ঢাকা,  মঙ্গলবার   ০৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ২৩ ভাদ্র ১৪৩৩

Advertisement
[ দেশজুড়ে ]

পুরাকীর্তির অনুপম নিদর্শন পাবনার জোড়বাংলা

আমিনুল ইসলাম জুয়েল, পাবনা
প্রকাশিত: ১৫:৩১, ১৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৪
পুরাকীর্তির অনুপম নিদর্শন পাবনার জোড়বাংলা
পাবনার জোড়বাংলা। ছবি: ডেইলি বাংলাদেশ

পুরাকীর্তির এক অনুপম নিদর্শন পাবনার জোড়বাংলা। শহরের কালাচাঁদ পাড়ায় অবস্থিত চার শতাধিক বছরের পুরাতন ইমারতটির গঠন শৈলী আজও মানুষকে আকৃষ্ট করে। সহজ ভাষায় এর গঠন বর্ণনা করলে বলা যায় দুটি সন্নিহিত বাংলা প্যাটার্নের দোচালা ঘর। ঘরের চালা দুটো অর্ধচন্দ্রের মতো বাঁকানো। আর এর গাঠনিক ইটগুলো ক্ষুদ্র এবং গায়ে নানা কারুকার্য খচিত।

কালাচাঁদপাড়ার অবস্থান পাবনা শহর থেকে দুই কিলোমিটার দূরে উত্তর-পূর্বদিকে। রাঘবপুরের মতো ঘনবসতিপূর্ণ এলাকায় সক্রিয় সত্তা নিয়ে খোলা জায়গায় দাঁড়িয়ে আছে জোড়বাংলা মন্দির। কালাচাঁদপাড়া মহল্লায় এ মন্দিরটি আছে বলে স্থানীয়রা এ পাড়াকে জোড়বাংলা পাড়া বলেও চেনেন।

স্থানীয় জনশ্রুতি অনুসারে, জোড়বাংলা মন্দিরটি ১৮ শতকের মাঝামাঝি সময়ে নির্মাণ করা হয়েছিল। এছাড়াও এটাও প্রচলিত যে, মন্দিরটি নির্মাণ করেছিলেন, ব্রজমোহন ক্রৌড়ী নামক একজন যিনি মুর্শিদাবাদ নবাবের তহশিলদার ছিলেন। তবে মন্দিরটি আবিষ্কারের সময় কোনো শিলালিপি পাওয়া না যাওয়ায় এর সঠিক ইতিহাস সম্পর্কে জানা যায় না।

Advertisement

নির্মাণ কৌশলে দিনাজপুরের কান্তনগর মন্দিরের সঙ্গে সামঞ্জস্য খুঁজে পাওয়া যায়। মন্দিরটির ওপরের পাকা ছাদ বাংলার দোচালা ঘরের চালের অনুরূপ। পাশাপাশি দুটি দোচালা ঘরের ছাদকে একসঙ্গে জোড়া লাগিয়ে মন্দিরের ছাদ নির্মাণ করা হয়েছে। ছাদের মধ্যভাগ বেশ উঁচু হলেও ছাদের ধার উত্তর ও দক্ষিণ দিকে ক্রমশ ঢালু হয়ে গেছে।

ইটের বেদির ওপর নির্মিত মন্দিরের সামনে অংশে তিনটি প্রবেশ পথ এবং পথের দুই পাশে দুটি বিশাল স্তম্ভ রয়েছে। এই প্রবেশপথ একসময় মন্দিরের অন্য অংশের মত টেরাকোটার কারুকার্য্যে পূর্ণ ছিল। জোড়বাংলা মন্দিরের দেয়ালের নকশা এবং টেরাকোটার কাজ দিনাজপুর জেলায় অবস্থিত কান্তজিউ মন্দিরের সঙ্গে সাদৃশ্যপূর্ণ। মন্দিরের পেছন অংশে মন্দির থেকে বের হওয়ার রাস্তা রয়েছে।

পাবনার জোড়বাংলা এ প্রাচীন কীর্তিটি মন্দির কি-না এ নিয়ে বিতর্কও রয়েছে। অবশ্য এর মধ্যে কোনো বিগ্রহ পাওয়া যায়নি। কেউ কেউ বলেন এখানে ব্রোঞ্জ নির্মিত রাধাকৃষ্ণের একটি বিগ্রহ ছিল। মুক্তিযুদ্ধের সময় বিগ্রহটি খোয়া যায়। জোড়বাংলার প্রতিষ্ঠাতা কে এ নিয়েও নানা কথা শোনা যায়। 

জনশ্রুতি রয়েছে, বাদশাহী আমলে ব্রজবল্লভ রায় নামক জনৈক ব্যক্তি পাবনা শহরের অদূরে ছাতিয়ানী গ্রামে অবস্থিত বাদশাহর সেনা শিবির থেকে পচুর ধনরত্ন অপহরণ করে মন্দির সংলগ্ন কানাপুকুরে লুকিয়ে রাখেন। এ অর্থেই তিনি কোটিপতি হন এবং ব্রজবল্লভ ক্রৌড়ী নামে পরিচিতি লাভ করেন। পরবর্তী সময়ে ১৯ শতকের শেষ দিকে এক কায়স্থ পরিবার খরিদসূত্রে জোড়বাংলার মালিকানা হন। ঐ ছাতিয়ানী গ্রামের ভোলানাথ সান্যাল’র কাছে ১৬০৭ সালের একটি দলিল পাওয়া যায়। যাতে দেখা যায় ব্রজবল্লভ ক্রৌড়ীই জোড়বাংলার প্রতিষ্ঠাতা।

মন্দিরটি আকার ছোট হলেও পোড়া মাটির ইট দিয়ে কারুকাজ খচিত নকশা দারুণভাবে আকর্ষণ করে দর্শনার্থীদের। ইমারতের ভেতরের রুমগুলো বেশ অপ্রশস্ত। ১৯৪৭ সালে দেশ ভাগের পর অনাদরে-অবহেলায় পড়ে ছিল মন্দিরটি।

জোড়বাংলা মন্দিরের স্থাপত্যশৈলীর নমুনা পাওয়া যায় পাবনায়, পশ্চিমবঙ্গের বর্ধমান জেলায়, বাঁকুড়ায়, পুরুলিয়া ও হুগলি জেলায়। পাবনার জোড়বাংলা মন্দিরে বর্তমানে পূজা অর্চনা করা হয় না। তবে কারও কারও মতে আগে এখানে নিয়মিত পূজা হতো।

প্রতিষ্ঠা যখনই হোক, প্রতিষ্ঠাতা যেই হোক, মন্দির হোক বা না হোক ভাস্কর্য শিল্পের এ প্রাচীন কীর্তিটি এখন আমাদের ঐতিহ্যের অংশ। এটিকে এখন সংরক্ষণ করাই বড় কথা। বর্তমানে এটি প্রত্নতত্ত্ব বিভাগের তত্ত্বাবধানে রয়েছে।

ডেইলি-বাংলাদেশ/এমআই
লিংক সফলভাবে কপি হয়েছে!