জীবন ঘুড়ির নাটাই আপনার হাতেই
আপনার সন্তানকে আপনি বাসায় আগলে রাখতে পারবেন, দেখে রাখতে পারবেন, তাৎক্ষণিক পরামর্শ দিতে পারবেন। বাসায় তার জন্য আরও অনেক কিছু করতে পারবেন।
কিন্তু বাসার বাইরে আপনি এগুলো করতে পারবেন না। তাকে একাই সে ময়দানে লড়াই করে টিকতে হবে।
বাড়ির চৌহদ্দির বাইরে তার আবদার কেউ রাখবে না। সবাই তাকে ভালোবাসবে না। অনেকেই তাকে প্রত্যাখ্যান করবে। অনেকেই তার সঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করবে। কেউ কেউ তার মাথায় বড়ই রেখে খাবে।
এটাই বাস্তবতা।
তাহলে আপনি কী করবেন?
আপনার প্রধান কাজ হবে তাকে বাইরের দুনিয়া মোকাবিলা করতে শেখানো।
এ শিক্ষা কীভাবে দেওয়া যায়?
আমার মতে, সবার আগে তাকে নিচের শিক্ষাগুলো দেওয়া উচিত।
১) সবাই তাকে পছন্দ করবে না। এ ব্যাপারটি তাকে মেনে নিতে শিখতে হবে। তাহলে সে প্রত্যাখ্যানের বেদনায় মুষড়ে পড়বে না।
২) সে বিনয়ী হবে, তার মানে সবাইকে যে সে খুশি করবে, তা নয়। দুনিয়ার সবাইকে খুশি করতে গেলে তার আত্মমর্যাদা বলে কিছু থাকবে না।
৩) তাকে যেমন কেউ কেউ ফিরিয়ে দেয়, তাকেও অনেককে ফিরিয়ে দিতে হবে। সুন্দরভাবে প্রত্যাখ্যান করতে পারাটা অনেক বড় গুণ। এ গুণ তাকে অর্জন করতে হবে।
সম্ভবত রিডার্স ডাইজেস্ট একবার কভার স্টোরি করেছিল, ‘If you want success, you must learn to say NO’—সাফল্য চাইলে আগে না বলতে শিখুন।
৪) সে কখনোই অন্যের মনোযোগ ভিক্ষা করবে না। যারা মনোযোগ ভিক্ষা করে, তাদের অন্যরা গুরুত্ব দেয় না। কোনো ভিক্ষাবৃত্তিই ভালো নয়।
৫) ব্যর্থ হওয়াটা খুবই স্বাভাবিক। কোনো ব্যর্থতা ছাড়া একদমে সাফল্য পেয়েছেন, এমন মানুষ ইতিহাসে নেই বললেই চলে। তাই ব্যর্থতায় ভেঙে না পড়ে কেন ব্যর্থ হলো, তা বিশ্লেষণ করতে হবে। তারপর পরের লাফটা দিতে হবে। তাহলেই হাই জাম্পের দড়ি পার হওয়া যাবে।

৬) সবকিছু অর্জন করা তার পক্ষে সম্ভব হবে না। এটাই স্বাভাবিক। ইদানীং অনেক মোটিভেশনাল বক্তা বলেন, অসম্ভব বলতে কিছু নেই। বোগাস কথাবার্তা। ফরাসি সম্রাট নেপোলিয়ন বলতেন, ‘আমার অভিধানে অসম্ভব শব্দটি নেই।’ বেচারা ওয়াটারলু যুদ্ধে হেরে সেন্ট হেলেনা দ্বীপে বন্দী অবস্থায় মারা যান। যিনি বলতেন, কিছুই অসম্ভব নয়, তিনি এমনকি নিজের স্বাচ্ছন্দ্যময় মৃত্যুও সম্ভব করতে পারেননি।
৭) তাকে ধৈর্যশীল হতে হবে। দুনিয়ায় চলার পথে অনেক মানুষের সঙ্গে তার দেখা হবে। এদের সবার আচরণ তার ভালো লাগবে না। অনেকেই তাকে হয়তো অপমানও করবে। কিন্তু সঙ্গে সঙ্গে রিঅ্যাক্ট করা যাবে না। চিন্তাভাবনা করে পদক্ষেপ নিতে হবে। সুচিন্তিত সিদ্ধান্তের জয় প্রায় অনিবার্য।
৮) তাকে শিখতে হবে, আয় করা সংগ্রাম আর ব্যয় করা এক ধরনের শিল্প। এ শিল্প আয়ত্ত করতে না পারলে রাজার ভাণ্ডারও ফুরিয়ে যায়।
৯) সব সুযোগ কিন্তু সুযোগ নয়। তা বিপদের ডাকও হতে পারে। তাই কোনো সুযোগ এলে সঙ্গে সঙ্গে ঝাঁপ দেওয়া যাবে না। আগে মুদ্রার দুটো পিঠ যাচাই করতে হবে, তারপর সিদ্ধান্ত নিতে হবে সুযোগটি নেওয়া উচিত হবে কি না।
১০) ওপরওয়ালা চাইলে আমাদের হাতে অসংখ্য আঙুল দিতে পারতেন। কিন্তু তিনি তা দেননি, কারণ তাতে আঙুলের আসল কাজই অসম্ভব হয়ে যেত। তাই তিনি যতটা আঙুল দরকার, ততটা দিয়েছেন। একইভাবে জীবনে অসংখ্য বন্ধু দরকার নেই। কিছু প্রকৃত বন্ধু থাকাই ভালো। যাদের রাত দুটোর সময়ও দরকার হলে ঘুম ভাঙিয়ে ডেকে আনা যায়।
আমাদের স্কুলের একজন চেয়ারম্যান ছিলেন, নাম এস এম আকরাম। তিনি স্কুলের অভিভাবকদের বলতেন, ‘যিনি ঘুড়ির নাটাই ভালো নিয়ন্ত্রণ করতে পারেন, তাঁর ঘুড়ি আকাশে কাটাকাটি খেলায় জেতে। আপনার সন্তান হচ্ছে ঘুড়ি, তার নাটাই আপনার হাতে। সে নাটাই ভালোভাবে চালাতে শিখুন।’
আপনার সন্তানের নাটাইও আপনার হাতে। আপনি তাকে যা শেখাবেন, সেটাই তাকে পথ দেখাবে। ঠিক শিক্ষা দিলে আকাশে উড়বে। ভুল শিক্ষা দিলে অকালে কাটা পড়বে।