চকচকে উজ্জ্বল সবুজ পাতার ফাঁকে ফাঁকে ফোটে থাকা কদম ফুলের সৌরভ নিচ্ছে রঙিন প্রজাপতিও। ফলে, কদমফুলে রঙিন প্রজাপতির ছুটাছুটি যেন প্রকৃতিতে এক ভিন্ন মাত্রা যোগ হয়েছে। সেইসঙ্গে চিরচেনা মিষ্টি একটা গন্ধে মেতে উঠেছে গ্রামীণ সবুজ শ্যামল প্রকৃতিও।
কদম ফুলের সতেজ নির্মল সৌন্দর্য আর মোহনীয় ঘ্রাণ প্রকৃতিপ্রেমীসহ সবার মনে সৃষ্টি করেছে ভিন্ন এক অনুভূতি। মূলত: বর্ষার সঙ্গে কদম ফুলের যেন এক নিবিড় সম্পর্ক প্রাকৃতিকভাবেই আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে আছে। তাইতো পল্লীকবি জসিম উদ্দিন লিখেছিলেন, ‘প্রাণ সখিরে.......ঐ শোন কদম্বতলে বংশী বাজায় কে।’ মূলত: ঐতিহ্যগতভাবেই বর্ষা ঋতুতেই প্রকৃতিকে রাঙিয়ে ফোটে বর্ষাদূত কদম ফুল। তবে জলবায়ু পরিবর্তনের ছোঁয়ায় কদম ফুল সাধারণত আষাঢ় মাসে দেখা যাওয়ার কথা থাকলেও জৈষ্ঠ্য মাসের শেষ থেকেই হোসেনপুরে গাছে গাছে শোভা পাচ্ছে এ কদম ফুল।
.png)
সূত্রমতে, কদম এসেছে সংস্কৃত নাম কদম্ব থেকে। এই ফুলের আরেক নাম নীপ। এছাড়াও এ ফুলের আরো কতগুলো আঞ্চলিক নাম রয়েছে। যেমন সর্ষপ, সুরভি, পুলকি, মেঘাগমপ্রিয়, বৃত্তপুষ্প, সিন্ধুপুষ্প, মঞ্জুকেশিনী ইত্যাদি।
স্থানীয় হোসেনপুর মহিলা কলেজের উদ্ভিদ বিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক নাজমুন নাহার জানান, দেশের ফুলগুলোর মধ্যে কদম ফুল অন্যতম। এই গাছের উচ্চতা ৪০ থেকে ৫০ ফুট পর্যন্ত হতে পারে। এর আদি নিবাস ভারতের উষ্ণ অঞ্চল, মালয় ও চীনে। এই গাছের পাতা লম্বা, চকচকে উজ্জ্বল সবুজ। শীতকালে এই গাছের পাতা ঝরে গেলেও বসন্ত এলেই এই গাছে পাতা নতুন পাতা গজাতে শুরু করে। কদম ফুল গোলাকার। ফুলটিকে একটি ফুল মনে হলেও আসলে এটি অসংখ্য ফুলের একটি গুচ্ছ। এর ভেতরে মাংসল পুষ্পাধার রয়েছে, যাতে হলুদ রংয়ের ফানেলের মতো নরম সাদা পাপড়িগুলো আটকে থাকে। কদম গাছের ফল বাদুড় ও কাঠবিড়ালির প্রিয় খাদ্য। এরাই ভিন্ন ভিন্ন জায়গায় এই গাছের বংশবিস্তারে সাহায্য করে থাকে।
সরেজমিনে উপজেলার বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, সড়কের পাশে, মেঠোপথের ধারে, বসতবাড়ির আশেপাশে, পুকুর ও দীঘির পাড়ের কদম গাছ ছেয়ে আছে মিষ্টি গন্ধেভরা তুলতুলে কদম ফুলে। এসব ফুলের মন ভোলানো সৌন্দর্যে আকৃষ্ট হচ্ছেন শিশুরাসহ নানা শ্রেণি-পেশার মানুষ। শিশুরা এসব ফুল তাদের খেলার অনুষঙ্গ হিসেবেও ব্যবহার করছে। কিশোরীদের চুলের খোপা ও বেনিতেও শোভা পাচ্ছে বর্ষাদূত কদম ফুল। উঠতি বয়েসী কিশোর কিশোরীদের হাতেও শোভা পাচ্ছে এই ফুল। প্রতিটি সড়ক দিয়ে যেতে যেতে কদম ফুলের গন্ধ ও সৌন্দর্য উপভোগ করছেন সবাই। কদম ফুলের গন্ধে যেনো গ্রামবাংলার চিরচেনা গন্ধ পাওয়া যাচ্ছে।
স্থানীয় হোসেনপুর সরকারি মডেল পাইলট স্কুল এন্ড কলেজের শিক্ষার্থী রাফি ও বিজয়সহ অনেকেই জানান, রঙ, রূপ ও গন্ধে ভরপুর দৃষ্টিনন্দন ফুল কদম। এই ফুল অন্যান্য ফুলের মতো নয়, এটি সম্পূর্ণ একটি ভিন্নধর্মী ফুল। এই ফুলের হলুদ ও সাদা পাপড়ি আর ভেতরের গোলাকার বলের মতো অংশটি নিয়েই ফুলটির সৌন্দর্য ফুটে উঠে। এ ফুলের সৌন্দর্য অন্য ফুলের তুলনায় সম্পূর্ণ আলাদা। প্রতি বছরই বর্ষা এলে কদম ফুলের মুগ্ধতা তাদের বিমোহিত করে তোলে।
স্থানীয় খ্যাতমান প্রকৃতিপ্রেমী ও অবসরপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক জামাল উদ্দিন জানান, বর্ষাকালে প্রকৃতিতে কদম ফুল ফোটার সাথে গ্রামবাংলার এক নিবিড় সম্পর্ক রয়েছে। তবে জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে এখন অসময়েও কদম ফুল ফুটতে দেখা যায়। এবার উপজেলার বিভিন্ন জায়গায় কদম ফুল ফুটেছে। এ ফুলের মধ্যে যেন বাঙালি বাঙালি এক আভিজাত্য রয়েছে। রাস্তায় যাতায়াতের সময় হঠাৎ হঠাৎ এ কদমফুলের গন্ধ মনকে মাতোয়ারা করে তোলে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।