট তৈরি হয়েছে। তীব্র রোদে গাড়ির ভেতরে আটকে থাকা যাত্রীরা ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন।
রংপুর থেকে ঢাকাগামী একটি বাসের চালক রশিদ মিয়া বলেন, আমি রাতভর গাড়ি চালিয়েছি। শরীর ক্লান্ত, একটু বিশ্রাম নিতে চেয়েছিলাম। কিন্তু এখানে এসে আটকে পড়েছি। যাত্রীদের নামিয়ে দিতে বাধ্য হয়েছি। সবাই অসহায়ভাবে রাস্তার পাশে অপেক্ষা করছে। এই অবস্থায় গাড়ি চালানো আর শরীর চালানো- কোনোটাই সম্ভব হচ্ছে না।
চিকিৎসা ও জরুরি প্রয়োজনে ভোগান্তি
শুধু দূরপাল্লার যাত্রীরাই নন, সড়ক অবরোধের কারণে স্থানীয় বাসিন্দারাও সমস্যায় পড়েছেন। অনেকেই জরুরি প্রয়োজনে গন্তব্যে পৌঁছাতে পারছেন না। বিশেষ করে চিকিৎসার জন্য ঢাকা বা অন্যান্য স্থানে যেতে চাওয়া রোগী ও তাদের স্বজনদের ভোগান্তি চরমে পৌঁছেছে।
পাবনা থেকে ঢাকায় চিকিৎসার জন্য আসা সালমা বেগম বলেন, আমার স্বামী গুরুতর অসুস্থ। আমরা রাতেই রওনা দিয়েছিলাম, যাতে সকালে চিকিৎসকের কাছে পৌঁছাতে পারি। কিন্তু এখানে এসে আটকে গেছি। রাস্তায় বসে আছি, অথচ আমরা কিছুই করতে পারছি না।
পুলিশ ও প্রশাসনের ভূমিকা: সমাধানের চেষ্টা
অবরোধের খবর পেয়ে স্থানীয় প্রশাসন ও পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা ঘটনাস্থলে উপস্থিত হন। তারা শ্রমিকদের সঙ্গে আলোচনার মাধ্যমে সমস্যার সমাধান করার চেষ্টা করছেন।
গাজীপুর শিল্প পুলিশের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মো. শহিদুল ইসলাম বলেন, শ্রমিকদের দাবিগুলো যুক্তিসঙ্গত। আমরা তাদের সঙ্গে আলোচনা করছি এবং দ্রুত সমস্যার সমাধান করার চেষ্টা করছি। তবে সড়কের অবরোধ তুলে নেয়ার জন্য তাদের অনুরোধ জানিয়েছি।
কর্তৃপক্ষের পক্ষ থেকে শ্রমিকদের দাবিগুলো নিয়ে আলোচনা চলছে বলে জানা গেছে। তবে শ্রমিকরা জানিয়েছেন, বকেয়া বেতন পরিশোধ না হলে তারা অবরোধ তুলে নেবেন না।
দীর্ঘস্থায়ী আন্দোলনের শঙ্কা: সাধারণ মানুষের উদ্বেগ
শ্রমিকদের আন্দোলন দীর্ঘস্থায়ী হলে মহাসড়কের অচলাবস্থা আরো বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। এতে শুধু যাত্রী নয়, পণ্যবাহী যানবাহনের চালকরাও ক্ষতির মুখে পড়বেন।
শ্রমিকরা জানিয়েছেন,আমরা যতদিন বেতন না পাব, ততদিন আন্দোলন চালিয়ে যাব। প্রয়োজনে আরো কঠোর কর্মসূচি ঘোষণা করা হবে।
বকেয়া বেতন পরিশোধের দাবিতে শ্রমিকদের আন্দোলন যেমন তাদের জীবনধারার সংকট তুলে ধরেছে, তেমনই এই আন্দোলন সড়কে সাধারণ মানুষের ভোগান্তিও বাড়িয়ে তুলেছে। দ্রুত শ্রমিকদের দাবিগুলোর সমাধান না হলে পরিস্থিতি আরো জটিল হয়ে উঠতে পারে।
অবস্থার উন্নতির জন্য শ্রমিক, মালিক এবং প্রশাসনের মধ্যে কার্যকর সমঝোতা অত্যন্ত জরুরি। সাধারণ মানুষের প্রত্যাশা, শ্রমিকদের বকেয়া বেতন দ্রুত পরিশোধ করে এই অচলাবস্থা নিরসন করা হবে এবং সড়কে স্বাভাবিক চলাচল ফিরিয়ে আনা হবে।