পথচারী ও স্থানীয়দের ভাষ্য ও প্রতিবেদকের পর্যবেক্ষণে উঠে আসা তথ্য বলছে, ঈদের চার-পাঁচ দিন আগে থেকেই রাজশাহী মহানগরসহ জেলার বিভিন্ন এলাকায় কিশোর বাইকারদের দৌরাত্ম্য শুরু হয়েছে। সকাল থেকে গভীর রাত পর্যন্ত চলছে তাদের সংঘবদ্ধ বাইক রেস। সন্ধ্যার পর মহানগরীর কাশিয়াডাঙ্গা থেকে রেলগেট হয়ে ভদ্রা, তালাইমারি, কাশিয়াডাঙ্গা থেকে আমচত্বর, আলুপট্টি থেকে তালাইমারি, বিমান চত্বর থেকে মেহেরচন্ডি, রেলগেট থেকে নওহাটা, পদ্মাপাড় ঘেঁষে চলা রাস্তাসহ আধুনিক আলোকসজ্জিত সড়কগুলোতে কিশোর বাইকারদের দৌরাত্ম্য সবচেয়ে বেশি।
সচেতন নাগরিকরা বলছেন, সড়ক নিরাপদ রাখতে সরকারের আইন আছে। কিন্তু শুধু আইন দিয়ে সবকিছু নিয়ন্ত্রণ সম্ভব নয়। কেউ কেউ আইন ভাঙতে পারলে খুশি হয়। বাইক চালানোর যে নিয়ম-কানুন আছে, তা না জেনেই কিশোররা বাইক চালান। দু’একজন জানলেও অধিকাংশ উঠতি বয়সী কিশোররা আইন মানতে চায় না। আর বর্তমানে কিছু উচ্ছৃঙ্খল কিশোর গ্যাং কালচারের চর্চা করছে। যাদের পেছনে কিছু রাজনৈতিক নেতার ইন্ধনও আছে। যে কারণে এরা কাউকে কোনো কিছুর তোয়াক্কা করে না। এ কারণে দুর্ঘটনা বেশি ঘটছে। আর ঈদ উৎসবকে সামনে রেখে এটা বেপরোয়া হয়ে উঠছে।
.png)
ইফতার শেষে নগরীর উপশহর এলাকা দিয়ে সন্ধ্যার পর হেঁটে যাচ্ছিলেন কলেজ শিক্ষার্থী মো. ইত্তেদা। তিনি বলেন, সন্ধ্যার পর এ রাস্তা দিয়ে খুব সতর্কভাবে চলাচল করতে হয়। কখন যেকোনো কিশোর বাইকার এসে ধাক্কা দেয়, সে ভয়ে থাকতে হয়। অভিজাত এলাকা হওয়ায় পুলিশের তদরকি এখানে খুব একটা দেখা যায় না।
আরেক কলেজ শিক্ষার্থী সেহের আলী দুর্জয় বলেন, ইফতারের আগে গত শুক্রবার নগর ভবনের পেছনে বসে বন্ধুদের সঙ্গে গল্প করছিলাম। হঠাৎ চার রাস্তায় জ্যাম তৈরি হয়। পরে দেখি বেশ কয়েকজন কিশোর মিলে এক গাড়ি চালককে পেটাচ্ছে। যানজট দীর্ঘ হওয়ায় এক ট্রাফিক পুলিশ গিয়ে থামানোর চেষ্টা করেন। কিন্তু তাও পিটিয়েই যাচ্ছিল। পরে পুলিশ এলে কিশোররা পালিয়ে যায়। নগর সড়কে দাঁড়ালে এমন চিত্র প্রায়ই দেখা যাচ্ছে।
নিরাপদ সড়ক আন্দোলন রাজশাহী জেলা শাখার সভাপতি তৌফিক হাসান টিটো বলেন, রাজশাহীতে ঈদকে কেন্দ্র করে শান্তির নগরীতে কিশোর বাইকারদের দৌরাত্ম্য বাড়ে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে কিশোর গ্যাং কালচার। এতে পরিস্থিতি দিনকে দিন অবনতি হচ্ছে। আবার উঠতি বয়সী বাইকাররা আনন্দ উদযাপনের জন্য বাইক চালায় ওভার স্পিডে। ফলে দুর্ঘটনায় প্রাণহানিও ঘটে। ঈদের উৎসব যেন অসচেতনতার অভাবে মলিন না হয়ে যায় সেদিকে অভিভাবকদের যেমন লক্ষ্য রাখতে হবে তেমনি প্রশাসনকেও সজাগ থাকতে হবে।
হাসপাতালেও থাকে প্রস্তুতি
প্রতিবছর ঈদ উৎসবের ছুটিতেই রাজশাহী মেডিকেল কলেজ (রামেক) হাসপাতালের অর্থোপেডিক্স ইউনিটে চাপ বেড়ে যায়। উৎসব কেন্দ্রিক বাড়তি প্রস্তুতি নিতে হয় হাসপাতাল কর্তৃপক্ষকে। এবারো নেয়া হয়েছে প্রস্তুতি। তবে চিকিৎসকরা বলছেন, একটু সর্তক ও সচেতন হলেই দুর্ঘটনা এড়ানো সম্ভব। সুতরাং একটি সুন্দর ঈদ উদযাপনের জন্য সবাইকে বেপরোয়া যেকোনো কাজ থেকে দূরে থাকতে হবে।
রামেক হাসপাতাল পরিচালক বিগ্রেডিয়ার জেনারেল এফএম শামীম আহম্মদ বলেন, জরুরি বিভাগে আমাদের সব ধরনের প্রস্তুতি আছে। ছুটিতেও ২৪ ঘণ্টা চিকিৎসক থাকবেন। অ্যাম্বুলেন্সসহ অন্যান্য জরুরি সেবাও চালু থাকবে।
যা করছে পুলিশ
থানায় লিখিত অভিযোগে পেলে পুলিশ আসামিদের গ্রেফতার করছেন। তবে অধিকাংশ ঘটনায় মুচলেকা দিয়ে ছেড়ে দেওয়া হয়। সূত্র বলছে, বিড়ম্বনার ভয়ে অধিকাংশ ঘটনা থানা পর্যন্ত যাচ্ছে না। এতে অপরাধীরা আরো বেপরোয়া হয়ে উঠছে।
গত এক মাসের পুলিশের পাঠানো প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে দেখা যায়, সুনির্দিষ্ট অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে গত বৃহস্পতিবার (৪ এপ্রিল) রাত পৌনে ৯টায় বোয়ালিয়া থানার গৌরহাঙ্গা এলাকায় অভিযান পরিচালনা করে কিশোর গ্যাংয়ের ৫ সদস্যকে গ্রেফতার করেছে শাহমখদুম থানা পুলিশ। গ্রেফতারকৃত কিশোর গ্যাংয়ের সদস্যরা হলেন- রহিদুল ইসলাম, রবিন, নাসির, রকি আহমেদ শিমুল ও ফারহান আরাফাত। তারা সবাই নগরীর বাসিন্দা।
শাহমখদুম থানার ওসি ইসমাইল হোসেন জানান, পবা নতুনপাড়া আরডিএ মাঠের সামনে গত ২৭ অক্টোবর আরাফাত ও তার বন্ধু সাব্বিরকে অপহরণ করে মারধরের ঘটনার কিশোর গ্যাংয়ের এ সদস্যদের গ্রেফতার করা হয়েছে।
রাজশাহী মেট্রোপলিটন পুলিশের মুখপাত্র মো. জামিরুল ইসলাম বলেন, কিশোর গ্যাংয়ের সদস্যদের নিয়ে পুলিশ আগে থেকেই কাজ করছে। ঈদ উৎসবকে সামনে রেখে প্রতিবছরই কিশোর বাইকাররা যেন রেসিং করতে না পারে সেজন্য বিশেষ প্রস্তুতি থাকে। এবারও সেটা থাকবে।
এর আগে যা ঘটেছে
২০২২ সালে ঈদ উৎসব উদযাপনের নামে বেপরোয়া হয়ে উঠেছিল কিশোর বাইকার ও কিশোর গ্যাং সদস্যরা। বাইক রেস করতে গিয়েই ঈদের আগে-পরে মাত্র এক সপ্তাহে বাইক দুর্ঘটনায় ৬ কিশোর বাইকারের মৃত্যু হয়। দুর্ঘটনায় আহত হয় আরো আড়াই শতাধিক। এদের অধিকাংশকেই রাজশাহী মেডিকেল কলেজ (রামেক) হাসপাতালে চিকিৎসা দেওয়া হয়েছিল। ঐ বছরের ২৯ এপ্রিল রাত সাড়ে ৮টার দিকে মহানগরীর আলিফ লাম মিম ভাটার মোড় থেকে বিহাস পর্যন্ত সড়কে দুই কিশোর বাইকারের রেস চলছিল। এ সময় তনু নামে এক পথচারীকে বেপরোয়া গতির একটি বাইক ধাক্কা দেয়। এ নিয়ে পুলিশের সঙ্গে এলাকাবাসীর সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। পরে পুলিশ ঐ দুই কিশোর বাইকারকে আটক করে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে। ঈদের পরের দিন ৪ এপ্রিল গোদাগাড়ীর লস্করহাটি এলাকায় দুই বাইকের মুখোমুখি সংঘর্ষ হয়। এ সময় উপজেলার পাহাড়পুর নামাজ গ্রামের আলী হোসেনের ছেলে কিশোর বাইকার নাঈম হোসেন ঘটনাস্থলেই নিহত হয়। এ ঘটনায় আহত হয় আরো তিন কিশোর।
রামেক হাসপাতালের তথ্য অনুযায়ী, ঐ সময় ঈদের ছুটিতে ১ মে থেকে ৪ মে পর্যন্ত সড়ক দুর্ঘটনায় আহত হয়ে রামেক হাসপাতালে ভর্তি হয়েছিলেন ২১৯ জন। ২০২৩ সালের চিত্রও এক রকম বলে জানা গেছে।