Alexa সূরা বাকারা: ১-১৯ নম্বর আয়াত নাজিলের প্রেক্ষাপট ও ফজিলত 

ঢাকা, সোমবার   ০৯ ডিসেম্বর ২০১৯,   অগ্রহায়ণ ২৪ ১৪২৬,   ১১ রবিউস সানি ১৪৪১

সূরা বাকারা: ১-১৯ নম্বর আয়াত নাজিলের প্রেক্ষাপট ও ফজিলত 

পর্ব-১

মাওলানা ওমর ফারু ডেইলি-বাংলাদেশ ডটকম

 প্রকাশিত: ২০:০৪ ২০ নভেম্বর ২০১৯   আপডেট: ১৮:৪৯ ২৩ নভেম্বর ২০১৯

ফাইল ফটো

ফাইল ফটো

সূরা বাকারার ১-১৯ নম্বর আয়াত নাজিলের প্রেক্ষাপট ও ফজিলত। 

আমরা এখানে সূরা বাকারার ১-১৯ নাম্বার আয়াতসমূহের উল্লেখযোগ্য শানে নুযুল তুলে ধরছি-

ফজিলত: এ সূরার আয়াত সংখ্যা ২৮৬। এ সূরা বহু আহকাম সম্বলিত সবচেয়ে বড় সূরা। নবী করিম (সা.) এরশাদ করেছেন যে, সূরা বাকারা পাঠ কর। কেননা এর পাঠে বরকত লাভ হয় এবং পাঠ না করা অনুতাপ ও দুর্ভাগ্যের কারণ। যে ব্যক্তি এ সূরা পাঠ করে তার ওপর কোনো আহলে বাতিল তথা যাদুকরের যাদু কখনো প্রভাব করতে পারবে না।

নবী করিম (সা.) এ সূরাকে سنام القران সেনামূল কোরআন ও ذروة القران মারওয়াতুল কোরআন বলে উল্লেখ করেছেন। সেনাম ও মারওয়াহ বস্তুর উৎকৃষ্টতম অংশকে বলা হয়। সূরায়ে বাকারায় আয়াতুল কুরসী নামে যে আয়াতখানা রয়েছে তা কোরআন শরিফের অন্যান্য সকল আয়াতে থেকে উত্তম।
 
হজরত ইবনে মাসউদ (রা.) বলেছেন যে, এ সূরায় এমন দশটি আয়াত রয়েছে, কোনো ব্যক্তি যদি সে আয়াতগুলো রাতে নিয়মিত পাঠ করে তবে শয়তান সে ঘরে প্রবেশ করতে পারবে না এবং সে রাতের সকল বালা মুসিবত রোগ শোক ও দুশ্চিন্তা ও দুর্ভাবনা থেকে নিরাপদ থাকবে। তিনি আরো বলেছেন, যদি বিকৃত মস্তিস্ক লোকের ওপর এ দশটি আয়াত পাঠ করে দম করা হয়, তবে সে ব্যক্তি সুস্থতা লাভ করবে। আয়াত দশটি হচ্ছে সূরার প্রথম চার আয়াত, মধ্যের তিনটি অর্থাৎ আয়াতুল কুরসী ও তার পরের ২ টি এবং শেষের ৩ টি আয়াত।

আহকাম ও মাসায়েল: বিষয়বস্তু ও মাসায়েলের দিক দিয়েও সূরা বাকারাহ সমগ্র কোরআনে অন্যান্য বৈশিষ্ট ও মর্যাদার অধিকারী। এ সূরায় এক হাজার আদেশ, এক হাজার নিষেধ, এক হাজার হেকমত এবং এক হাজার সংবাদও কাহিনী রয়েছে।
(তাফসীরে মারেফুল কোরআন-১১)।

আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত। রাসূল (সা.) বলেন, তোমরা তোমাদের ঘর সমূহ কবরস্থানে পরিণত করো না। যে ঘরে সূরা আল বাকারা পাঠ করা হয় তাতে শয়তান প্রবেশ করে না। (তিরমিযি-১১৫)।

আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূল (সা.) বলেছেন, প্রতিটি বস্তুরই চূড়া আছে। কোরআনের উঁচু চূড়া হলো সূরা আল বাকারা। এতে এমন একটি আয়াত আছে যা কোরআনের আয়াতসমূহের প্রধান। তা হলো আয়াতুল কুরসী। (তিরমিযি-১১৫)। 

আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন যে ব্যক্তি সকাল বেলা সূরা আল মুমিন এর হা মী ম থেকে ইলাইহিল মাসীর (১, ২, ৩ নম্বর আয়াত) পর্যন্ত এবং আয়াতুল কুরসী তেলাওয়াত করবে সে এর উসীলায় সন্ধ্যা পর্যন্ত আল্লাহর হেফাজতে থাকবে। আর যে ব্যক্তি সন্ধ্যায় তা তেলাওয়াত করবে সে এর উসীলায় সকাল পর্যন্ত হেফাজত থাকবে। 

আবু আইউব আনসারী (রা.) থেকে বর্ণিত, তার একটি তাক ছিল তাতে তিনি শুকনো খেজুর রাখতেন। কিন্তু শয়তান জিন এসে রাতে নিয়ে যেত। তিনি নবী (সা.) এর কাছে এ বিষয়ে অভিযোগ জানালেন। তিনি বলেন, যাও, এটিকে যখন দেখবে বলবে বিসমিল্লাহ রাসূল (সা.) তোমাকে ডেকেছেন, চল। রাবী বলেন, আবু আইয়ূব (রা.) এটিকে পাকড়াও করলেন। এটি তখন কসম করল যে, পুনরায় তা করবে না। ফলে তিনি এটিকে ছেড়ে দিলেন। অনন্তর তিনি নবী (সা.) এর কাছে এলেন। তিনি বলেন, তোমার বন্দী কি করলে? আবু আইয়ূব (রা.) বলেন, কসম করে বলল যে, পুনরায় তা করবে না। তিনি (সা.) বললেন, সে মিথ্যা বলেছে। আর তার অভ্যাসই হলো মিথ্যা বলা। রাবী বলেন, আবু আইয়ূব (রা.) সেটিকে আরেকবার পাকড়াও করলেন। এবারো সে কসম করল যে, পুনরায় আর আসবে না। তিনি এটিকে ছেড়ে দিলেন। 

অনন্তর নবী (সা.) এর কাছে এলেন। তিনি বলেন, তোমার বন্দী কি কর্ম করল? আবু আইয়ূব বললেন, কসম করেছে সে আর করবে না। তিনি বলেন, মিথ্যা বলেছে তার অভ্যাসই হলো মিথ্যা বলা। পরে আবু আইয়ূব (রা.) তাকে আবার পাকড়াও করলেন। বললেন, এবার তোমাকে নবী (সা.) এর নিকট না নিয়ে আর ছাড়বো না। সে বলল, আমি আপনাকে একটি বিষয় স্মরণ করিয়ে দিচ্ছি। তাহল আপনি আপনার ঘরে আয়াতুল কুরসী পড়বেন। তাহলে আপনার কাছে শয়তান বা অনিষ্টকর অন্য কিছু আসতে পারবে না। অনন্তর তিনি নবী (সা.) এর কাছে এলেন, তিনি বলেন তোমার বন্দী কি করলে? আবু আইয়ূব (রা.) সে যা বলেছিল সে সম্পর্কে তাকে জানালেন। তিনি বললেন, এবার সত্য বলেছে। যদিও সে মিথ্যাবাদী। 

আবু মাসউদ আনসারী (রা.) থেকে বর্ণিত তিনি বলেন, রাসূল (সা.) বলেন, যে ব্যক্তি রাত্রে সূরা বাকারার শেষ দুই আয়াত পাঠ করবে তা সে ব্যক্তির জন্য যথেষ্ঠ হয়ে যাবে। মুহাম্মাদ ইবনে বাশশার (র.) নুমান ইবনে বাশীর (রা.) থেকে বর্ণনা করেন, যে নবী (সা.) বলেন, আকাশ ও পৃথিবী সৃষ্টির হাজার বছর পূর্বেই আল্লাহ তায়ালা একটি কিতাব লিপিবদ্ধ করেছেন এর থেকে তিনি দু’টি আয়াত নাজিল করেছেন। যে দু’টির মাধ্যমেই তিনি সূরা বাকারা খতম করেছেন। যে বাড়িতে তা পাঠ করা হবে শয়তান সে বাড়ির নিকটবর্তী হয় না। (তিরমিযি-১৬)।

আয়াত নাজিলের প্রেক্ষাপট:

الم.ذَلِكَ الْكِتَابُ لاَ رَيْبَ فِيهِ هُدًى لِّلْمُتَّقِينَ

অর্থ: এ সেই কিতাব যাতে কোনো সন্দেহ নেই। পথ প্রদর্শনকারী পরহেজগারদের জন্য। (আয়াত-১)।

শানে নুযুল : এটি মালেক ইবনে ছায়েফ ইহুদীর ব্যাপারে নাজিল হয়েছে। মুসলমানদের অন্তরে সন্দেহ ঢালার জন্য এ বলে বেড়াতে লাগল, এই কোরআন ওই কিতাব নয় যার সুসংবাদ পূর্ববর্তী কিতাবে দেয়া হয়েছে। তাই আল্লাহ তায়ালা প্রথম আয়াত দ্বারা সন্দেহ দূর করেন। অতঃপর চার আয়াত মোমিনের প্রসংশায় এবং তার পরের দু’আয়াত কাফেরদের বিরুদ্ধে তারপর ১৩ নম্বর আয়াত মুনাফিকদের বিরুদ্ধে নাজিল করেন। 

إِنَّ الَّذِينَ كَفَرُواْ سَوَاءٌ عَلَيْهِمْ أَأَنذَرْتَهُمْ أَمْ لَمْ تُنذِرْهُمْ لاَ يُؤْمِنُونَ

অনুবাদ: নিশ্চিয় যারা কাফের হয়েছে, তাদেরকে আপনি ভয় প্রদর্শন করুন আর নাই করুন তাতে কিছুই আসে যায় না, তারা ঈমান আনবে না। (আয়াত-৬)।

শানে নুযুল: এই আয়াতটি আবু জেহেল, আবু লাহাব, উতবা, শাইবা, এ ধরণের নির্দিষ্ট কিছু কাফেরের ব্যাপারে নাজিল হয়েছে। যাদের ব্যাপারে আল্লাহর ইলম ছিল যে, তারা কুফুরি অবস্থায় মৃত্যুবরণ করবে। তারা কখনো ইসলাম গ্রহণ করবে না, সবার ব্যাপারে নয়। কারণ, এ কথা তো দিবালোকের ন্যায় স্পষ্ট যে, এই আয়াত নাজিল হওয়ার পরেও অনেক কাফের মুসলমান হয়েছে ভবিষ্যতেও হবে। ইনশাআলাহ! 

وَمِنَ النَّاسِ مَن يَقُولُ آمَنَّا بِاللهِ وَبِالْيَوْمِ الآخِرِ

অর্থ: আর মানুষের মধ্যে এমন কিছু লোক রয়েছে যারা বলে আমরা আল্লাহ ও পরকালের প্রতি ঈমান এনেছি। অথচ আদৌ তারা ঈমানদার নয়। (আয়াত : ৮)।

শানে নুযুল: হজরত আলী (রা.) থেকে বর্ণিত আছে, তিনি একবার মুনাফেক নেতা আব্দুলাহ ইবনে উবাই ইবনে সালুল মুতাজির ইবনে কুশাইরকে লক্ষ করে বলেন, আল্লাহকে ভয় কর, নেফাক ছেড়ে দাও। ওপরে একরকম ভেতরে অন্য রকম থাকা উচিৎ নয়। তখন তারা বলল, আশ্চর্য তো আপনি আমাদের মুসলমানদেরকে কাফের বলেছেন? তাদের এই দাবীর পরিপ্রেক্ষিতে আল্লাহ তায়ালা ওপরের আয়াত নাজিল করেন।

وَإِذَا لَقُواْ الَّذِينَ آمَنُواْ قَالُواْ آمَنَّا وَإِذَا خَلَوْاْ إِلَى

অর্থ: আর তারা যখন (ঈমানদরদের) সঙ্গে মিশে, তখন বলে, আমরা ঈমান এনেছি। আবার যখন তারা শয়তানদের সঙ্গে একান্তে সাক্ষাৎ করে তখন বলে আমরা তোমাদের সঙ্গে রয়েছি। আমরা তো (মুসলমানদের সঙ্গে) উপহাস করি মাত্র। (আয়াত-১৪)।

শানে নুযুল: হজরত আব্দুলাহ ইবনে আব্বাস (রা.) বলেন যে, আব্দুলাহ ইবনে উবাই ইবনে সুলুল এবং তার অনুচরদের ব্যাপারে এই আয়াতটি নাজিল হয়েছে। ঘটনাটি হলো এই যে, এক জায়গায় হজরত ওমর ও হজরত আলী (রা.) দাঁড়িয়ে আছেন। তখন সে তার অনুচরদেরকে বলল, দেখ আমি তাদের সঙ্গে কীভাবে মজা করি। সে প্রত্যেকের হাত ধরে আলাদা আলাদা প্রসংশা করল। পরে সে তার সাথিদের বলল, দেখলে কীভাবে মজা করলাম? মুসলমানরদেরকে দেখলে তোমরাও এরুপ মজা করবে। পরবর্তীতে সাহাবায়ে কেরাম হুজুর (সা.)-কে এ ঘটনাটি জানালেন। তখন উক্ত আয়াত নাজিল হয়।

أَوْ كَصَيِّبٍ مِّنَ السَّمَاء فِيهِ ظُلُمَاتٌ وَرَعْدٌ وَبَرْقٌ يَجْعَلُونَ أَصْابِعَهُمْ فِي آذَانِهِم مِّنَ الصَّوَاعِقِ حَذَرَ الْمَوْتِ واللهُ مُحِيْطٌ بِالْكافِرِيْنَ.

অর্থ: অথবা (সেই মুনাফিকদের উদাহরণ এমন) যেমন আকাশের বর্ষণমুখর একখণ্ড মেঘ। যাতে আঁধার আছে, আছে বজ্রধ্বনি ও বিদ্যুৎ চমক। বজ্রধ্বনিতে মৃত্যু ভয়ে তারা তাদের কানে আঙ্গুল ঢোকায়। এবং আলাহ তায়ালা কাফেরদেরকে পরিবেষ্টন করে আছেন। (সূরা বাকরা-১৯)।

শানে নুযুল: মদিনা হতে দু’জন মুনাফিক পলায়ন করে মক্কার দিকে চলে যাচ্ছিল। পথিমধ্যে তারা প্রবল ঝড় বৃষ্টি, বজ্রপাত, বিদ্যুৎ চমকের সম্মুখীন হয়। চারদিকে যখন ভীষণ অন্ধকারে আচ্ছন্ন হয় তখন উভয়ই ভীত-সন্ত্রস্ত হয়ে উঠত। কিন্তু বিদ্যুৎ চমকাল তারা কিছুদুর অগ্রসর হত, আবার অন্ধকার হলে দাঁড়িয়ে যেত। বজ্রের ভীষণ গর্জনে মৃত্যুর ভয়ে কর্ণ- কুহরে অঙ্গুলি প্রবেশ করাত। অবশেষে ভীত হয়ে বলতে  লাগল, যদি সকাল হয় এবং মেঘমালা চলে যায়, তবে আমরা মুহাম্মাদ (সা.) এর দরবারে উপস্থিত হয়ে তাঁর অনুগত হয়ে যাব। কথামতো সকাল হতেই তারা হুজুর (সা.) এর দরবারে উপস্থিত হয়ে তাদের ঈমান নবায়ন করে নেয় এবং খাঁটি মুসলমান হয়ে যায়। তাদের সম্পর্কে উপরোক্ত আয়াত নাযিল হয়েছে। চলবে..

ডেইলি বাংলাদেশ/আরএজে