অস্তিত্বের সন্ধানে, ‘মায়া’র বন্ধনে
সিনেমার পোকা বলতে যা বোঝায় আমি মোটেও অমন কেউ নই। বরং খুঁতখুঁতে স্বভাবের বলা যায়। যে সিনেমাগুলোর নাম-ডাক শোনা যায়; সেগুলো দেখি বেছে বেছে। নানা ব্যস্ততায় তারও অধিকাংশ দেখতে হয় ইউটিউবে। খুব কমই হলে গিয়ে দেখি। গেল বছর হাতে গোনা যে কয়টি সিনেমা হলে গিয়ে দেখিছি তার মধ্যে অন্যতম ‘মায়া- দ্য লস্ট মাদার’।
২০১৯ সালের শেষ মুক্তিপ্রাপ্ত সিনেমা এটি। সিনেমাটির প্রতি আগ্রহ জন্মেছিল প্রায় চার বছর আগে। যেদিন নির্মাতা কবি মাসুদ পথিক তার ফেসবুকে স্ট্যাটাস দিয়ে জানালেন, শিল্পী শাহাবুদ্দিন আহমেদের চিত্রকর্ম ‘ওমেন’ ও কবি কামাল চৌধুরীর কবিতা ‘যুদ্ধশিশু’ অবলম্বনে সিনেমাটি নির্মাণ করা হবে। সেদিন থেকেই মুখিয়ে ছিলাম সিনেমাটি দেখবো বলে।
খুব সম্ভবত বাংলাদেশে মাসুদ পথিকই প্রথম পরিচালক; যিনি কবিতা এবং চিত্রকর্ম থেকে সিনেমা বানালেন। তার প্রথম সিনেমাও ছিল কবি নির্মলেন্দু গুণের একটি কবিতা অবলম্বনে তৈরি। সেটা দিয়ে দক্ষতার পরিচয় দিয়েছেন মাসুদ পথিক। জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারসহ অর্জন করেছেন অনেক সম্মাননা। স্বাভাবিকভাবেই তার পরের সিনেমার প্রতি আলাদা একটা ভরসা থাকবেই। এছাড়া যে সিনেমায় ‘যুদ্ধশিশু’ ও ‘বিরাঙ্গনা’ বিষয় হিসেবে নেয়া হয়েছে তার প্রতি আগ্রহ খানিকটা বেশি থাকাই স্বাভাবিক।
.png)
সিনেমার নাম ভূমিকায় (মায়া) জ্যেতিকা জ্যোতি অভিনয় করলেও (যুদ্ধশিশু জব্বার) প্রাণ রায়ের চরিত্রটি ছিল একটু চ্যালেঞ্জিং! তার রূপদান করা জব্বার চরিত্রটি সাধারণ মানুষ থেকে একটু ব্যতিক্রম; সে প্রকৃতির ভাষা বোঝে। জীবের প্রতি তার মায়ার শেষ নেই। এজন্য সমাজ তাকে মানসিক বিকারগ্রস্ত হিসেবে চিহ্নিত করে দূরে রাখার চেষ্টা করে। যুদ্ধশিশু হওয়ায় সামাজিক বঞ্ছনাও সহ্য করতে হয়। যদিও অসীম সাহসী জব্বার তা সহ্য করে না।
অন্যদিকে জ্যেতিকা জ্যোতির রূপদান করা ‘মায়া’ চরিত্রটিও কম চ্যালেঞ্জিং নয়। সমাজে একজন ডিভোর্সি নারীকে যে কতটা যুদ্ধ করে টিকতে হয়; তা মায়া চরিত্রে ফুটে উঠেছে। সমাজের তথাকথিত উঁচুদের লোলুপ দৃষ্টি উপেক্ষা করে, কঠোর পরিশ্রমের মাধ্যমে ছেলে-মেয়ে, বৃদ্ধা মা আর আশ্রিত ‘পাগল’ এক যুদ্ধশিশুর খাওয়া-পরার যোগান দিতে হয় তাকেই। অন্যান্য সব চরিত্রই ছিল প্রশংসাযোগ্য। পরিচালক ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র অনেক বিষয় তুলে এনেছেন নিখুঁতভাবে। ওসব দিকে যাচ্ছি না। আমার দৃষ্টি এড়ায়নি- স্বাধীনতার এত বছর পরও মুক্তিযোদ্ধা স্বীকৃতিপ্রাপ্ত বিরাঙ্গনাদের হৃদয়ক্ষরণ।
‘সিনেমার গুরুত্বপূর্ণ অংশে কলকাতা থেকে ড. মানবি বোস (মুমতাজ সরকার) বাংলাদেশে গবেষণার কাজে আসেন একটি স্থানীয় এনজিও’র মাধ্যমে। তিনি যখন বিরাঙ্গনাদের কাছে যান গবেষণার প্রয়োজনে তখন কেউ-ই মুখ খুলতে চান না। বিরাঙ্গনা শব্দে আড়ষ্ট হন বীর মুক্তিযোদ্ধারা! যে সময়ে যুদ্ধ না করেও মুক্তিযোদ্ধা খেতাবের জন্য লাইন ধরছে পুরুষরা। সামনে আসছে ভুয়া মুক্তিযোদ্ধা; সেই সময়ে একজন বীরাঙ্গনা আসল মুক্তিযোদ্ধা হয়েও স্বীকার করতে সঙ্কোচবোধ করছে। নিজেকে আড়াল করতে চাচ্ছে। যার দায় সমাজ এড়াতে পারে না।’ উঠে এসেছে স্বাধীনতার এত বছর পরও স্থানীয় ক্ষমতা যুদ্ধাপরাধীদের হাতে রয়ে যাওয়ার মতো বিষয়। চেয়ারম্যান চরিত্রে অভিনয় করেছেন ঝুনা চৌধুরী। সিনেমাটিতে দেখানো হয়েছে- একাত্তরে ওই চেয়ারম্যানের ভূমিকা ছিল স্বাধীনতার বিপক্ষে। একজন যুদ্ধাপরাধীর হাতেই রয়ে গেছে ওই ইউনিয়নের শাসনক্ষমতা। ন্যায়-অন্যায়ের পরিমাপকও একজন যুদ্ধাপরাধীর হাতে।
সিনেমার শেষের দিকে এসে জানা যায়, কলকাতা থেকে গবেষণার কাজে আসা ড. মানবি বোস নিজেও একজন যুদ্ধশিশু। কলকাতার একটি পরিবারে বড় হয়েছেন। তাদেরই নিজের বাবা-মা জানতেন। তারা মারা যাওয়ার পর একটি চিঠির মাধ্যমে জানতে পারেন তার অত্মপরিচয়। নেমে পড়েন অস্তিত্বের সন্ধানে। এদেশে এসে কিছু মায়ার বন্ধনেও আটকে যান অবলিলায়।
তবে দর্শক আটকাতে পরিচালক আরেকটু সচেতন হতে পারতেন। মাঝে-মধ্যে দু’একটা দৃশ্য খাপ-ছাড়া মনে হয়েছে। এডিটিং আরো সুন্দর হতে পারতো। সাউন্ড, কালারেও ত্রুটি মনে হয়েছে। যদিও পরিচালক বললেন, ‘বলাকা’ সিনেমায় এমন হচ্ছে। অন্য সব হলে ঠিক আছে। সব মিলিয়ে সিনেমাটিকে সফল হিসেবেই বিবেচনা করছি।
একজন বীরাঙ্গনা এবং একজন যুদ্ধশিশুর প্রতি সমাজের অবহেলা এবং স্বাধীনতার পরও স্থানীয় ক্ষমতা যুদ্ধাপরাধীদের হাতে রয়ে যাওয়ার মতো বিষয়গুলো পরিচালক দক্ষতার সঙ্গে তুলে ধরতে সক্ষম হয়েছেন।