ঢাকা,  মঙ্গলবার   ০৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ২৩ ভাদ্র ১৪৩৩

Advertisement
[ দেশজুড়ে ]

যে কারণে মিরকাদিমের ঐতিহবাহী গরু কোরবানিতে প্রথম পছন্দ

মো. মঈনউদ্দিন আহমেদ সুমন, মুন্সীগঞ্জ
প্রকাশিত: ২১:৪৬, ৭ জুন ২০২৪
যে কারণে মিরকাদিমের ঐতিহবাহী গরু কোরবানিতে প্রথম পছন্দ
ঢাকার হাটে কোরবানির ঈদের প্রধান আকর্ষণ মুন্সীগঞ্জের মিরকাদিমের সাদা ধবল গরু -ছবি: ডেইলি বাংলাদেশ

পবিত্র ঈদুল আজহাকে ঘিরে এবার কদর বেড়েছে প্রায় শতবর্ষী প্রাচীন মুন্সীগঞ্জের মিরকাদিমের ঐতিহ্যবাহী সাদা ধবল গরুর। কোরবানির জন্য রাজধানীর পুরান ঢাকার মানুষের কাছে প্রতিবছরই চাহিদার শীর্ষে থাকে। 

তবে ভেজালযুক্ত খাবার ও ইনজেকশন দিয়ে গরু মোটাতাজাকরণের প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে না পেরে অনেকটাই  অস্তিত্ব সংকটে রয়েছে। তবুও কিছু প্রান্তিক খামারি ছোট পরিসরে আগলে রেখেছেন পূর্ব-পুরুষের সৌখিন এই ঐতিহ্যকে। এক সময়ের কোলকাতা খ্যাত মুন্সীগঞ্জের মিরকাদিম। উৎকৃষ্ট মানের চাল, ডাল, গরু ইত্যাদি উৎপাদনের কারণে মিরকাদিম এখনও প্রসিদ্ধ। কোরবানির আগে এ অঞ্চলের বিশেষ জাতের গরু, বিশেষ সাদা গরুর, কারণে দেশজুড়ে নাম শোনা যায় এলাকাটির। বিশেষত সৌখিন মানুষ যারা দর্শনীয় গরু কোরবানি দেন। এ সময় তাদের আনাগোনায় এ অঞ্চল সরব হয়ে ওঠে।

কিছু বছর আগেও রাজধানীতে পুরোনো ঢাকার হাটে কোরবানির ঈদের প্রধান আকর্ষণ মুন্সীগঞ্জের মিরকাদিমের সাদা ধবল গরু। প্রাচীন আমল থেকেই কথিত আছে শুধুমাত্র মিরকাদিমের ধবল গরু বিক্রির জন্য পুরান ঢাকার রহমতগঞ্জের গনি মিয়ার হাটের প্রচলন শুরু হয়েছিল অনেক বছর আগে। এক সময় মিরকাদিমের দুই শতাধিক খামারি কয়েক হাজার ধবল গরু পালন করে কোরবানির ঈদের আগে সেই হাটে নিয়ে যেতেন বিক্রি করতে। গোখাদ্যের দাম বৃদ্ধি ও ইনজেকশন দিয়ে গরু মোটাতাজাকরণের অসাধু প্রতিযোগিতাসহ নানা প্রতিকূলতায় এখন হারিয়েছে সেই ঐতিহ্য। তবে মিরকাদিমের ধবল গরু লালন-পালনের ঐতিহ্য প্রায় শত বছরের।

Advertisement

স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, প্রাচীনকাল থেকেই মিরকাদিম ভুট্টি গরু, তাজা গাভীর জন্য বিখ্যাত। এছাড়াও এখানে পাওয়া যায় নেপালি, মন্ডি, হাঁসা, পশ্চিমা ও সিন্ধি জাতের গরু। এক সময় মিরকাদিমের প্রতিটি ঘরে ঘরে এসব বিশেষ জাতের গরু লালন-পালন করা হতো। এখানে ছিল বিভিন্ন তেলের মিল, ধান-চালের মিল। খুব সস্তায় খৈইল, ভূষি, খুদ, কুড়া ইত্যাদি পাওয়া যেত। এখন চালের মিল এবং বিভিন্ন কলকারখানা থাকলেও খৈল, ভূষি, কুড়ার দাম অনেকটাই চড়া। তাই গরু মোটা তাজা করার হার অনেক কমে গেছে। এখন শুধুমাত্র কায়েকটি পরিবার এ পেশা ধরে রেখেছে। এছাড়া গৃহস্থ পরিবারগুলোর সদস্যরা অধিকাংশই বিদেশ চলে যাওয়ায় এবং অন্য পেশায় জড়িত হয়ে পড়ায় বর্তমানে কমে এসেছে গরু পালন।

তবে মিরকাদিমে গরুর বিশেষ পালন কৌশলের কারণে এসব গরুর গোস্ত যেমন সুস্বাদু হয় তেমন চাহিদা ও ভালো। ট্যাবলেট খাইয়ে বা ইনজেকশন দিয়ে কৃত্রিমভাবে এখানকার গরুগুলো স্বাস্থ্যবান করা হয় না। সাধারণত খৈল, ভূষি, খুদ ইত্যাদি খাওয়ানো হয় এবং স্বাস্থ্য ভালো গরুগুলোর যত্ন নেন গরু পালনকারীরা। তাই এর দাম ও চাহিদাও বেশি। পুরোনো ঢাকার হাটগুলোতে এসব গরুর দেখা মেলে। তবে গত কয়েক বছর ধরে পুরান ঢাকার ধনী ব্যবসায়ীরা ঈদের কয়েক মাস আগেই মিরকাদিমে চলে যান গরু কিনতে। তারা বাড়ি বাড়ি ঘুরে গরু পছন্দ করে কিনে ফেলেন এবং গৃহস্থদেরই ঈদ পর্যন্ত গরু পালনের দায়িত্ব ও খরচ দিয়ে আসেন। ফলে কোরবানির হাটে ওঠার আগেই অনেক গরু বিক্রি হয়ে যায়। তবে এখনও পুরান ঢাকার বৃত্তবান পরিবারগুলোতে মিরকাদিমের গরু কোরবানিকে তাদের পারিবারিক ঐতিহ্য বলে মনে করেন অনেকে। তবে কোনো কোনো পরিবার একসঙ্গে ৮-১০টি গরুও কোরবানি দিয়ে থাকেন। তিনদিন ধরে এসব গরু কোরবানি ও এর গোস্ত বিলি হয়। মিরকাদিমের গরুর মাংস বিশেষ সাধের হওয়ায় বহু মানুষ এ মাংস নিতে আসেন শখের বসে।

রাজধানীর বংশাল এলাকার স্থানীয় হায়দার আলী, বংশ-পরম্পরার দীর্ঘদিনের রীতিনীতি ধরে রাখতেই কোরবানির পশু কিনতে প্রতি বছরের মতই এবারও এসেছেন মিরকাদিমে, বিগত বেশ কয়েক বছর তুলনায় এবার গরুর দাম কিছুটা বেশি বলে অভিযোগ তার তিনি বলেন, গেল বছর প্রায় তিন থেকে সাড়ে তিন মণ ওজনের একটি ধবল গরু কিনেছি ১ লাখ ২৫ হাজার টাকায়, তবে এ বছর একই গরুর দাম চাচ্ছে প্রায় দুই লাখ টাকা, খামারিরা বলছেন গোখাদ্যের দাম বেড়ে যাওয়ায়, প্রভাব পড়েছে এবার কোরবানির পশুর দামে।

পুরান ঢাকার নারিন্দা এলাকার স্থানীয় বাসিন্দা আজাদ রহমান প্রতি বছরের মতো এবারও এসেছেন মিরকাদিমের ধবল গরু কিনতে। পরে বেশ কয়েকটি খামার ঘুরে পছন্দমতো কিনেছেন ৪টি ধবল গরু। তিনি বলেন, বহু বছর আগে থেকে আমাদের পছন্দের শীর্ষের তালিকায় থাকে মিরকাদিমের ধবল গরু। আমি প্রায় ৩৫ বছর যাবত মিরকাদিমের ধবল গরু কিনে কোরবানি দিয়ে আসছি। তবে গত বছর ৬টি গরুর যে দাম পড়েছিল, এ বছর সেই দামে ৪টি গরু কিনতে পেরেছি। তবে গরুগুলো প্রতি বছরের মতো এবারও পছন্দ হওয়ায় তেমন কোনো দুঃখ নেই আমার মনে।

ঢাকার হাটে কোরবানির ঈদের প্রধান আকর্ষণ মুন্সীগঞ্জের মিরকাদিমের সাদা ধবল গরু -ছবি: ডেইলি বাংলাদেশগরু পালনকারী তারা মিয়া জানান, মিরকাদিমের গরুর চাহিদা অনেক। কোরবানি ঈদের কয়েক মাস আগেই তারা দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে শুকনো, ছোট ও বাছাই করা গরু কিনে নিয়ে আসেন। বিশেষ করে বাজা গাভি, খাটো জাতের বুট্টি গরু, নেপালি, সিন্ধি জাতের গরু আনা হয়। তবে এ গরুগুলোর বিশেষত্ব হচ্ছে এগুলোর বেশির ভাগের গায়ের রঙ সাদা ও নিখাঁদ হয়। এতে প্রতিটি গরুর বিক্রি হয় ৮০-৯০ হাজার টাকা থেকে শুরু করে ৭ লাখ টাকা পর্যন্ত। তারপর সেগুলোকে খৈল, ভূসি খাওয়ানো হয়।

মজনু বেপারী, আমির হামজা, খালেক মিয়া ও ইমন বেপারীসহ আরো বেশ কয়েকজন স্থানীয় ধবল গরুর খামারি বলেন, মাত্রা অতিরিক্ত গোখাদ্যের দাম বৃদ্ধি পাওয়াসহ শ্রমিক সংকটে দিনদিন কমে আসছে খামারির সংখ্যা। এছাড়াও আর্থিক অনটনে পেশা বদল করেছেন অনেকেই। তাই মিরকাদিমের গরু খামারিদের দাবি, সরকার যদি তাদের আর্থিক সহযোগিতা দিত, তাহলে ধীরে ধীরে বিলুপ্ত হওয়া গরু এ ব্যবসা এগিয়ে নেয়া যেত।

সরেজমিনে মিরকাদিমের বিভিন্ন এলাকা ঘুরে স্থানীয়দের কাছ থেকে জানা যায়, অন্যান্য অঞ্চলে বুট্টি গরু পাওয়া গেলেও মিরকাদিমের বুট্টি গরুর বৈশিষ্ট্য আলাদা। আকারে অনেক ছোট এ গরুর চেহারা দেখলেই বুঝা যাবে গোশতের সাধ কী হবে। এর বাহ্যিক অবয়ব খুব তেলতেলে ও গোলাকৃতির হয়। গোস্ত মোলায়েম ও সুস্বাদু। এছাড়া নেপালি গরুর উচ্চতা খুবই আকর্ষণীয়। মন্ডি, সিন্ধি অনেক রঙের হলেও পশ্চিমা আর হাঁসা গরু সাদা রঙের। সাদা এসব গরুর উচ্চতা সবচাইতে বেশি। গরুর হাটের আকর্ষণ বৃদ্ধিতে এসব গরুর চাহিদা বেশ। সিন্ধি গরুর চাহিদা বিশ্বব্যাপী। সেটাও এখানে পাওয়া যায়।

জেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডা. নজরুল ইসলাম বলেন, চলতি বছর মিরকাদিমে ১৩টি খামারে প্রায় আড়াই শতাধিক ধবল গরু ঈদে বিক্রির জন্য প্রস্তুত করেছেন খামারিরা। তবে গোখাদ্যের মূল্যবৃদ্ধি ও শ্রমিক সংকটে যেসব খামারিদের প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি হয়েছে এ বছর আমরা তাদের সার্বিক সহযোগিতা করার পাশাপাশি বিনামূল্যে পশুর চিকিৎসা ব্যবস্থা নিশ্চিত করেছি। এছাড়া অসংখ্য খামারিকে স্বল্প সুদে বিভিন্ন ব্যাংক থেকে ঋণ সুবিধার ব্যবস্থা করে দেওয়া হয়েছে। এতে ধীরে ধীরে মিরকাদিমের হারিয়ে যাওয়া ঐতিহ্য ফিরে পাচ্ছে।

তিনি আরো জানান, শিল্প কারখানা, ডালের মিল, ফ্যাক্টরি ও চালের শতশত চাতাল থাকায় এখানে গোখাদ্যের অভাব হয় না তবে সব কিছুর দাম আগের চেয়ে অনেক বেশি হলেও পর্যাপ্ত খৈল ভূসি-কুড়া এখানে পাওয়া যায়। এসব কারণে গরুর লালন পালনের বিষয়টি এখনও কিছুটা টিকে আছে। তবে এখন অনেকটাই বিলুপ্তির পথে তাই এটি টিকিয়ে রাখেতে জেলা প্রাণিসম্পদ অধিফতর সার্বিক সহযোগিতা করে যাচ্ছে।

ডেইলি-বাংলাদেশ/আরএম
লিংক সফলভাবে কপি হয়েছে!