ষড়ঋতুর দেশে ঋতু বৈচিত্রে পৌষ ও মাঘ মাস শীতকাল হলেও কার্তিক ও অগ্রহায়ণ মাস শিশির ভেজা প্রকৃতিতে হেমন্তের হিমেল বাতাসে শীতের আগমনী বার্তা বয়ে আনে। এখন কার্তিকের হেমন্তকাল হলেও আগামী দেড় মাস পরেই শুরু হবে শীতকাল। হাড় কাঁপানো শীত উপেক্ষা করে গাছিরা খেজুর গাছ থেকে সুস্বাদু রস আহরণ করে থাকেন।আবহাওয়া অনুকূলে থাকলে বসন্তের মাঝামাঝি সময় পর্যন্ত খেজুর গাছ থেকে এ রস আহরণ চলে। বছরে একবার শুধু শীত মৌসুমে খেজুর গাছ থেকে রস আহরণ করা হয়।
মৌসুমি গাছিরা অস্থায়ী বাসস্থান বানিয়ে গ্রামে-গঞ্জে খেজুর গাছ মালিকদের সঙ্গে চুক্তিবদ্ধ হয়ে প্রকারভেদে প্রতি খেজুর গাছ থেকে ৩-৪ কেজি লালি দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়ে গাছ থেকে রস আহরণ ব্যবসা শুরু করেন। খেজুর গাছে রস নিঃসৃত হওয়ার জন্য তৈরি করা মুখায় কাঠ বা টিনের একটি জিহ্বা লাগিয়ে দিয়ে ঐ জিহ্বা বরাবর একটি মাটির হাঁড়ি বা প্লাস্টিকের পাত্র টাঙিয়ে দেন। দু-এক ফোঁটা করে সারারাত ঐ হাঁড়িতে খেজুর গাছের রস নিঃসৃত হয়ে জমা হয়। ভোররাত থেকে খেজুর গাছ থেকে এই রস নামানো শুরু হয়, তা সূর্যোদয় পর্যন্ত চলে।
.png)
তিনদিন পরপর পালা বদল করে একটি খেজুর গাছ থেকে এই রস আহরণ করা হয়। এই আহরণকৃত রস বাড়ির উঠানে মস্ত চুলায় শিটের তাওয়াতে জ্বাল করা হয়, আর জ্বালানি হিসেবে ব্যবহার করা হয় খড়। রস জ্বাল দিয়ে লালচে বর্ণ ধারণ করে। রস আরো গাঢ় লালচে হলে সেগুলো পাত্রে ঢেলে দানাদার লালি, পাটালি, ও বাটি গুড় তৈরি করা হয়। ঐ লালি ও গুড় পরে বাজারে বিক্রি করে গাছিরা জীবিকা নির্বাহ করেন।
কথা হয় জেলার কাহালু সদর ইউনিয়নের বুড়ইল গ্রামের মৌসুমি রস আহরণকারী (গাছি) বুলবুল ও জামিল উদ্দীনের সঙ্গে, যারা প্রায় ৪০ বছর ধরে এই খেজুর গাছের রস আহরণ করে লালি ও গুড় তৈরির ব্যবসা করে আসছেন। বতর্মানে খড়ের মূল্য বেশি হওয়ায় রস থেকে লালি ও গুড় তৈরি করতে খরচ বেশি হয়, এতে কম লাভ হয় বলে জানান তারা।
শীতকালে খেজুরের রসের পায়েস, পিঠা, পুলি, ক্ষীর, সন্দেশ, ভাপা পিঠা, চিতই পিঠা, দুধ পিঠাসহ হরেক রকমের পিঠা তৈরি করা হয়, যা স্বাদে অতুলনীয়। গ্রাম-বাংলায় খেজুর রসের যেকোনো মজাদার পিঠার কদর আজো অনেক বেশি। নতুন ধানের চাল দিয়ে খেজুর রসের যেকোনো পিঠা তৈরি করতে মহিলারা ব্যস্ত হয়ে পড়েন। পাড়ায় পাড়ায় জামাই আদর করতে রাত জেগে ধুম পড়ে যায় পিঠা তৈরির। এছাড়া শহর-গ্রামে পৌষ-পার্বণে চলে পিঠা উৎসব। চাহিদা বেশি হওয়ায় অনেক সময় গাছিদের কাছে হাঁড়ি দিয়েও লালি ও গুড় সহজে পাওয়া যায় না।
কাহালু উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা জান্নাতুল ফেরদৌসের সঙ্গে কথা বলা হলে তিনি জানান, প্রকৃতির ভারসাম্য রক্ষায় খেজুর গাছের গুরুত্ব অপরিসীম। তাছাড়া খেজুরের রস ও গুড় গ্রাম-বাংলার ঐতিহ্যে। বর্তমানে আমাদের কাছে খেজুর গাছের কোনো পরিসংখ্যান নেই। তবে উপজেলার বিভিন্ন গ্রামে খেজুর গাছের সঠিক পরিচর্যা করা হলে তা থেকে বাণিজ্যিকভাবে আয় করা সম্ভব।
বগুড়া কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের উপ-পরিচালক ডা. মতলেবুর রহমান জানান, জেলার খেজুর গাছ চাষিদের বিভিন্ন সময়ে প্রশিক্ষণ ও পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। কাহালু, দুপচাঁচিয়া ও আদমদিঘী উপজেলায় খেজুরের গাছ বেশি রোপণ করা হয়েছে। জেলায় খেজুরের রস ও লালি, গুড়ের চাহিদা মিটিয়ে দেশের বিভিন্ন জেলায় বাজারজাতকরণ করা হয়ে থাকে।