২০১৭ সালের ২৫ আগস্টের পর মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্য থেকে নিপীড়নের মুখে পালিয়ে বাংলাদেশে আশ্রয় নেয় কয়েক লাখ রোহিঙ্গা। এর আগে ৯০-এর দশকেও অনেক রোহিঙ্গা পালিয়ে বাংলাদেশে আশ্রয় নিয়েছিল। সব মিলিয়ে কক্সবাজারের উখিয়া ও টেকনাফের ৩৩টি আশ্রয় শিবিরে বসবাস করছে প্রায় ১২ লাখের মতো রোহিঙ্গা।
জাতিসংঘের শরণার্থীবিষয়ক সংস্থা ইউএনএইচসিআরের প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, আশ্রয় শিবিরগুলোতে মোট পরিবার রয়েছে প্রায় দুই লাখের মতো। এর মধ্যে ৩ শতাংশ পরিবারের সদস্য সংখ্যা ১০ জনের বেশি। ১০ শতাংশ পরিবারের সদস্য সংখ্যা ৮ থেকে ৯ জন। ২৩ শতাংশ পরিবারের সদস্য সংখ্যা ছয় থেকে সাতজন। ২৮ শতাংশ পরিবারে সদস্য সংখ্যা এক থেকে তিনজন। গড়ে প্রতি পরিবারের সদস্য সংখ্যা পাঁচজন। আশ্রয় শিবিরে নিবন্ধিত রোহিঙ্গাদের মধ্যে ৫২ শতাংশই শিশু। তাদের বয়স শূন্য থেকে ১৭ বছর। কক্সবাজারে রোহিঙ্গা আশ্রয় শিবিরগুলোর বেশির ভাগ উখিয়ার কুতুপালংয়ে। যেটিকে বলা হচ্ছে বিশ্বের সবচেয়ে বৃহৎ আশ্রয় শিবির। যেখানে ছোট একটি এলাকার মধ্যে সাত লাখের বেশি রোহিঙ্গার বসবাস।
.png)
উখিয়ার কুতুপালং ক্যাম্পের বাসিন্দা নুর কবির। সাত সন্তান ও স্ত্রীসহ ৯ জনের পরিবার নিয়ে নুর কবির গত ছয় বছর ধরে বসবাস করছেন ক্যাম্পের ডি-৫ ব্লকে। বড় ছেলের বয়স ১৮ বছর আর ছোট মেয়ের বয়স তিন বছর। নুর কবির বলেন, সাত সন্তানের মধ্যে চারজন ছেলে ও তিনজন মেয়ে। সামনে আল্লাহ দেন তো সন্তান আরো নেবো।
শুধু নুর কবির নন, কক্সবাজারের উখিয়া ও টেকনাফের ৩৩টি আশ্রয় শিবিরে বসবাস করা রোহিঙ্গা পরিবারগুলোতে বেশির ভাগের সন্তান সংখ্যা চারজনের বেশি। এমনকি যাদের পরিবারে পাঁচ থেকে ছয়জনের বেশি সন্তান রয়েছে, তারা আরো সন্তান নিতে আগ্রহী।
শরণার্থী ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কার্যালয় জানিয়েছে, রোহিঙ্গা ক্যাম্পে প্রতিদিন গড়ে জন্ম নিচ্ছে প্রায় ১০০ শিশু। এরই মধ্যে গেল ছয় বছরে জন্ম নিয়েছে দুই লাখের কাছাকাছি।
ক্যাম্পে দায়িত্বরত চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মীরা বলছেন, পরিবার-পরিকল্পনা সম্পর্কে অনাগ্রহ, রেশন বৃদ্ধি ও ক্যাম্পে কোনো বিনোদনের ব্যবস্থা না থাকা বেশি সন্তান জন্মদানের মূল কারণ।
উখিয়ার কুতুপালংয়ের স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্রের মিডওয়াইফ সুপারভাইজার আসমা আকতার বলেন, আরটিএমআই ইউএনএফপিএর অধীনে পরিচালিত প্রজেক্টে রোহিঙ্গা ক্যাম্পে মাঠপর্যায়ে কাজ করি। জন্ম নিয়ন্ত্রণে দীর্ঘমেয়াদি যে পদ্ধতি রয়েছে, এটা নিতে রোহিঙ্গাদের একদম আগ্রহ নেই। তারা মনে করে, সন্তান যত বেশি জন্ম নেবে মাথাপিছু রেশনও তত বেশি হবে। এছাড়াও তাদের মধ্যে বিভিন্ন ধরনের কুসংস্কার কাজ করে।
একই ক্যাম্পের স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্রের মেডিকেল অফিসার ডা. ফাতেমা আকতার বলেন, কোনো কাজকর্ম না থাকায় রোহিঙ্গাদের মধ্যে সন্তান জন্মদানের প্রবণতা অনেক বেশি। আমরা ক্যাম্পে প্রসূতি মায়েদের স্বাস্থ্যসেবা প্রদান করে থাকি। মাঠপর্যায়ে কাজ করছি। প্রতিটি পরিবারের কাছে গিয়ে পরিবার-পরিকল্পনা পদ্ধতি সম্পর্কে বুঝাচ্ছি এবং ডেমো প্রদর্শন করছি।
উখিয়ার রাজাপালং ইউনিয়ন পরিষদের ইউপি সদস্য হেলাল উদ্দিন বলেন, রোহিঙ্গারা বাংলাদেশের জন্য বিষফোঁড়া হয়ে দাঁড়িয়েছে। তাদের কন্ট্রোল করা না গেলে এ সমস্যা আরো বড় আকার ধারণ করবে। তাদের নিজ দেশ মিয়ানমারে দ্রুত প্রত্যাবাসনের ব্যবস্থা করতে হবে।
শরণার্থী ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনার মো. মিজানুর রহমান বলেন, ক্যাম্পে গড়ে প্রতিদিন ১০০ এর মতো শিশু জন্মগ্রহণ করছে। এটি আমাদের জন্য চ্যালেঞ্জ। নতুন নতুন শিশু জন্মগ্রহণ করছে, তাদের জন্য আমরা জায়গা কোথা থেকে দেবো।
কমিশনার মো. মিজানুর রহমান আরো বলেন, পরিবার পরিকল্পনা নিয়ে কাজ চলছে। বিভিন্ন আন্তর্জাতিক বেসরকারি সংস্থাও কাজ করছে। পাশাপাশি রোহিঙ্গা কমিউনিটি নেতা ও ইমামদেরকে সম্পৃক্ত করে সচেতনতার কাজ করে যাচ্ছি।