একশ’র বেশি বিয়ের ঘটক এ গাছ

ঢাকা, রোববার   ০৫ এপ্রিল ২০২০,   চৈত্র ২২ ১৪২৬,   ১১ শা'বান ১৪৪১

Akash

একশ’র বেশি বিয়ের ঘটক এ গাছ

ফাতেমা তুজ জোহরা সিজন ডেইলি-বাংলাদেশ ডটকম

 প্রকাশিত: ১৩:২২ ২০ ফেব্রুয়ারি ২০২০   আপডেট: ১৩:২৩ ২০ ফেব্রুয়ারি ২০২০

ছবি: সংগৃহীত

ছবি: সংগৃহীত

বেগুনি রঙের একটি খামে চিঠি এসেছে। একজন ডাকপিয়ন এলেন চিঠিটি নিয়ে। প্রায় তিন মিটারের কাঠের মই বেয়ে উপরে উঠলেন চিঠিটি ডাকে ফেলার জন্য। এতো উপরে ডাকবাক্স! ডাকবাক্সটি আসলে একটি ওক গাছ। আর তার কাছে প্রেরকের চাওয়া ‘ভালো একজন জীবনসঙ্গী’।

প্রায় পাঁচশ’ বছরের পুরনো এই ওক গাছটি একশ’র বেশি বিয়ের ঘটক।  ব্রাইডগ্রুম গাছ বা বর-বউ এই গাছটি প্রায় একশ’ বিয়ের ঘটকের দায়িত্ব পালন করেছে। অর্থাৎ চিঠিতে খুঁজে নিয়ে প্রিয়তম-প্রিয়তমা এরপর তাকে নিয়ে ঘর বাঁধা। যেমন বেগুনি খামটিতে ছিল ৫৫বছর বয়সী নারীর চিঠি। চিঠিটি এসেছে ব্যাভারিয়ার ডেনিস থেকে।

প্রাণোচ্ছল, প্রকৃতিপ্রেমী এক নারী বর্ষীয় এই গাছের কাছে খোঁজ চাচ্ছেন তার প্রিয় মানুষটির। আরেকজন প্রাণোচ্ছল প্রকৃতি প্রেমিকের। এভাবে বর্তমানে পুরো বিশ্ব থেকে এই গাছের নামে চিঠি আসে। জীবনসঙ্গী পাওয়ার আশায় এই খামগুলো এই বিশেষ ডাকবাক্সে আসে। আর এই একটি গাছকে ঘিরে জার্মানির উত্তরাঞ্চলের ডোডাউর বনের গভীরে (হামবার্গ থেকে উত্তর-পূর্বে) ডাকপিয়নের এমন পদচারণা।

বিবিসি-কে দেয়া এক সাক্ষাৎকারে ৭২ বছর বয়সী সেই ডাক পিয়ন কার্ল হেঞ্জ মার্টেন্স  বলেন, এই গাছকে ঘিরে মোহনীয়তা এবং রোমাঞ্চকর অনুভূতি কাজ করে। এই মার্টেন্স-ই হলেন সেই ডাকপিয়ন, যে ১৯৮৪সাল থেকে প্রায় ২০বছর ধরে চিঠিগুলো পৌঁছে দিচ্ছেন ঠিকানায়। 

‘ইন্টারনেটে প্রশ্ন-উত্তর, বিষয়াদি বিবেচনা করে মিলানো হয় কিন্তু গাছের ব্যাপারটি পুরোটাই কাকতালীয়- অনেকটা ভাগ্যের মত’, বলেন মার্টেন্স।

এমনকি তিনি নিজের জীবনসঙ্গীও বেছে নিয়েছেন এই গাছ ঘটকের কাছ থেকে।

অবসরে আছেন মার্টেন্স কিন্তু এখন পর্যন্ত তার কাছে ছবি, চিঠি এবং পত্রিকার বিভিন্ন অংশ সংরক্ষনের জন্য একটি স্ক্র্যাপবুক রয়েছে। তার সময় থেকে শুরু করে এখন পর্যন্ত ভালবাসার অফিসিয়াল বার্তাবাহকের ভূমিকা পালন করে আসছেন তিনি।

এরপর তিনি শোনাতে শুরু করলেন একটি সাধারণ গাছের ভালোবাসার ডাক বাক্স হয়ে ওঠার গল্প। তিনি জানান, ঘটনাটা আজ থেকে ১২৮ বছর আগের। সেখানেও ছিল একটি প্রেমিক যুগল আর এক ভিলেন। যার মধ্যস্থতায় জন্ম হয়েছিল অভিভূত এক ঠিকানার।

১৮৯০ সালে মিন্না নামের একটি মেয়ে উইলহেম নামের এক চকলেট কারিগরের প্রেমে পড়েন। মিন্না’র বাবা হয়ে উঠলেন সম্পর্কের ভিলেন। জারি করলেন নিষেধাজ্ঞা। তাতে কী? যিনি করবেন সংসার সেই কন্যা নিজেই যখন রাজি তখন তাকে রুখবে কে? উইলহেমের সাথে মিশতে নিষেধ করেছিলেন বাবা আর মেয়ে বেছে নিলেন বনের ভেতর এই ওক গাছের ঠিকানা।

হৃদয়ের চোখে ভাবুনতো, এই প্রেমিক যুগলের গোপনীয় কথোপকথনের একান্ত বাক বাক্স হয়ে উঠল প্রকৃতি। লুকিয়ে চলত চিঠি আদানপ্রদান। মিন্না তার কথাগুলো গুছিয়ে লিখে সুন্দর কোন খামে মুড়িয়ে তা রেখে আসতেন গাছটির গোপন কোঠরে। যা অন্য কারো চোখে পড়ার প্রশ্নই উঠতো না। আর তার ভিলেন বাবাতো কোন ছাড়।

সুবিধামতো সময়ে হাজির হতেন উইলহেম। হাতে পেতেন ভালোবাসার চিঠি। কখনো হয়তো কাঁপা হাতে গালে আলতো চেপে পেতে চাইতেন প্রেয়সীর বিশেষ ঘ্রান খানি। সেই গাছের গুড়িতে আলতো হেলে ঘাসের চাদরে পা ছড়িয়ে, পড়তে বসতেন ভালোবাসার কথামালাগুলো। এবার উত্তর দেয়ার পালা। নিজের একান্ত মানুষটির চিঠির প্রতিউত্তরের সঙ্গে নিশ্চই কখনো কখনো প্রেমিক পুরুষ মুড়িয়ে দিতেন রক্তলাল গোলাপের পাপড়ি কিছুও। যা নিজের বইয়ের ভাঁজে শুকিয়ে নিয়ে মিন্না রাখতেন প্রেমিকের আদর আর আবদার চির টাটকা।

একদিন হার মানলেন বাবা। প্রায় এক বছর পর মিন্না’র বাবা উইলহেমের হাতে তুলে দিতে দিলেন তার চূড়ান্ত সম্মতি। এরপর তারা বললেন দীর্ঘ এ বিরহের সময় তাদের যোগাযোগ ধরে রাখার গল্প। দেখা না হলেও কিভাবে এতদিন মনের একান্ত কষ্ট আর ভালোবাসাগুলো একে অপরের সঙ্গে ভাগাভাগি করে নিতেন।

১৮৯১ সালের ২ জুন সেই ওক গাছটির নিচে দাঁড়িয়েই বিয়ে করেন। পড়লেন সারা জীবন এক হয়ে থাকার শপথ।

রূপকথার গল্পের মতো এই কাহিনী চারপাশে ছড়িয়ে পড়ে। এরপর থেকে হতাশাগ্রস্তরা বার এবং বলরুম বাদ দিয়ে ভালবাসার চিঠি লেখা শুরু করে। চিঠির পরিমাণ এতোটাই বাড়তে থাকে যে জার্মান সরকার বাধ্য হয়েই ১৯২৭সালে গাছটির একটি নিজস্ব পোস্টকোড দেয়। এছাড়া সুবিধার্থে সেখানে একটি কাঠের মইয়ের ব্যবস্থাও করে।

যে কেউ চিঠি পড়তে পারবে তবে একমাত্র নিয়ম হল জবাব দিতে ইচ্ছুক না হলে চিঠিটি রেখে দিতে হবে সেই কোঠরে।

ডেইলি বাংলাদেশ/জেএস