ঢাকা,  বুধবার   ০৪ নভেম্বর ২০২৬, ১৯ কার্তিক ১৪৩৩

[ খবর ]

চাইনিজ এসব উদ্ভাবনই বদলে দিয়েছে বিশ্বকে!

কানিছ সুলতানা কেয়া
প্রকাশিত: ১৭:২২, ১৬ এপ্রিল ২০২০
চাইনিজ এসব উদ্ভাবনই বদলে দিয়েছে বিশ্বকে!
ছবি: চীনের উদ্ভাবন

পৃথিবী তার সূচনালগ্ন থেকে ক্রমেই একটু করে বদলেছে। আদিকালে মানুষ তার কাজের সুবিধায় নানা জিনিস উদ্ভাবন করেছে। যা পৃথিবীকে সহজ থেকে করেছে সহজতর। আদিম যুগের সেই সব উদ্ভাবন থেকে আধুনিক যুগের নিত্য নতুন প্রযুক্তি, সবই মানব সভ্যতাকে দিয়েছে অন্য এক রূপ। 

আর এমন অনেক জিনিস রয়েছে যা উদ্ভাবিত না হলে আজকের দেখা পৃথিবী হয়তো এমন হত না। অনেক জাতি তাদের বিভিন্ন উদ্ভাবন দিয়ে বদলেছে বিশ্বকে। প্রাচীন সাম্রাজ্যগুলোর ইতিহাস ঘাঁটলে মধ্যপ্রাচ্য এবং ইউরোপীয়দের নাম প্রথমে উঠে আসে। তবে চীনারা এক্ষেত্রে একটু যেন এগিয়েই আছে। তাদের নানা উদ্ভাবন বিশ্বকে এনেছে হাতের মুঠোয়। জীবনকে করেছে সহজ থেকে সহজতর। 

যুগ যুগ ধরে চীনাদের একের পর এক উদ্ভাবন চমকে দিয়েছে বিশ্বকে। আবার আধুনিক বিশ্বের সামনে নিজেদেরকে সেরা হিসেবে তুলে ধরার বিষয়টি বিশ্বের অন্য দেশগুলোর কাছে অনুকরণীয়। চলুন তবে আজকে চীনাদের তেমনই কিছু অভাবনীয় উদ্ভাবনের কথা জেনে নেয়া যাক, যা বিশ্বকে একেবারেই নতুন রূপ দিয়েছিল। বলা যায় মানবজাতি সভ্যতার প্রথম ধাপ পার করেছিল তাদের এই উদ্ভাবনগুলো থেকেই।  

খ্রিস্টপূর্ব ২০৬ সালে লিউ ব্যাং নামে একজন সম্রাট হন। তিনি ছিলেন রাজ্যের সাধারণ একজন ব্যক্তি। সেখান থেকেই চীনে হান রাজবংশের শাসন শুরু হয়। একটানা ৪০০ বছর রাজত্ব করেন তারা। হান রাজবংশের রাজত্বকালে চীনে কৃষি থেকে শুরু করে চিকিৎসায় নানা অগ্রগতি দেখা যায়। 

মন্ট্রিয়ালের ম্যাকগিল বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস ও শাস্ত্রীয় স্টাডিজ বিভাগের অধ্যাপক রবিন ডিএস ইয়েটস বলেন, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির বড় বড় উদ্ভাবন ও উন্নয়ন ঘটেছিল প্রথম শতাব্দীতেই। যেগুলোর বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ বৈজ্ঞানিক উদ্ভাবন সংঘটিত হয়েছিল হান রাজবংশের শাসনামলে। 

যদিও সেগুলোর কিছু অন্যদের মাঝে সরাসরি পৌঁছেছিল, আবার কিছু কিছু অনেক পরে। তবে হান রাজবংশের আমলে আবিষ্কৃত গুরুত্বপূর্ণ অনেক জিনিস আমাদের আধুনিক সভ্যতায় ব্যাপকভাবে প্রভাব বিস্তার করে। অন্তত আমাদের জীবনে সেগুলোর ব্যবহার পর্যালোচনা করলে এর বাস্তব প্রমাণ পাওয়া যায়। 

কাগজ উদ্ভাবনকাগজ উদ্ভাবন

প্রাচীন চীনের চারটি বিশাল উদ্ভাবনের মধ্যে কাগজের উদ্ভাবনকে অন্যতম একটি বিবেচনা করা হয়। ১৯৫৭ সালে চীনের একটি প্রাচীন সমাধিতে পৃথিবীর ইতিহাসের সবচেয়ে পুরনো কাগজ পাওয়া যায়। শণের তন্তুর তৈরি ওই কাগজে ১৪০ থেকে ৮৭ খ্রিস্টপূর্বাব্দের তারিখ উল্লেখ ছিল। আর সে সময়টা ছিল হান রাজাদের শাসনকাল। হান রাজবংশে একজন খোজা ছিলেন চাই লুন। তিনিই প্রথম মণ্ড দিয়ে কাগজ প্রস্তুত করার পদ্ধতি উদ্ভাবন করেন। সেটা ছিল ২০০ খ্রিস্টপূর্বের আগে। 

শুরুতে শন গাছ কাগজ তৈরিতে ব্যবহার হলেও পরে গাছের বাকল, শন, লিনেন সুতা এবং মাছ ধরার জালের স্ক্র্যাপ ব্যবহার করা হত। সেসময় চীনে সিল্কের সাশ্রয়ী ও কার্যকর বিকল্প হিসেবে কাগজ ব্যবহার শুরু হয়। অধ্যাপক রবিন ডিএস ইয়েটস বলেন, সেসময় কাঠবাদামের খোসা এবং বাঁশ কাগজ তৈরিতে ব্যবহার করা হত। রাজবংশের পতনের পরে কাগজের প্রচলন চীন থেকে সারাবিশ্বে ছড়িয়ে পড়ে। মুসলিম বিশ্বের মাধ্যমে এবং ত্রয়োদশ শতাব্দীতে মধ্যযুগের ইউরোপে কাগজের উৎপাদন শুরু হয়।  

বিশ্বের প্রথম ঝুলন্ত সেতু ঝুলন্ত সেতু 

ঝুলন্ত বা সাসপেনশন সেতুর প্রথম আধুনিক ব্যবহার দেখা যায় ১৮ শতকের প্রথম দিকে। তবে হান রাজবংশের শাসনামলে এই সেতুর উদ্ভাবন। তারা প্রথম এটি তৈরি করেছিল একটি মন্দিরের সঙ্গে সংযোগ স্থাপন করতে। শুরুতে শুধু দড়ি দিয়ে তৈরি করা হলেও পরে সেতুর স্থায়ীত্ব বাড়াতে দড়ির সঙ্গে কাঠ ব্যবহার করা হয়। প্রথম সময়কার সাসপেনশন ব্রিজগুলো খাদ অতিক্রম করতে তৈরি করা হত। বর্তমানে বিশ্বের অনেক পাহাড়ি এলাকায় এমন সেতু ব্যবহারের দীর্ঘ ইতিহাস রয়েছে। 

ডিপ ড্রিলিং

ডিপ ড্রিলিং মেশিনহান রাজবংশের মন্দিরে পাওয়া বই অনুসারে, খ্রিস্টপূর্ব প্রথম শতাব্দীতে হান রাজবংশের লবণের খনিতে কাজ করার জন্য এর উদ্ভাবন। সেসময় সেখানকার শ্রমিকরা প্রথম এটি তৈরি করে। প্রায় চার হাজার ৮০০ ফুট গভীর গর্ত খুঁড়তে তারা লোহার ড্রিল বিট ব্যবহার করেছিলেন। এরপর তাদের এই কৌশল ব্যবহার করে আধুনিক তেল এবং গ্যাস অনুসন্ধানের সূচনা হয়। 

হুইলবারো 

হুইলবারো ইকনোলজি অ্যান্ড কালচার জার্নালের নিবন্ধ অনুসারে, চাকাতে হুইলবারো সম্ভবত ১০০ খ্রিস্টপূর্বের প্রথম দিকে বিকশিত হয়েছিল। 

সিসমোগ্রাফ যন্ত্র

পৃথিবীর গঠনগত কারণে প্রাকৃতিক দুর্যোগের মধ্যে শুধুমাত্র ভূমিকম্পেরই পূর্বাভাস পাওয়া অসম্ভব। তবে এর ক্ষয়ক্ষতি এবং মাত্রা সম্পর্কে জানার জন্য একটি যন্ত্র উদ্ভাবন করেছেন বিজ্ঞানীরা। সিসমোগ্রাফ নামক ওই যন্ত্রের সাহায্যে নির্দিষ্ট অঞ্চলের ভূকম্পন সম্পর্কে জানা যায়। বিজ্ঞানীদের মতে, পৃথিবীর সবচেয়ে বেশি ভূমিকম্প সংগঠিত হয় পূর্ব এশিয়ার চীন এবং জাপানে। 

সিসমোগ্রাফ যন্ত্রজানেন কি? এই সিসমোগ্রাফ যন্ত্রের ধারণাও কিন্তু এসেছে সেখান থেকেই। হান রাজবংশের শাসনামলেই এর উদ্ভাবন। বিখ্যাত জ্যোতির্বিদ, গণিতবিদ এবং ভূমিকম্প বিশেষজ্ঞ ঝাং হ্যাং এই যন্ত্র উদ্ভাবন করেন। তিনি ১৩২ খ্রিস্টাব্দে সর্বপ্রথম দূরবর্তী স্থানের ভূমিকম্প পরিমাপের যন্ত্রটি তৈরি করে হান আদালতে উপস্থাপন করেন। এই যন্ত্রের নকশা ছিল খুবই সহজ। একটি ধাতব কলসে দুলতে পারে এমন একটি স্বয়ংক্রিয় ব্যবস্থা ছিল। 

যখন কম্পন অনুভূত হতো তখন ধাতব কলসের উপরে স্থাপন করা ড্রাগনটি দুলতে দুলতে নিচের ধাতব ব্যাঙে পড়ত। এতে করে ঝনঝন আওয়াজ হতো এবং বোঝা যেতো কোথাও ভূমিকম্প হয়েছে। দুঃখের বিষয় হান আদালতে উপস্থাপনের সময় ঝাং হ্যাং এটি প্রমাণ করতে পারেননি। তবে উদ্ভাবনের কিছুকাল পর ৪০০ মাইল দূরের একটি গ্রামে ভূমিকম্প হওয়ার ঘটনা তিনি সম্রাটকে জানিয়েছিলেন। 

বিস্ফোরক চুল্লী

বিস্ফোরক চুল্লীআগুন উদ্ভাবনের ইতিহাস অনেক পুরনো। তবে বিস্ফোরক চুল্লীর ইতিহাস হানদের শাসনামলেই খুঁজে পেয়েছেন গবেষকরা। খ্রিস্টপূর্ব ২০০ সালের গোড়ার দিকে হান শাসনামলের প্রথম পর্যায়ে লোহা গলানোর জন্য আগুনের চুল্লী তৈরি করেন শ্রমিকরা। চীনা প্রযুক্তি বিষয়ক গবেষক ডোনাল্ট বি ওয়াগনার বলেন, মূলত লোহাকে নানা রকম আকার আকৃতি প্রদান করার জন্য এই চুল্লী তৈরি করেছিলেন তারা। চুল্লীতে প্রচুর বাতাস প্রবেশ করিয়ে সেখানে বিস্ফোরণ ঘটানো হত। এরপর লোহাকে গলিয়ে ঢালাই লোহা উৎপাদন করা হত।  

লাঙ্গল

লাঙলরবার্ট গ্রিনবার্গের বিখ্যাত বই 'দ্য টেকনোলজি অব অ্যানসিয়েন্ট চায়না' বইয়ে লাঙ্গলের উল্লেখ পাওয়া যায়। বইয়ের লেখা অনুযায়ী, চীনারা খ্রিস্টপূর্ব কয়েকশ বছর লোহার ফলাযুক্ত লাঙ্গল ব্যবহার করেছিল। যদিও পাহাড়ি ভূমিতে সেটি তেমন বেশি সহায়ক ভূমিকা পালন করত না। উল্টো পাহাড়ের মাটি ক্ষয় হতে শুরু করে। অতঃপর হান শাসনামলের কয়েকজন মেধাবী উদ্ভাবনক ছাঁচবোর্ডের লাঙ্গল উদ্ভাবন করেন। 

এই লাঙ্গলে শুধুমাত্র একটি ফলা ছিল। যা তীক্ষ্ণ বিন্দুতে শেষ হয়। যা দিয়ে খুব সহজেই জমি চাষ করা যেত। পশুর সাহায্যে এই ধরনের লাঙ্গল দিয়ে জমিতে চাষাবাদ করায় এটি ঘর্ষণ কমিয়ে মাটি ক্ষয় রোধ করতো। পাহাড়ের মাটিতে পানি জমিয়ে মাটি নরম করা অসম্ভব কাজ। তবে এই লাঙ্গল উদ্ভাবনের পর পাহাড়ে মাটি চাষ একেবারেই সহজ হয়ে যায়। মূলত হান সম্রাজ্যের সময় যতগুলো যুগান্তকারী উদ্ভাবন হয়েছে সেসবের মধ্যে ছাঁচবোর্ডের লাঙ্গল অন্যতম।

রেকাব

রেকাবের ব্যবহারপ্রাচীনকাল থেকেই মানুষের যোগাযোগ ব্যবস্থায় ঘোড়ার ব্যবহার অন্যতম। এছাড়াও বিভিন্ন সভ্যতার ইতিহাসের গতিপথও পাল্টে দিয়েছিল এটি। প্রথমে শুধু মানুষের যাতায়াতে এটি ব্যবহৃত হলেও একটা সময় এটি পণ্য আনা নেয়াতেও ব্যবহৃত হত। চীনের হান রাজবংশের শাসনামলেও দেশটির নাগরিকরা দুর্গম পাহাড়ে ঘোড়ায় চড়ে যাতায়াত করতেন। কারণ এক পাহাড় থেকে অন্য পাহাড়ে পায়ে হেঁটে চলাফেরা করা ছিল সময়সাপেক্ষ আর কষ্টকর।

হান রাজবংশের মন্দিরে পাওয়া বইয়ের তথ্য অনুসারে, মানুষ ঘোড়ায় বসার পর দুই পা রাখার জন্য যে রেকাব ব্যবহার করা হয় সেটি চীনাদের সৃষ্টি। তারা এটি লোহা এবং ব্রোঞ্জ দিয়ে তৈরি করেন। এটি উদ্ভাবনের পূর্বে ঘোড়ায় চড়লে মানুষের পা বেঁধে রাখতে হতো। হান শাসনামলের উদ্ভাবকদের রেকাব ঘোড়ায় যাতায়াতকে আরো সহজ করেছিল। বলা যায় হান রাজবংশের এটি একটি বিপ্লবী উদ্ভাবন।  

সূত্র: হিস্ট্রিডটকম

ডেইলি-বাংলাদেশ/জেএমএস
লিংক সফলভাবে কপি হয়েছে!