ঢাকা,  বৃহস্পতিবার   ০৮ অক্টোবর ২০২৬, ২২ আশ্বিন ১৪৩৩

[ রাজনীতি ]
১১ দলীয় ঐক্যে বড় ফাটল

কেন জোট ছাড়লো খেলাফত মজলিস

বিশেষ প্রতিবেদক
প্রকাশিত: ১৭:০৬, ২৫ জুলাই ২০২৬
কেন জোট ছাড়লো খেলাফত মজলিস
ছবি: সংগৃহীত

১১ দলীয় জোটে বড় ধরনের ধস নেমেছে।  দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন করে চাঞ্চল্য তৈরি করে দীর্ঘদিনের টানাপোড়েন, নীতিগত মতপার্থক্য এবং আসনভিত্তিক অভ্যন্তরীণ অসন্তোষের জের ধরে জোট থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে বের হয়ে এসেছে শরিক দল খেলাফত মজলিস।  

দলটির শীর্ষ নেতৃত্বের পক্ষ থেকে জোট ত্যাগের এই সিদ্ধান্তের কথা জানানোর পর থেকেই তোলপাড় শুরু হয়েছে পুরো রাজনৈতিক পটভূমিতে। বিশেষ করে ইসলামপন্থী দলগুলোর ঐক্যবদ্ধ অবস্থান ধরে রাখার চেষ্টা যখন কিছুদিন ধরে চলছিল, তখন এই ভাঙনকে এক বড় ধরনের ধাক্কা হিসেবেই দেখছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা।

শনিবার (২৫ জুলাই) ঢাকায় সংবাদ সম্মেলনে খেলাফত মজলিসের কেন্দ্র থেকে জোট ত্যাগের এই ঐতিহাসিক সিদ্ধান্ত ঘোষণা করা হয়।  ওই সংবাদ সম্মেলনে দলের আমির মাওলানা আব্দুল বাসিত আজাদ এবং মহাসচিব ড. আহমদ আব্দুল কাদেরসহ কেন্দ্রীয় শীর্ষ নেতারা উপস্থিত ছিলেন। সংবাদ সম্মেলনে লিখিত বক্তব্য পাঠ করে ড. আহমদ আব্দুল কাদের ক্ষোভ ও প্রসংগ ব্যাখ্যা করেন।  তিনি বলেন, আমরা একটি বৃহত্তর আদর্শিক ও জাতীয় স্বার্থকে সামনে রেখে এই ১১ দলীয় জোটে শরিক হয়েছিলাম।  কিন্তু অত্যন্ত দুঃখজনক হলেও সত্য, জোটের প্রধান দলগুলোর একক সিদ্ধান্ত চাপিয়ে দেওয়ার প্রবণতা, ছোট শরিকদের মতামতকে অবমূল্যায়ন করা এবং আন্দোলনের কৌশল নির্ধারণে আমাদের মৌলিক প্রস্তাবনাগুলোকে ধারাবাহিকভাবে উপেক্ষা করা হয়েছে। 

এ অবস্থায় জোটের অংশ হিসেবে থেকে নিজেদের রাজনৈতিক স্বতন্ত্রতা ও জনগণের কাছে জবাবদিহিতা ধরে রাখা আমাদের জন্য অসম্ভব হয়ে পড়েছিল।  তিনি আরও বলেন, আগামী দিনের নির্বাচনকেন্দ্রিক আসন বণ্টন প্রক্রিয়া ও জোটের রূপরেখা নির্ধারণে ছোট ও মাঝারি দলগুলোর সঙ্গে সমমর্যাদাপূর্ণ আচরণ করা হয়নি।  সংবাদ সম্মেলনে দলের আমির মাওলানা আব্দুল বাসিত আজাদ নিজ দলের এই কঠিন সিদ্ধান্ত সমর্থন করে বলেন, খেলাফত মজলিস সর্বদাই নীতি ও আদর্শের ওপর দাঁড়িয়ে রাজনীতি করে এসেছে।  কোনো সাময়িক পদ-পদবি বা সামান্য কয়েকটি আসনের বিনিময়ে আমরা আমাদের মূল আদর্শিক জায়গা থেকে সরে আসতে পারি না। জোটে পারস্পরিক শ্রদ্ধা, সমঅধিকার ও ন্যায্যতার চরম অভাব দেখা দিয়েছিল।  ফলে আমাদের দলের সর্বোচ্চ নীতি নির্ধারণী পর্ষদ ‘মজলিসে শূরা’ সর্বসম্মতিক্রমে এই জোট ত্যাগ করে স্বাধীন ও এককভাবে রাজপথে পথচলার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছে।

খেলাফত মজলিসের এই হঠাৎ জোট ত্যাগের সিদ্ধান্তের পর ১১ দলীয় ঐক্যের অন্যান্য শরিকদের মধ্যে ব্যাপক প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয়েছে। জোটের মূল সমন্বয়ক ও অন্যান্য শীর্ষ নেতারা খেলাফত মজলিসের এমন অবস্থানকে অত্যন্ত হতাশাজনক ও অনভিপ্রেত বলে আখ্যায়িত করেছেন।  জোটের শীর্ষ পর্যায়ের অন্যতম নেতা এবং বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের মহাসচিব মাওলানা ইউনুছ আহমাদ এক তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়ায় তাদের এই সিদ্ধান্ত নিয়ে অসন্তোষ প্রকাশ করেন।  তিনি মন্তব্য করেন, খেলাফত মজলিসের মতো একটি দীর্ঘ অভিজ্ঞতাসম্পন্ন ও দায়িত্বশীল দলের এভাবে হুট করে জোট ত্যাগ করা অত্যন্ত দুঃখজনক ঘটনা।  কোনো বিষয়ে অসন্তোষ, ক্ষোভ বা অভিমান থাকলে তা জোটের অভ্যন্তরীণ ফোরামে আলোচনার মাধ্যমে সমাধান করা যেত।  কিন্তু একতরফাভাবে প্রেস ব্রিফিং করে জোট ছেড়ে দেওয়া ঐক্যের চেতনাকে দুর্বল করে দেয়। তা সত্ত্বেও আমরা আশা করি, দেশের বর্তমান সার্বিক রাজনৈতিক পরিস্থিতি বিবেচনা করে তারা তাদের এই সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনা করবেন এবং আবারও জাতীয় ঐক্যের স্বার্থে ফিরে আসবেন।

অন্যদিকে, জোটের অন্যতম প্রধান নীতি নির্ধারক ও খেলাফত আন্দোলনের শীর্ষ নেতা অধ্যক্ষ মাওলানা জয়নুল আবেদীন খেলাফত মজলিসের আনা বৈষম্যের অভিযোগ সম্পূর্ণভাবে অস্বীকার করেছেন।  তিনি পাল্টা যুক্তি দিয়ে বলেন, জোটে কাউকে ছোট করা বা অবমূল্যায়ন করার প্রশ্নই ওঠে না।  জোট পরিচালনার ক্ষেত্রে শুরু থেকেই সর্বদা সর্বসম্মত গণতান্ত্রিক চর্চা বজায় রাখা হয়েছে।  প্রতিটি বৈঠকে প্রতিটি শরিক দলের মতামত গুরুত্ব সহকারে শোনা হয়েছে।  আসন সমঝোতার বিষয়টি এখনো প্রাথমিক পর্যায়ে রয়েছে এবং তা নিয়ে চূড়ান্ত আলোচনার পথ উন্মুক্ত ছিল।  কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হওয়ার আগেই এভাবে হঠাৎ জোট ছেড়ে দেওয়া রাজনৈতিক দূরদর্শিতার পরিচয় দেয় না।  তবে খেলাফত মজলিস চলে গেলেও ১১ দলীয় ঐক্যের গতি থেমে থাকবে না।  বাকি যেসব দল রয়েছে, তাদের নিয়েই জোটের কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্য ও আদর্শ বাস্তবায়ন করা হবে।

জোটের আরও একটি শরিক দল, বাংলাদেশ ফরায়েজী আন্দোলনের সভাপতি মাওলানা ছারওয়ার উল্লাহ রহমানী এই প্রেক্ষাপটে অত্যন্ত আফসোস প্রকাশ করে বলেন, ইসলামপন্থী ও সমমনা দলগুলোর মধ্যে যে ঐতিহাসিক ঐক্য গড়ে উঠেছিল, খেলাফত মজলিসের বেরিয়ে যাওয়ার মাধ্যমে তাতে একটি বড় ফাটল সৃষ্টি হলো।  সাধারণ মানুষ ও মাঠপর্যায়ের কর্মীরা ইসলামপন্থী দলগুলোর কাছ থেকে একটি মজবুত ঐক্য আশা করেছিল।  ছোটখাটো মতপার্থক্য ভুলে গিয়ে জোটবদ্ধ থাকাটাই ছিল সময়ের দাবি।  কিন্তু এভাবে জোট ভেঙে গেলে মাঠপর্যায়ের কর্মীদের মধ্যে এক ধরনের চরম রাজনৈতিক হতাশা সৃষ্টি হয়, যা শেষ পর্যন্ত বিরোধী শিবিরকেই রাজনৈতিক সুযোগ করে দেবে।

অনুসন্ধানে জানা যায়, জোটের মূল দ্বন্দ্ব শুরু হয়েছিল কিছুদিন আগেই।  বিশেষ করে আগামী জাতীয় নির্বাচনে আসন ভাগাভাগি এবং নির্দিষ্ট কিছু প্রভাবশালী নির্বাচনী এলাকায় দলগুলোর একক দাবিকে কেন্দ্র করে অভ্যন্তরীণ টানাপোড়েন চরম আকার ধারণ করে।  খেলাফত মজলিসের দাবি ছিল, যেসব আসনে তাদের শক্ত সাংগঠনিক ভিত্তি ও জনসমর্থন রয়েছে, সেগুলোতে জোটের পক্ষ থেকে ছাড় দিতে হবে। কিন্তু জোটের অপেক্ষাকৃত বড় দলগুলো নিজস্ব প্রার্থী দেওয়ার বিষয়ে অনড় অবস্থান গ্রহণ করায় ক্ষোভ পুঞ্জীভূত হতে থাকে।  

এর পাশাপাশি রাজনৈতিক কৌশল ও কর্মসূচি নির্ধারণে বড় দলগুলোর আধিপত্য তৈরি করার প্রবণতা ছিল চোখে পড়ার মতো।  খেলাফত মজলিস দীর্ঘদিন ধরে অভিযোগ করে আসছিল, সিদ্ধান্ত গ্রহণের বৈঠকগুলোতে আলোচনার সুযোগ দেওয়া হলেও চূড়ান্ত পর্যায়ে সিদ্ধান্ত চাপিয়ে দেওয়া হতো। মাঠপর্যায়েও ১১টি দলের নেতা-কর্মীদের মধ্যে কোনো কার্যকর যৌথ কাঠামো বা সমন্বয় গড়ে ওঠেনি।  ফলে তৃণমূলের নেতা-কর্মীদের পক্ষ থেকেও জোট ছেড়ে নিজস্ব প্রতীকে নির্বাচন করার জন্য কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের ওপর তীব্র মনস্তাত্ত্বিক চাপ সৃষ্টি হতে থাকে।

খেলাফত মজলিসের এই প্রস্থান সামগ্রিকভাবে ১১ দলীয় জোটের সাংগঠনিক ও মনস্তাত্ত্বিক শক্তিতে বড় ধরনের ক্ষয় সাধন করেছে। রাজপথে আন্দোলন গড়ে তোলা কিংবা নির্বাচনী মাঠে প্রভাব ফেলার ক্ষেত্রে খেলাফত মজলিসের সুসংগঠিত ক্যাডারভিত্তিক নেটওয়ার্ক এবং সুনির্দিষ্ট ভোটব্যাংক জোটের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি হাতিয়ার ছিল।  দলটির চলে যাওয়ায় এখন ১০ দলে পরিণত হওয়া জোটটিকে নতুন করে নিজেদের ঐক্য ও শক্তি প্রমাণের চ্যালেঞ্জে পড়তে হবে। 

একই সাথে জোটে থেকে যাওয়া অন্য ছোট দলগুলোর মধ্যেও এখন নিজস্ব অবস্থান নিয়ে কিছুটা শঙ্কা ও অনিশ্চয়তা তৈরি হতে পারে।  এই ঘটনা প্রমাণ করে, নীতিগত মিলের কথা বলা হলেও রাজনৈতিক হিসাব-নিকাশ, নেতৃত্বের প্রতিযোগিতা ও আসনকেন্দ্রিক ক্ষমতার দ্বন্দ্বের কাছে দিনশেষে নির্বাচনী জোটের স্থায়িত্ব কতটা ভঙ্গুর হয়ে পড়ে।  আগামী দিনে খেলাফত মজলিস এককভাবে তাদের রাজনৈতিক তৎপরতা কীভাবে এগিয়ে নেয় এবং অবশিষ্ট দলগুলো তাদের জোটকে টিকিয়ে রাখতে কী নতুন কৌশল গ্রহণ করে, তার ওপরই নির্ভর করছে রাজপথের রাজনীতির পরবর্তী নতুন গতিপথ।

ডেইলি-বাংলাদেশ/কে কে
লিংক সফলভাবে কপি হয়েছে!