পানির সংকট ক্রমান্বয়ে তীব্র হচ্ছে এবং সারাদেশে জলবায়ু পরিবর্তনের বিরূপ প্রভাবে লবণাক্ততা বৃদ্ধিসহ বরগুনার পাথরঘাটায় চলমান তীব্র দাবদাহে ৩৬-৩৮ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রার অস্বাভাবিক গরমের পাশাপাশি নেই স্বস্তির বৃষ্টি। উপকূলীয় জনপদে চলছে সুপেয় পানির তীব্র সংকট। প্রতিদিন পানির চাহিদা বাড়লেও বাড়ছে না সুপেয় পানির পরিমাণ। পানির উৎস পুকুর, দীঘি, জলাশয়, নদ-নদী, খাল-বিল শুকিয়ে হ্রাস পাচ্ছে নিরাপদ পানির চাহিদা।
নদীমাতৃক এলাকার চারদিকে বিভিন্ন নদ-নদীতে অথৈ পানি থাকার পরেও বিশুদ্ধ পানির তেমন কোনো ব্যবস্থা নেই এই এলাকায়। ফলে বাধ্য হয়ে স্বাস্থ্যঝুঁকি নিয়ে অনেকেই অতিমাত্রায় লবণ ও কাদাযুক্ত পুকুরের পানি পান করে আক্রান্ত হচ্ছেন ডায়রিয়াসহ বিভিন্ন জটিল রোগে।
.png)
বঙ্গোপসাগর মোহনায় পাথারঘাটা উপজেলার চারদিক ঘিরে বিভিন্ন নদ-নদীসহ পানির পর্যাপ্ত উৎস থাকলেও সুপেয় পানির নেই তেমন কোনো ব্যবস্থা। এতে বিশুদ্ধ খাবার পানির অভাবে ভোগান্তিতে পড়তে হচ্ছে এখানকার বাসিন্দাদের। বিশেষ করে এই উপজেলার প্রায় ২৫ থেকে ৩০টি এলাকায় রয়েছে সুপেয় পানির তীব্র সংকট।
এছাড়া এই উপজেলায় প্রায় ১৫ থেকে ২০টি এলাকায় রয়েছে মাঝারি ধরনের পানির সংকট। স্বাভাবিকভাবে পানিতে লবণের মাত্রা ৬০০ পিপিএম (প্রতি মিলিয়ন অংশ) পর্যন্ত থাকলে সেই পানি খাবার উপযোগী ধরা হয়।
তবে পাথরঘাটার ভূগর্ভস্থ পানিতে লবণের মাত্রা রয়েছে প্রায় ৩ হাজার পিপিএম পর্যন্ত। এতে বিশুদ্ধ ও সুপেয় পানি পেতে গভীর নলকূপ বসালেও লবণাক্ততার কারণে নলকূপগুলো কোনো কাজেই আসছে না। এছাড়া অনেক এলাকায় নলকূপ বসালেও কাদাযুক্ত পানি ওঠায় সে পানি কোনো কাজে ব্যবহারে করা যায় না।
২০২৩-২৪ অর্থবছরে পাথরঘাটা উপজেলায় ৮৬টি টিউবওয়েল, ৬৮টি সোলার পিএসএফসহ ৪৫২০টি পানির ট্যাংক ২০২৫ সালের মধ্যে বিতরণ করা হবে। এছাড়াও ৪৮টি পুকুর খনন করা হয়েছে, তবুও পানির তীব্র সংকটে উপজেলাজুড়ে।
সরেজমিন দেখা যায়, বৈশাখের তীব্র রোদে পর্যাপ্ত বিশুদ্ধ পানির নলকূপ বা ভিন্ন কোনো ব্যবস্থা না থাকায় পানি সংগ্রহ করতে বেগ পেতে হচ্ছে স্থানীয় বাসিন্দাদের। পৌর সভার ব্যবস্থাপানায় ও বেসরকারি সংগঠনের উদ্যোগে কিছু পানির ফিল্টারের ব্যবস্থা করলেও তা চাহিদার তুলনায় অনেক কম। এতে এক এলাকা থেকে আরেক এলাকায় হেঁটে হেঁটে বিশুদ্ধ খাবার পানি সংগ্রহ করেছেন অনেকে। সকাল থেকে সন্ধ্যা সব সময়ই দীর্ঘ লাইনে দাঁড়িয়ে পানি নিতে ভিড় লেগে থাকে প্রত্যেকটি পানির ফিল্টারে। একদিকে চাহিদার তুলনায় পানির ফিল্টার কম, অপরদিকে কাছাকাছি পানির ব্যবস্থা না থাকায় বাড়িতে নিয়ে মেপে পানি পান করতে হয় এসব এলাকার বাসিন্দাদের।
পাথরঘাটা বাদুরতলা এলাকায় বাংলাদেশ বন্ধু ফাউন্ডেশন (বন্ধু) সংগঠন তাদের নির্মিত একটি মাত্র ফিল্টারের পানিতে চাহিদা মেটে ঐ এলাকার কয়েক হাজার মানুষের। তাও আবার মাসিক চাঁদা দিতে হয় ৩০ টাকা করে, এখানে প্রতি মাসে একটি পরিবার ১৫ দিন পানি দিতে পারে ২ কলস করে।
ফিল্টার থেকে পানি নিতে আসা ঐ এলাকার বাসিন্দা রাব্বি বলেন, আমাদের এলাকায় কোনো নলকূপ বসানো যায় না। যদি কেউ বসায় তাহলে তা দিয়ে লবণ পানি ওঠে, খাওয়া যায় না। এলাকার বাইরে চরে অনেকগুলো পরিবারের পানির জন্য মাত্র একটি ফিল্টার। এর সঙ্গে সংযোগ দেওয়া পুকুরটিও ছোট হওয়ায় অনেক সময় শুকনো মৌসুমে পানি শুকিয়ে গেলে আর পানি পাওয়া যায় না।
চরলাঠিমারা গ্রামের বাসিন্দা আবুল ফরাজি বলেন, আমাদের এলাকায় কোনো টিউবওয়েল বসানো যায় না। তারপরও যা আছে তা দিয়ে লবণ পানি ওঠে। দীর্ঘদিন বৃষ্টির পানিও ধরে রাখা যায় না, পানি নষ্ট হয়ে যায়। এসব পানি খেলে বিভিন্ন রোগ দেখা দেয়। বিশেষ করে শিশু ও বৃদ্ধরা ডায়রিয়ায় আক্রান্ত হয়ে পড়ে।
বরগুনা জেলা জনস্বাস্থ্য নির্বাহী প্রকৌশলী রাইসুল ইসলাম বলেন, বরগুনার ৬টি উপজেলার মধ্যে পাথরঘাটার ভৌগোলিক অবস্থা একটু বিচিত্র ধরনের। এখানাকার বিভিন্ন ইউনিয়নসহ পাথারঘাটা সদরেও গভীর নলকূপ বসানো যায় না। আমরা পরীক্ষামূলক কিছু নলকূপ বসিয়েছি। তবে দেখা গেছে, ১২০০ থেকে ১৩০০ ফুট গভীরে যাওয়ার পরেও পানির ভালো স্তর পাওয়া যায়নি। এ কারণে এসব উপকূলীয় এলাকায় বিভিন্ন প্রকল্পের মাধ্যমে বৃষ্টি পানি সংরক্ষণ করে ব্যবহার করার ব্যবস্থা গ্রহণ করেছি। তবে এগুলো পর্যাপ্ত না হওয়ায় পুকুর খনন করে পানি বিশুদ্ধ করে ব্যবহারের পাশাপাশি সারফেস ওয়াটার ট্রিটমেন্ট প্ল্যান্ট ব্যবস্থা করার পরিকল্পনা গ্রহণ করা হচ্ছে। এসব প্রকল্প বাস্তবায়ন হলে পাথরঘাটায় সুপেয় পানির দীর্ঘদিনের সমস্যা দূর হবে।