ঢাকা,  মঙ্গলবার   ২৭ অক্টোবর ২০২৬, ১১ কার্তিক ১৪৩৩

[ রাজধানী ]

দুর্গন্ধে অতিষ্ঠ নগরবাসী, দূষণে বিপন্ন হাতিরঝিল

নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশিত: ১২:৩১, ২৭ অক্টোবর ২০২৬
দুর্গন্ধে অতিষ্ঠ নগরবাসী, দূষণে বিপন্ন হাতিরঝিল
ছবি: সংগৃহীত

একসময় রাজধানীবাসীর স্বস্তি, সৌন্দর্য ও যাতায়াতের বিকল্প পথ হিসেবে পরিচিত হাতিরঝিল এখন দূষণ ও তীব্র দুর্গন্ধের কারণে দুর্ভোগের কারণ হয়ে উঠেছে। লেকের কালচে পানির দুর্গন্ধ ছড়িয়ে পড়ছে আশপাশের আবাসিক এলাকাতেও। পরিবেশ বিশেষজ্ঞদের আশঙ্কা, দীর্ঘদিন ধরে পয়োবর্জ্য জমে থাকায় জলাধারটির বাস্তুতন্ত্র ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে এবং ক্ষতিকর গ্যাস উৎপন্ন হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়েছে।

সম্প্রতি জাতীয় দৈনিক প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে হাতিরঝিলের এ পরিস্থিতির কথা উঠে এসেছে। সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, প্রায় ২ হাজার কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত এ প্রকল্পের যথাযথ ব্যবস্থাপনা ও রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে দূষণ বেড়েছে। দূষণ নিয়ন্ত্রণে বিশেষজ্ঞদের দেওয়া সুপারিশও কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন করা হয়নি বলে অভিযোগ রয়েছে।

হাতিরঝিল ঘুরে দেখা গেছে, লেকের পানি কালচে ও ময়লাযুক্ত হয়ে পড়েছে। সোনারগাঁও, মগবাজার, রামপুরা ও মহানগর এলাকায় ছড়িয়ে পড়েছে তীব্র দুর্গন্ধ। লেকের পাশ দিয়ে হাঁটার সময় অনেককে নাক-মুখ চেপে রাখতে দেখা যায়। স্থানীয় বাসিন্দাদের ভাষ্য, দুর্গন্ধের কারণে লেকে আসা ও সেখানে সময় কাটানোর প্রবণতা কমেছে।

মহানগর প্রজেক্টের বাসিন্দা আলমাস সরকার বলেন, ‘একটা সময় নিয়মিত লেকে হাঁটতে আসতাম। এখন কালেভদ্রে আসি। তীব্র দুর্গন্ধে যেন জীবন বেরিয়ে আসার অবস্থা। আসলে এখানে আর হাঁটার বা অবস্থান করার কোনো পরিবেশ নেই।’

দুর্গন্ধের প্রভাব পড়ছে আশপাশের আবাসিক এলাকাতেও। মহানগর আবাসিক এলাকার বাসিন্দা তাসলিমা আক্তার বলেন, ‘হাতিরঝিলের দুর্গন্ধ এখন আর লেকের সীমানায় আটকে নেই। আমরা যারা আশপাশ এলাকায় বসবাস করছি, আমাদের বাসাবাড়িতেও দুর্গন্ধ চলে এসেছে। তীব্র এ দুর্গন্ধে বসবাস করা প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়েছে। যারা ভাড়া থাকেন, তাদের অনেকেই বাসা পাল্টে ফেলেছেন।’

দায়িত্ব হস্তান্তরের পর অবনতির অভিযোগ

২০১৩ সালের জানুয়ারিতে হাতিরঝিল উদ্বোধনের পর থেকে এর ব্যবস্থাপনা ও রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব পালন করে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর স্পেশাল ওয়ার্কস অর্গানাইজেশন (এসডব্লিউও)। প্রকল্পের মেয়াদ ২০২১ সালের ৩০ জুন শেষ হলে স্থায়ী মালিক ও বাস্তবায়নকারী সংস্থা হিসেবে রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষকে (রাজউক) পরিচালনা ও রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয় সরকার। ওই বছরের জুলাই থেকে কার্যত দায়িত্ব পালন করছে রাজউক।

সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, রাজউকের তত্ত্বাবধানে যাওয়ার পর থেকে ধীরে ধীরে হাতিরঝিলের পরিবেশের অবনতি ঘটেছে। এর আগে পানির দুর্গন্ধ নিয়ন্ত্রণে বিশেষ রাসায়নিক প্রয়োগ এবং লেকের তলদেশে অক্সিজেন সরবরাহের ব্যবস্থা ছিল। পরবর্তী সময়ে এসব কার্যক্রমের ধারাবাহিকতা বজায় রাখা হয়নি বলে অভিযোগ রয়েছে। পাশাপাশি আশপাশের এলাকা থেকে পয়োবর্জ্য লেকে প্রবেশ করায় দূষণ বেড়েছে।

নগর বিশ্লেষকদের ভাষ্য, কয়েক বছর আগেও শীতকালে হাতিরঝিলের পানিতে দুর্গন্ধের তীব্রতা বেশি থাকত। তবে গত দুই বছর ধরে প্রায় সারা বছরই এ সমস্যা দেখা যাচ্ছে। এতে লেকের পাশ দিয়ে চলাচলকারী মানুষ ও আশপাশের বাসিন্দাদের দুর্ভোগ বাড়ছে।

রাজধানীর ধানমন্ডি, গুলশান ও বনানী লেকও দূষণের শিকার। তবে সংশ্লিষ্টদের মতে, এসব লেকের আশপাশে দুর্গন্ধ এখনো হাতিরঝিলের মতো অসহনীয় পর্যায়ে পৌঁছেনি। হাতিরঝিলের বড় অংশজুড়ে দুর্গন্ধ ছড়িয়ে পড়ায় এর ব্যবস্থাপনা ও রক্ষণাবেক্ষণ নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।

বিশেষজ্ঞদের সুপারিশ বাস্তবায়ন হয়নি

হাতিরঝিল নির্মাণ ও নকশা প্রণয়নের সঙ্গে যুক্ত স্থাপত্য প্রতিষ্ঠান ‘ভিত্তি স্থপতি’র প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা ইকবাল হাবিব বলেন, রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে হাতিরঝিল ইউট্রোফিকেশন বা অতিরিক্ত পুষ্টি উপাদান জমে জলজ পরিবেশের ভারসাম্য নষ্ট হওয়ার পর্যায়ে পৌঁছেছে। এতে পানির গুণগত মান কমে জলাধারটির স্বাভাবিক বাস্তুতন্ত্র ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। এ পরিস্থিতির জন্য তিনি রাজউকের ব্যবস্থাপনাকে দায়ী করেন।

তিনি জানান, প্রায় দেড় বছর আগে হাতিরঝিলের দূষণ নিয়ন্ত্রণে করণীয় নির্ধারণের জন্য রাজউকে একটি বৈঠক হয়। সেখানে প্রকল্প নির্মাণের সঙ্গে যুক্ত বিশেষজ্ঞদের মতামত চাওয়া হয়েছিল। পরে সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা প্রায় দেড় মাস কাজ করে বিনা পারিশ্রমিকে বেশ কয়েকটি সুপারিশ জমা দেন। কিন্তু দেড় বছরেও সেগুলো বাস্তবায়নে কার্যকর উদ্যোগ দেখা যায়নি বলে অভিযোগ তাঁর।

ইকবাল হাবিবের ভাষ্য, লেকে পয়োবর্জ্য প্রবেশ বন্ধ করা ছিল বিশেষজ্ঞদের অন্যতম প্রধান সুপারিশ। লেকের দুই পাশের বড় পাইপের মাধ্যমে বর্জ্য দাশেরকান্দি পয়ঃশোধনাগারে পাঠানোর ব্যবস্থা করার প্রস্তাবও দেওয়া হয়েছিল। পাশাপাশি লেকের পানি পরিশোধন ও বাস্তুতন্ত্র পুনরুদ্ধারে কিছু নির্দিষ্ট করণীয় রাজউককে জানানো হয়। কিন্তু এসব সুপারিশ বাস্তবায়নে অগ্রগতি হয়নি বলে তিনি অভিযোগ করেন।

বিশেষজ্ঞদের মতে, হাতিরঝিলের পরিবেশ পুনরুদ্ধারে শুধু পানি পরিষ্কার করলেই হবে না। পয়োবর্জ্য প্রবেশের পথ বন্ধ করা, জমে থাকা দূষণ নিয়ন্ত্রণ এবং জলাধারের স্বাভাবিক বাস্তুতন্ত্র ফিরিয়ে আনতে হবে।

স্টামফোর্ড ইউনিভার্সিটি বাংলাদেশের বিজ্ঞান অনুষদের ডিন ও পরিবেশবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. আহমদ কামরুজ্জমান মজুমদার বলেন, হাতিরঝিলের দূষণের অন্যতম উৎস পয়োবর্জ্য। বছরের পর বছর এসব বর্জ্য জমে থাকলে জৈব পদার্থের পচন থেকে মিথেনের মতো গ্যাস উৎপন্ন হতে পারে। এ ধরনের গ্যাস পরিবেশ ও মানবস্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর হতে পারে বলে তিনি জানান।

দূষণের দায় নিয়ে রাজউক-ওয়াসার পাল্টাপাল্টি বক্তব্য

হাতিরঝিলের দূষণ ও দুর্গন্ধের জন্য রাজউক ও ঢাকা ওয়াসা পরস্পরকে দায়ী করছে। রাজউকের দাবি, ওয়াসার অপর্যাপ্ত পয়োনিষ্কাশন নেটওয়ার্কের কারণে পান্থপথ, ধানমন্ডি, গ্রিন রোডসহ আশপাশের এলাকার পয়োবর্জ্য সরাসরি হাতিরঝিলে পড়ছে।

রাজউকের প্রধান প্রকৌশলী মো. মুজাফফর উদ্দিন বলেন, হাতিরঝিল একটি সমন্বিত প্রকল্প। তাঁর ভাষ্য, পয়োবর্জ্য যেন লেকে না যায়, তা নিশ্চিত করার দায়িত্ব ওয়াসার। তবে বৃষ্টির সময় হাতিরঝিলের দুই পাশে থাকা বিশেষ পয়োনিষ্কাশন পাইপের (এসএসডি) ধারণক্ষমতা ছাড়িয়ে যায়। তখন পান্থপথ, ধানমন্ডিসহ আশপাশের এলাকার জলাবদ্ধতা কমাতে সরাসরি বর্জ্য ও পানি হাতিরঝিলে ছেড়ে দেওয়া হয়। এতে লেকের দূষণ ও দুর্গন্ধ বাড়ছে বলে দাবি করেন তিনি।

দুর্গন্ধ কমাতে সাময়িক ব্যবস্থা নেওয়ার কথাও জানান মো. মুজাফফর উদ্দিন। তিনি বলেন, বৃষ্টির পর জরুরি ভিত্তিতে রাসায়নিক প্রয়োগ করা হবে। এতে দুর্গন্ধ অনেকটাই কমবে বলে আশা করা হচ্ছে। পাশাপাশি পয়োনিষ্কাশন লাইনগুলোর ব্যবস্থাপনার দায়িত্ব বুঝে নিতে ওয়াসাকে চিঠি দেওয়া হয়েছে। ওয়াসা সম্মতি দিয়েছে এবং পৃথক প্রকল্প নেওয়ার কথা জানিয়েছে বলেও তিনি দাবি করেন।

ঢাকা এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে নির্মাণের কারণেও হাতিরঝিলের দূষণ নিয়ন্ত্রণ ব্যাহত হচ্ছে বলে জানিয়েছে রাজউক। সংস্থাটির কর্মকর্তাদের দাবি, নির্মাণকাজের কারণে লেকের সোনারগাঁও অংশের ডিফিউজারগুলো চালানো যাচ্ছে না। ফলে ওই অংশে অক্সিজেন সরবরাহ ও পানি পরিশোধন কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে।

তবে হাতিরঝিলের দূষণের দায় নিতে রাজি নয় ঢাকা ওয়াসা। সংস্থাটির দাবি, এ জলাধারে তাদের কোনো পয়োনিষ্কাশন নেটওয়ার্ক নেই; লেকের দুই পাশের এসএসডি নেটওয়ার্ক রাজউকের তত্ত্বাবধানে রয়েছে।

ঢাকা ওয়াসার উপপ্রধান জনতথ্য কর্মকর্তা মো. আব্দুল কাদের বলেন, এসএসডি নেটওয়ার্কের মাধ্যমে পয়োবর্জ্য রামপুরা লিফটিং স্টেশন পর্যন্ত পৌঁছে দেওয়ার দায়িত্ব রাজউকের। এরপর বর্জ্য দাশেরকান্দি পয়ঃশোধনাগারে নিয়ে পরিশোধন করে নদীতে ফেলার দায়িত্ব ওয়াসার। তাঁর ধারণা, রাজউকের এসএসডি লাইনের কোথাও ছিদ্র বা লিকেজ থাকায় পয়োবর্জ্য লেকে ছড়িয়ে পড়ছে এবং দুর্গন্ধ তৈরি হচ্ছে।

দুই সংস্থার পাল্টাপাল্টি বক্তব্যের মধ্যে হাতিরঝিলের দূষণ কমানোর স্থায়ী সমাধান এখনো স্পষ্ট নয়। বিশেষজ্ঞদের মতে, দূষণের উৎস শনাক্ত করে পয়োবর্জ্য প্রবেশ বন্ধ, কার্যকর শোধনব্যবস্থা এবং নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ নিশ্চিত করা না গেলে পরিস্থিতির আরও অবনতি হতে পারে।

রাজধানীর জলাধার ও উন্মুক্ত পরিসর রক্ষার অন্যতম উদাহরণ হিসেবে পরিচিত হাতিরঝিলের বর্তমান পরিস্থিতি নগর ব্যবস্থাপনার কার্যকারিতা নিয়েও প্রশ্ন তুলছে। বিপুল অর্থ ব্যয়ে নির্মিত প্রকল্পটির দীর্ঘমেয়াদি সুফল ধরে রাখতে সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর সমন্বিত ও কার্যকর উদ্যোগ জরুরি।

ডেইলি-বাংলাদেশ/এআর
লিংক সফলভাবে কপি হয়েছে!