কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতর সূত্রে জানা গেছে, পাট উৎপাদনে নড়াইল জেলা বাংলাদেশের মধ্যে ৪র্থ স্থানে এবং খুলনা বিভাগের মধ্যে প্রথম স্থানে রয়েছে। ভৌগলিক কারণে এই জেলার মাটি পাট চাষের জন্য অত্যন্ত উপযোগী। নড়াইল জেলায় এ বছর ২৩ হাজার ৪৩০ হেক্টও জমিতে পাট চাষ হয়েছে। লক্ষ্যমাত্রা ২৩ হাজার ৯ শ’ হেক্টর নির্ধারণ করা হলেও অনাবৃষ্টির কারণে অনেক চাষি পাট চাষ করতে পারেননি। পাট বপন করলেও খরতাপের কারণে নষ্ট হয়ে যায়। যার ফলে লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে ৪৭০ হেক্টর জমিতে কম আবাদ হয়েছে।
নদী বেষ্টিত নড়াইল জেলায় অসংখ্য খাল-বিল ও পুকুর রয়েছে। যার কারণে চাষিদের পাট কাটার পর জাগ দেওয়ার জন্য বেশি ভোগান্তি পোহাতে হয় না। কৃষি বিভাগের তথ্যমতে নড়াইল সদর উপজেলার মাইজপাড়া, হবখালী, শাহাবাদ, চন্ডিবরপুর ইউনিয়নে তুলনামূলকভাবে বেশি পাট উৎপাদন হয়। এছাড়া লোহাগড়া উপজেলার নলদী, লাহুড়িয়া, ইতনা, নোয়াগ্রাম, শালনগর, কাশিপুর, মল্লিকপুর ইউনিয়নে বেশি পাট চাষ হয়। এই উপজেলার অর্ধেক জমিতে পাটের চাষ হয়ে থাকে। অপরদিকে, কালিয়া উপজেলার উঁচু এলাকাতে পাট চাষ হয়ে থাকে।
.png)
লোহাগড়া উপজেলার নলদী ইউনিয়নের বারইপাড়া গ্রামের কৃষক আক্তার হোসেন খান বলেন, নলদী ইউনিয়নের প্রতিটি এলাকায় পাট চাষ হয়। এই এলাকার মাটি পাট চাষের জন্য উপযোগী হওয়ায় আমরা চাষিরা পাট চাষ করে থাকি। বর্তমানে পাট কেটে জাগ দেওয়া হচ্ছে; পাটের জমিতে আমন ধান রোপণ করা হচ্ছে। এরইমধ্যে আমাদের এলাকার অর্ধেক জমির পাট কাটা শেষ হয়েছে। এসব জমিতে বিভিন্ন জাতের ধান লাগানো হচ্ছে। পাট কাটার পাশাপাশি পাটে যাতে ভালো রঙ হয়, সেজন্য নবগঙ্গা নদীতে জাগ দেওয়া হচ্ছে। এছাড়া খাল ও পুকুরে জাগ দেওয়া হচ্ছে। ইছামতি বিলেও জাগ দেওয়া হচ্ছে। আমাদের নলদী খালসহ অন্যান্য খালগুলি পুনঃখনন করা হলে পাট জাগ দেওয়ার জন্য ভালো হতো।
নড়াইল সদর উপজেলার হবখালী ইউনিয়নের কাগজীপাড়া গ্রামের সোয়েব মিনা ও হেদায়েত হোসেন জানান, ওই এলাকার পাটচাষিরা পাট কেটে চিত্রা নদীতে জাগ দিচ্ছে। নদীতে পাট পচালে রঙ ভালো হয়। আর রঙ ভালো হলে পাটের দামও ভালো পাওয়া যায়। নদীতে পাট জাগ দেওয়ার কারণে পানি পচে দূষিত হয়ে পড়ছে।
সদর উপজেলার সলুয়া গ্রামের চাষি শরিফুল ইসলাম বলেন, এ বছর অনাবৃষ্টি ও খরতাপের কারণে পাট উৎপাদনে খরচ অনেক বেশি হয়েছে। সেচ দিয়ে জমি চাষ করে সার দিয়ে বীজ বুনলেও অনেকের জমিতে চারা গজায়নি। যার কারণে পুনরায় আবার চাষ দিয়ে বীজ বুনতে হয়েছে। অনাবৃষ্টির কারণে কয়েকদফা সেচ দেয়ার কারণে উৎপাদন খরচ বেড়ে গেছে। যার ফলে প্রতি মণ পাট ৫ হাজার টাকার কম হলে কৃষকের কোনো লাভ হবে না।
লোহাগড়া উপজেলার এড়েন্দা বাজারের পাট ব্যবসায়ী লাবলু মোল্যা বলেন, গত বছর মাটের রং ও মান অনুযায়ী বিভিন্ন দামে পাট বিক্রি হয়েছে। রঙ খারাপ পাট দেড় হাজার থেকে শুরু করে ২ হাজারের একটু বেশি দামে বিক্রি হয়েছে। মাঝারি মানের পাট বিক্রি হয়েছে ২ হাজার ৫শ’টাকার কমবেশি। ভালো মানের পাট বিক্রি হয়েছে ৩ হাজার টাকার কমবেশি।
ব্রাহ্মণডাঙ্গা বাজারের পাট ব্যবসায়ী জিয়াউর রহমান বলেন, এ বছর বাজারে নতুন পাট উঠতে শুরু হয়েছে। প্রথম দিকে ভালো মানের পাট ৩ হাজার ৩শ’ টাকা পর্যন্ত বিক্রি হয়েছে। চলমান অস্থিতিশীলতার কারণে দাম কমে ভালো মানের পাট এখন ২ হাজার ৬ শ’ টাকা বিক্রি হচ্ছে। এছাড়া নিম্নমানের পাট ১ হাজার ৭শ’টাকা করে বিক্রি হয়েছে। কৃষক বাঁচিয়ে রাখতে হলে পাটের দাম ৫ হাজার টাকা হওয়া প্রয়োজন।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতর নড়াইলের উপ-পরিচালক মো. আশেক পারভেজ বলেন, নড়াইল জেলায় এ বছর ২৩ হাজার ৯ শ’ হেক্টর জমিতে পাট চাষের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হলেছিল। কিন্তু অনাবৃষ্টি ও খরতাপের কারণে ২৩ হাজার ৪৩০ হেক্টর জমিতে পাট চাষ হয়েছে। যার ফলে লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে ৪৭০ হেক্টর জমিতে কম আবাদ হয়েছে। চাষিরা পাট কাটা শুরু করেছেন। এরইমধ্যে অর্ধেক জমির পাট কর্তন শেষ হয়েছে। তবে পাট জাগ দেওয়ার জায়গার অভাবে চাষিদের একটু কষ্ট হচ্ছে। জেলার বিভিন্ন পরিত্যক্ত খালগুলি খনন করা হলে চাষিদের কষ্টটা কিছুটা হলেও কমবে। এ বছর আশা করি চাষিরা পাটের ন্যায্য মূল্য পাবে।