২০১৭ সালে নগরের হালিশহর ও আনোয়ারা উপজেলায় ভূগর্ভস্থ পানিতে লবণাক্ততা নিয়ে গবেষণা করেন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূগোল ও পরিবেশবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক অলক পালের নেতৃত্বে একদল গবেষক। সেই গবেষণায় দেখা যায়, দুটি এলাকার অনেক জায়গায় ৩০০ ফুট গভীরতায়ও মেলেনি পানি। কোথাও আবার পাওয়া গেলেও সেটি ছিল লবণাক্ত। ফলে সুপেয় পানির চরম সংকটে রয়েছেন দুই এলাকার অসংখ্য মানুষ।
এক দশক আগে ২০১৪ সালে চন্দনাইশ উপজেলার দোহাজারী পৌরসভায় ভূগর্ভস্থ পানির স্থিতিতল ছিল ৯ ফুট। এক দশক পর ২০২৪ সালে সেটি নেমে পৌঁছেছে ২১ ফুটে। শুধু চন্দনাইশ নয়, একই অবস্থা চট্টগ্রামের অন্যান্য উপজেলাগুলোতেও।
.png)
উপজেলা ছেড়ে যদি নগরের কথা বলা হয়, তাহলে সেই চিত্র আরো উদ্বেগজনক। এক দশক আগে চট্টগ্রাম নগরের ১০টি এলাকায় ভূগর্ভস্থ পানির স্থিতিতল ছিল গড়ে ২৪২ ফুট। বর্তমানে এসব এলাকায় পানি পেতে হলে খুঁড়তে হবে ৩১০ ফুট। নগরে এলাকাভেদে বছরে ছয় ফুট করে নিচে নেমে যাচ্ছে পানির স্তর- এমন তথ্যই উঠে এসেছে চট্টগ্রাম প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (চুয়েট) এক গবেষণায়।
এছাড়া চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের এক গবেষণায় দেখা গেছে, নগরের হালিশহর, ফিরিঙ্গিবাজার, বাকলিয়া, পতেঙ্গা, বন্দরসহ বিভিন্ন এলাকার ভূগর্ভস্থ পানি হয়ে যাচ্ছে লবণাক্ত। এসব পানি পান ও ব্যবহারের ফলে বাড়ছে বিভিন্ন ধরনের রোগের প্রকোপ।
উপজেলায় বছরে দুই ফুট নামছে পানির স্তর
জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদফতরের চট্টগ্রাম কার্যালয়ের তথ্যমতে, চট্টগ্রামের উপজেলাগুলোতে বছরে গড়ে দুই ফুট করে নামছে ভূগর্ভস্থ পানির স্তর। ফলে বিভিন্ন এলাকায় দেখা দিয়েছে সুপেয় পানির সংকট। চাষাবাদের জন্যও মিলছে না পর্যাপ্ত পানি। অকেজো হয়ে গেছে জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদফতরের নয় হাজারের বেশি নলকূপ।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, গ্রামাঞ্চলে কৃষিকাজের জন্য ব্যবহার করা হচ্ছে ভূগর্ভস্থ পানি। পাশাপাশি জমি বিলীন করে গড়ে তোলা হচ্ছে অবকাঠামো। ফলে বৃষ্টি ও ব্যবহারের পানি মাটির নিচে যাওয়ার সুযোগ কমে যাচ্ছে। নগরেও দিন দিন অবকাঠামো বাড়ার ফলে ঢাকা পড়ছে খোলা জায়গা। কেউ কেউ আবার ব্যক্তিগতভাবে গভীর নলকূপ স্থাপন করে তুলছে পানি।
ভূগর্ভস্থ পানির স্তর নিয়ে গবেষণা চালানো চুয়েটের পুরকৌশল বিভাগের অধ্যাপক সুদীপ কুমার পাল বলেন, চাষাবাদ ও কলকারখানায় উৎপাদনে ভূগর্ভস্থ পানি ব্যবহার করা হচ্ছে। অনেক ক্ষেত্রে অপরিকল্পিতভাবেও পানি উত্তোলন করা হচ্ছে। সবকিছু মিলিয়ে ভূগর্ভস্থ পানির স্তর নিচে নেমে যাচ্ছে।
নগরে নামছে ছয় ফুট
চট্টগ্রাম নগরে পানি সরবরাহ করে ওয়াসা কর্তৃপক্ষ। বর্তমানে ৫০ কোটি লিটার পানি উৎপাদন করতে পারে সংস্থাটি। এর মধ্যে তিন থেকে চার কোটি লিটার পানি গভীর নলকূপের মাধ্যমে ভূগর্ভ জলাধার থেকে তোলা হয়। বাকি পানি আসে কর্ণফুলী ও হালদা নদী থেকে। শুষ্ক মৌসুমে যখন নদীতে পানি কমে যায়, তখন পানি উৎপাদনেও নামে ধস। বর্তমানে গড়ে ৪৫ কোটি লিটার পানি উৎপাদন করছে ওয়াসা।
সংস্থাটির তথ্যমতে, ২০১৪ সালে নগরের ১০টি এলাকায় ভূগর্ভস্থ পানির স্থিতিতল ছিল গড়ে ২৪২ ফুট। ২০২৪ সালে একই এলাকায় সেটি গিয়ে ঠেকেছে ৩১০ ফুটে। অর্থাৎ ১০ বছরের ব্যবধানে ৬৮ ফুট নেমেছে পানির স্তর।
২০১৮ সালে নগরের ৪১টি ওয়ার্ডে ভূগর্ভস্থ পানির স্থিতিতল নিয়ে প্রকল্পভিত্তিক গবেষণা করেন চুয়েটের একদল গবেষক। সেই দলের দলের নেতৃত্বে ছিলেন অধ্যাপক সুদীপ কুমার পাল। ১৯৬৮ থেকে ২০১৮ সাল পর্যন্ত ৫০ বছরের ভূগর্ভস্থ পানির স্তরের তথ্য নিয়ে ঐ গবেষণা চালানো হয়।
গবেষণার বিষয়ে সুদীপ কুমার পাল বলেন, নব্বইয়ের দশকের শুরুতে চট্টগ্রাম নগরে ব্যাপকভাবে নগরায়ণ ঘটে। বিভিন্ন এলাকায় অবকাঠামো তৈরির কাজ শুরু হয়। এর সঙ্গে ভূগর্ভস্থ পানির ব্যবহারও বাড়তে থাকে। বর্তমানে এলাকাভেদে প্রতিবছর দুই মিটার বা সাড়ে ছয় ফুট করে পানির স্তর নিচে নামছে।
নগরের ২২টি ওয়ার্ডে ভূগর্ভস্থ পানির স্তর নিয়ে আলাদা গবেষণা করেছেন চুয়েটের পুরকৌশল বিভাগের প্রধান অধ্যাপক আয়শা আখতার ও যুক্তরাষ্ট্রের মিজৌরি স্টেট ইউনিভার্সিটির গবেষক শওকাত আহমেদ। তাদের গবেষণায়ও উত্তর পাঠানটুলী, উত্তর আগ্রাবাদ, রামপুরা, দক্ষিণ আগ্রাবাদ, পাঠানটুলী, পশ্চিম মাদারবাড়ী ও পূর্ব মাদারবাড়ী ওয়ার্ডে ভূগর্ভস্থ পানি ক্রমাগত নিম্নমুখীর বিষয়টি উঠে আসে।
পানির স্তর নিচে নেমে যাওয়ার কারণ হিসেবে জলাধার ভরাট ও অপরিকল্পিত পানি উত্তোলনকে দুষছেন বিশেষজ্ঞরা। এ পানির বিকল্প হিসেবে নদী, খাল, পুকুর, দীঘিসহ মাটির ওপরের জলাধার ব্যবহারের পরামর্শ দিচ্ছেন তারা।
অধ্যাপক আয়শা আখতার বলেন, দ্রুত নগরায়ণের ফলে নির্বিচারে গাছপালা কেটে ফেলা হচ্ছে। ভরাট হয়ে যাচ্ছে জলাধার। খাল, পুকুর, দীঘি হারিয়ে যাচ্ছে। বাড়তি জনসংখ্যার চাহিদা মেটাতে সুপেয় পানির উৎস ক্রমাগত কমে যাচ্ছে। এ বিপর্যয়ের হাত থেকে রক্ষা পেতে হলে নদী-খাল পুনঃখনন এবং চাষাবাদের জন্য বৃষ্টির পানি ধারণ ও ব্যবস্থাপনার ওপর নজর দিতে হবে।
অকেজো নলকূপে মিলছে না পানি
এক দশক আগে মীরসরাই উপজেলায় ভূগর্ভস্থ পানির স্থিতিতল ছিল গড়ে ১৫ ফুট। সেটি এখন পৌঁছেছে ২৩ ফুটে। কোনো কোনো এলাকায় যা আরো নিচে।
জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদফতরের মীরসরাই কার্যালয়ের সহকারী প্রকৌশলী কে এম সাইদ মাহমুদ বলেন, গত দুই দশকে অকেজো হয়ে গেছে অন্তত এক হাজার অগভীর নলকূপ। এসব নলকূপে গড় গভীরতা ২০০ থেকে ২৫০ ফুট। এখন কোনো পানি পাওয়া যাচ্ছে না।
একই সময়ে সীতাকুণ্ড উপজেলায় পানির স্তর নেমেছে প্রায় ১৫ ফুট। এখানে জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদফতরের থাকা পাঁচ শতাধিক অগভীর নলকূপ হয়ে গেছে অকেজো। বর্ষা মৌসুমেও পানি ওঠে না এসব নলকূপে। এক দশক আগে গড়ে ১৫ ফুট থাকা পানির স্তর এখন নেমে ৩০ ফুটে পৌঁছেছে বলে জানান জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদফতরের উপ-সহকারী প্রকৌশলী মো. রাশেদুজ্জামান।
জনস্বাস্থ্য অধিদফতরের তথ্য অনুযায়ী, গত এক দশকে অন্যান্য উপজেলাগুলোর মধ্যে সাতকানিয়ায় এক হাজার ৩৩৪টি, লোহাগাড়ায় ৪০৪টি, বাঁশখালীতে ১৪৯টি, আনোয়ারায় ৯২১টি, বোয়ালখালীতে ৯৬টি, পটিয়ায় ৭০০টি, সন্দ্বীপে এক হাজার ৭১৮টি, রাঙ্গুনিয়ায় ১৪৩টি ও ফটিকছড়িতে ২০০টি নলকূপ অকেজো হয়ে গেছে।
পানির স্তর ক্রমাগত নিচে নামতে থাকায় জেলার অন্তত ৫০ লাখ মানুষ প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে ভোগান্তি পোহাচ্ছেন বলে জানান জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদফতরের চট্টগ্রাম কার্যালয়ের নির্বাহী প্রকৌশলী পলাশ চন্দ্র দাস।