ঢাকা,  সোমবার   ০৫ অক্টোবর ২০২৬, ১৮ আশ্বিন ১৪৩৩

Advertisement
[ খবর ]

ছবি একেঁই নিজের ধর্ষককে শাস্তি দিয়েছিলেন এই নারী!

সাত রঙ ডেস্ক
প্রকাশিত: ১৬:৫৪, ১৫ এপ্রিল ২০২০
ছবি একেঁই নিজের ধর্ষককে শাস্তি দিয়েছিলেন এই নারী!
আর্টেমিসিয়া ক্যানভাসে একের পর এক ফুটিয়ে তুলতে থাকেন তার রাগ আর ক্ষোভ।

মাত্র ১৮ বছর বয়সে গৃহশিক্ষকের দ্বারা ধর্ষনের শিকার হন তিনি। বিয়ের প্রলোভন দেখিয়ে দিনের পর দিন তাকে অত্যাচার করে তার গৃহশিক্ষক। এভাবে কেটে যায় নয় মাস। তাকে বিয়ে করতে অস্বীকার করলে আদালতের দ্বারস্ত হন তিনি। সেখানে গৃহশিক্ষকের অপকর্ম প্রমাণ হলেও আশানুরূপ কোনো শাস্তি হয়নি। এতে অনেক কষ্ট পান এবং নিজের আঁকার ক্যানভাসেই ফুটিয়ে তোলেন ধর্ষকের শাস্তির নমুনা। এতে খ্যাতি কুড়িয়েছিলেন তার প্রজন্মের অন্যতম প্রগতিশীল এবং ভাববাদী চিত্রশিল্পী হিসেবে।

১৫৯৩ সালের ৮ জুলাই ইতালির রোমে জন্মগ্রহণ করেন তিনি। বাবা মায়ের দেয়া নাম আর্টেমিসিয়া জেন্তেলেসচি। বাবা ওরাজিও জেন্তেলেসি এবং মা প্রুডেনজিয়া দি ওটাভিয়ানো মন্টোনির জ্যেষ্ঠ সন্তান ছিলেন আর্টেমিসিয়া। ওরাজিও জেন্তেলেসি ছিলেন তুস্কানের একজন চিত্রশিল্পী। ছোটবেলা থেকেই বাবার কর্মশালায় চিত্রকর্মের সঙ্গে পরিচয় হয়েছিল তার। সেসময় মেয়েদের গির্জা ছাড়া বাইরে কোথাও যাওয়া ছিল একেবারেই নিষিদ্ধ। ঘরই ছিল তাদের একমাত্র জগত। এ কারণেই হয়তো আর্টেমিসিয়ার রং তুলির সঙ্গে সখ্যতাটা একটু বেশি হয়েছিল। তার অন্যান্য ভাইদের থেকে তার আঁকার হাত ছিল অনেক ভালো। আঁকার হাতেখড়ি মূলত বাবা ওরাজিওর কাছেই। পড়াশোনার পাশাপাশি চিত্রকর্মেও পারদর্শি হতে থাকেন আর্টেমিসিয়া।

রং তুলির সঙ্গে সখ্যতাটা একটু বেশি হয়েছিল আর্টেমিসিয়াররং তুলির সঙ্গে সখ্যতাটা একটু বেশি হয়েছিল আর্টেমিসিয়ার

Advertisement

ওরাজিও মেয়ে আর্টেমিসিয়ার আঁকার প্রতিভায় মুগ্ধ হন। তাকে আরো ভালো শিক্ষা দিতে অ্যাগ্রোস্টিনো তাসি নামের একজন চিত্রশিল্পীকে ঠিক করেন। অ্যাগ্রোস্টিনো তাসি ছিলেন একজন তরুণ চিত্রশিল্পী। কার্ডিনাল স্কিপিয়ন বোর্হেসের প্রাসাদে ফ্রেসকোতে কাজ করার সময় ওরাজিওর সঙ্গে বন্ধুত্ব হয় তাসির। তাসি সানন্দেই ওরাজির প্রস্তাবে রাজি হয়ে যায়। আর তার বাড়িতে থেকেই আর্টেমিসিয়াকে চিত্রকর্মে আরো পারদর্শি করে তুলতে থাকেন। আর্টেমিসিয়া অনেক আগ্রহ নিয়েই শিখতে থাকে সবকিছু। তবে ১৬১১ সালের এক দিন হঠাৎ করে আর্টেমিসিয়াকে একা পেয়ে ধর্ষন করে তাসি।

ধর্ষণের পরে আর্টেমিসিয়া তাসির সঙ্গে সম্পর্ক চালিয়ে যায়। কারণ তাসি আর্টেমিসিয়াকে বিয়ের করার প্রতিশ্রুতি দেয়। তবে নয় মাস পরে তাসি আর্টেমিসিয়াকে বিয়ে করতে অস্বীকৃতি জানায়। মাত্র ১২ বছর বয়সে মা হারানো আর্টেমিসিয়ার তেমন কোনো বন্ধু ছিল না। অবশেষে বাবা ওরাজিওকেই সব কথা জানায় আর্টেমিসিয়া। তখন ওরাজিও তাসির বিরুদ্ধে আর্টেমিসিয়াকে ধর্ষণের অভিযোগ আনেন। পরবর্তী সাত মাসের বিচারের সময়, তাসির বিরূদ্ধে আরো কিছু অভিযোগ প্রমাণিত হয়। এর মধ্যে ছিল তাসি তার স্ত্রীকে খুন করার পরিকল্পনা করেছিলেন। স্ত্রীর বোনের সঙ্গে ব্যভিচারে লিপ্ত ছিলেন এবং ওরিজিওর কয়েকটি চিত্র চুরি করার পরিকল্পনা করেছিলেন। বিচার শেষে তাসিকে রোম থেকে নির্বাসিত করা হয়েছিল। যদিও এই সাজা কখনো কার্যকর করা হয়নি। আর্টেমিসিয়াকে তার সাক্ষ্য যাচাইয়ের জন্য একটি পরীক্ষা করা হয়েছিল। সেখানে আর্টেমিসিয়ার হাতের আঙ্গুল দড়ি দিয়ে শক্ত করে বাঁধা হয়। তখনও আর্টেমিসিয়া তাসির বিরূদ্ধে এখই অভিযোগ করতে থাকে। এতে আদালত তার অভিযোগ সত্য বলে ধরে নেয়। তবে তাসির উপযুক্ত শাস্তি না হওয়ায় বেশ কষ্ট পান আর্টেমিসিয়া।

চিত্রকর্মে তিনি ধর্ষকে শাস্তি দেয়ার নানা নমুনা ফুটিয়ে তুলতে থাকেনচিত্রকর্মে তিনি ধর্ষকে শাস্তি দেয়ার নানা নমুনা ফুটিয়ে তুলতে থাকেন

এরপরই শুরু করেন ছবি আঁকা। ক্যানভাসেই একের পর এক ফুটিয়ে তুলতে থাকেন তার রাগ আর ক্ষোভ। চিত্রকর্মে তিনি ধর্ষকে শাস্তি দেয়ার নানা নমুনা ফুটিয়ে তুলতে থাকেন। তার রাগ আর ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ ছিল এসব চিত্রকর্ম। ১৬১২ সাল থেকে এসব চিত্রকর্ম আঁকতে শুরু করেন আর্টেমিসিয়া। এরমধ্যে একটি জনপ্রিয় চিত্রকর্ম ছিল হুফার্নেসের শিরশ্ছেদ। সেটি তিনি জুডিথের বাইবেলের গল্পে পড়েছিলেন। বেশিরভাগ শিল্প ইতিহাসবিদরা বিশ্বাস করেন আর্টেমিসিয়ার এই হিংস্র বিষয়টিকে আঁকার কারণ ছিল তার ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা। বিচারের এক মাস পরে ওরাজিও আর্টেমিসিয়াকে ফ্লোরেন্সের একজন শিল্পী পাইরেন্টনিও স্টিয়েটেসির সঙ্গে বিয়ে দেন। কিছুদিন পরে এ দম্পতি ফ্লোরেন্সে ইংল্যান্ডের হাউস অফ মেডিসি এবং চার্লস প্রথমের পৃষ্ঠপোষকতায় একজন সফল কোর্ট চিত্রশিল্পী হন।

ফ্লোরেন্সে থাকাকালীন ১৬১৮ সালে আর্টেমিসিয়া এবং পাইরেটোনিওর প্রথম কন্যা সন্তানের বাবা মা হন। যার নাম রাখা হয়েছিল প্রুডেন্টিয়া। পরবর্তিতে অবশ্য পামিমিরা নামেই তিনি বেশি পরিচিত ছিলেন। মাত্র ১২ বছর বয়সে মারা যায় প্রুডেন্টিয়া। আর্টেমিসিয়ার তার মায়ের নামে প্রুডেন্টিয়ার নামকরণ করেছিলেন। তবে ১২ বছর বয়সেই প্রুডেন্টিয়া তার মায়ের মতোই চিত্রশিল্পী হিসেবে নাম করে ফেলেছিল। মা আর্টেমিসিয়ার কাছেই পেয়েছিল হাতেখড়ি। প্রুডেন্টিয়ার মৃত্যুর পর আর্টেমিসিয়ার আরও দু’টি কন্যা সন্তান হয়। তারাও পরবর্তিতে মায়ের পথ অনুসরণ করে চিত্রশিল্পী হন বলে জানা যায়।      

ফ্লোরেন্সে আর্টেমিসিয়া জীবনের উল্লেখযোগ্য সাফল্যগুলো পান। তিনি হলেন প্রথম নারী যিনি একাডেমি অফ দ্য আর্টস অফ ড্রইং এ অংশগ্রহণ করেছিলেন। তিনি তার সময়ের সর্বাধিক সম্মানিত শিল্পী যেমন ক্রিস্টোফানো অ্যালোরির সঙ্গে সুসম্পর্ক বজায় রেখেছিলেন। তার আঁকা চিত্রকর্মের বেশিরভাগ নারী চরিত্র তিনি নিজেই ছিলেন। ১৬১৬ থেকে ১৬২০ সাল পর্যন্ত ফ্লোরেন্সে থাকাকালীন আর্টেমিসিয়া অনেক চিত্রকর্ম এঁকেছেন।

এসময় তার জীবন এক নতুন মোড় নেয়। অপ্রত্যাশিতভাবে ফ্রান্সেস্কো মারিয়া মারিংহি নামে এক ধনী ফ্লোরেনটাইনের সঙ্গে প্রেমের সম্পর্কে জড়ান আর্টেমিসিয়া। নানা কর্মশালায় অংশ নিতে গিয়েই পরিচয় হয় দুজনের। একথা তার স্বামী পাইরেটোনিওর জানলেও কোনো বাধা দেননি। ধারণা করা হয় ফ্রান্সেস্কো মারিয়া তাদের আর্থিকভাবে সাহায্য করেছিলেন। তবে ১৬২০ সালে এ কথা চারপাশে অনেকেই জেনে যায়। ফ্রান্সেস্কো মারিয়া আর্থিক সমস্যায় পড়লে আর্টেমিসিয়ার কাছে টাকা ফেরত চায়। আর্টেমিসিয়া টাকা দিতে অস্বীকৃতি জানালে ফ্রান্সেস্কো মারিয়া ফ্লোরেনটাইন আদালতে মামলা করে। চলমান আইনী ও আর্থিক সমস্যার জন্য আর্টেমিসিয়া ১৬২১ রোমে ফিরে আসে। এসময় তার স্বামীকে ছেড়ে তিনি একাই ফিরে আসেন রোমে। রোমে এসে পুরোদমে আবার তার চিত্রকর্মের কাজ শুরু করেন। এখানে এসেই হোলোফের্নাসের শিরোনাম আর্টেমিসিয়া জুডিথের দ্বিতীয় সংস্করণ আঁকেন। যা এখন ফ্লোরেন্সের উফিজি গ্যালারীটিতে রাখা হয়েছে। প্রথম ছোট জুডিথ শিরশ্ছেদ চিত্রকর্মটি ১৬১২ থেকে ১৬১৩ সালের মধ্যে নেপলসের ক্যাপোডিমনটে প্রদর্শন করা হয়।  

চিত্রকর্মে ধর্ষকে শাস্তি দেয়ার নানা নমুনা ফুটিয়ে তুলতে থাকেন আর্টেমিসিয়া  চিত্রকর্মে ধর্ষকে শাস্তি দেয়ার নানা নমুনা ফুটিয়ে তুলতে থাকেন আর্টেমিসিয়া  

আর্টেমিসিয়া স্বামীর থেকে পৃথক হওয়ার পর একটি স্বাধীন জীবনযাপন করেন। তিনি প্রায়ই মেয়েদের সঙ্গে নেপলস এবং ভেনিসে ভ্রমণে যেতেন। ১৬৩৮ সালে ইংল্যান্ডের রাজা চার্লসের প্রথমের আমন্ত্রণে আর্টেমিসিয়া তার বাবা ওরাজিওর সঙ্গে লন্ডনে যান। সেখানে তারা  গ্রিনউইচের কুইন্স হাউসে গ্রেট হলের সিলিংয়ের জন্য চিত্রকলায় অংশ নিয়েছিলেন। পরের বছর তার বাবা মারা যাওয়ার পরে আর্টেমিসিয়া ইংল্যান্ডেই থেকে যান। তিনি নিজের একটি সেলফ পোর্টেট আকেন। আর এতো ভালো ছবি একেছিলেন যে এ তার খ্যাতি তার বাবার চেয়েও বেশি ছাড়িয়ে গিয়েছিল। ১৬৪০ অথবা ১৬৪১ সালে আর্টেমিসিয়া ইতালিতে ফিরে আসেন। ১৬৫২ সালে মৃত্যুর আগ পর্যন্ত নেপলসে ছিলেন। তবে তার মৃত্যু নিয়ে রয়েছে নানা বিতর্ক। অনেকের মতে ১৬৫৬ সালে নেপলসে ভয়াবহ প্লেগের কারণে তিনি মারা গিয়েছিলেন।

তার মৃত্যুর বহু বছর কেটে গেলেও এখনো তার আঁকা ছবি প্রদর্শিত হচ্ছে বিশ্বের নানা প্রান্তে। বিখ্যাত লেখক রোমোলায় জর্জ এলিয়ট তার একটি উপন্যাসে আর্টেমিসিয়াকে নিয়ে লিখেছিলেন। এছাড়াও বিশ্বে নানা জায়গায় আর্টেমিসিয়ার জীবনী নিয়ে তৈরি হয়েছে অনেক গল্প, উপন্যাস, নাটক। কানাডিয়ান নাট্যকার স্যালি ক্লার্ক আর্টেমিসিয়ার ধর্ষণ এবং তারপরে ঘটে যাওয়া ঘটনাগুলির উপর ভিত্তি করে ১৯৮৮ সালে একাধিক মঞ্চ নাটক রচনা করেছিলেন। এছাড়াও অগ্নেস মেরলেট তৈরি করেন আর্টেমিসিয়া ছবিটি। ছবিটিতে আর্টেমিসিয়ার একজন পেশাদার শিল্পী হয়ে ওঠার গল্প, তাসির সঙ্গে তার সম্পর্ক এবং বিচারের গল্প ফুটিয়ে তোলা হয়েছে। ছবিটি ১৯৭৭ সালে মুক্তি পায়।

ব্রিটিশ টিভি অপরাধ সিরিজ এন্ডেভর ২০১৮ এর একটি পর্বে দেখানো হয়েছে যে, আর্টেমিসিয়া বাইবেলিক চিত্রগুলো থেকে অনুপ্রাণিত হয়ে এক নারী নারীদের ক্ষতিগ্রস্থ বা নির্যাতন করেছে এমন পুরুষদের প্রতি প্রতিশোধ নিচ্ছে। সম্প্রতি তার কাজের প্রতি উত্সর্গীকৃত একটি প্রদর্শনী লন্ডনের জাতীয় গ্যালারিতে ২০২০ সালে অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা ছিল। তবে করোনাভাইরাস মহামারিজনিত কারণে তা স্থগিত করা হয়েছে।

 

সূত্র:অলদ্যটসইন্টারেস্টিং

ডেইলি-বাংলাদেশ/আরএজে
লিংক সফলভাবে কপি হয়েছে!