শিশু দাসত্বের ভয়াবহ চিত্র তুলে ধরলেন অ্যাবি ডেয়ার
দাসত্ব, কথাটা শুনলেই কেমন যেন একটা অনুভূতি সৃষ্টি হয় তাইনা? বিশ্বব্যাপী প্রায় লাখো মানুষ এই দাসত্ব প্রথার শিকার হয়। জানলে অবাক হবেন আজকের এই আধুনিক বিশ্বে এখনো প্রচলিত রয়েছে এই দাসত্ব প্রথা। আরো অবাক হবেন যখন জানবেন, এই দাসত্ব প্রথা থেকে রক্ষা পায়নি শিশুরাও। বিশ্বব্যাপী এই সমস্যার কথা নিয়ে এক গল্পের মাধ্যমে নিজ জীবনের কিছু অধ্যায় ভাগ করে নিয়েছেন লেখিকা অ্যাবি ডেয়ার।
অ্যাবির গল্পটা কিছুটা এরকম- আমার (অ্যাবির) মেয়ের বয়স যখন আট বছর, একদিন আমি তাকে আমাকে সাহায্য করার জন্য বললাম। সে তখন আমাকে বলল সামান্য এই কাজের বিনিময়ে আমার তাকে হারিবো (এক ধরণের ক্যান্ডি) কিনে দিতে হবে। আমি তাকে জিজ্ঞেস করলাম সে জানে কিনা, সে কতটা ভাগ্যবান যে তাকে বাড়ির কোনো কাজ করতে হয় না।
নাইজেরিয়ার বিভিন্ন বাড়িতে তার সমবয়সী মেয়েকে দিয়ে সারা দিনব্যাপী ঘরের সব কাজ করতে বাধ্য করা হয়। তাদের স্কুলে যাওয়ার অনুমতি দেয়না পরিবার। শুধু তাই নয়, সেসব মেয়েরা পরিবারের সঙ্গে এক টেবিলে বসে খেতে পারে না এবং একসঙ্গে বসে টিভিও দেখতে পারে না। কথাগুলো শুনে মেয়েটি বিস্মিত হয়ে গেল। তার মুখের দিকে তাকিয়ে বোঝা যাচ্ছিল যে বিষয়টি নাইজেরিয়ার হাজারো মেয়ের জন্য অতি সাধারণ, সেটি তার মেয়ের জন্য কতটা ভয়ংকর। এটি শিশু দাসত্ব ছিল, যা এখনো চলছে।
.png)
অ্যাবির প্রথম নভেল ‘দ্য গার্ল উইথ লাউডিং ভয়েস’- বইটি তিনি সেসব মেয়েকে উৎস্বর্গ করেছেন যারা গৃহস্থালি দাসত্বের শিকার ছিল এবং তারা সেসব কথা ভুলেও গেছে।
আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার (আইএলও) তথ্য অনুযায়ী, নাইজেরিয়ায় ১৪ বছরের কম বয়সী শ্রমজীবী শিশুদের সংখ্যা ১৫ মিলিয়নের বেশি বলে অনুমান করা হয়। তবে সমস্যার প্রকৃতির কারণে এর সঠিক সংখ্যায় অবতরণ প্রায় অসম্ভব।
এই শিশুদের একটি বড় অংশ হচ্ছে যুবতী মেয়েরা, যারা ‘ঘরের মেয়ে’ হিসেবে কাজ করে। গৃহকর্মী হিসেবে যারা কাজ করে তাদের প্রায়শই অপ্রাপ্তবয়স্ক এবং তাদের ইচ্ছের বিরুদ্ধে বাধ্য হয়ে এ জাতীয় কাজে নিযুক্ত হন তারা। এদের মধ্যে অনেকেই তাদের বেতন বা মজুরি কখনোই দেখেন না, কারণ তাদের মজুরি সরাসরি এজেন্ট বা তাদের পরিবারের সদস্যদের কাছে দেয়া হয়।
লেখিকা অ্যাবি ডেয়ার বলেন, আমি নাইজেরিয়ার লাগোস শহরে জন্ম নিয়েছি এবং সেখানেই বড় হয়েছি। আমি একটি চৌকস ও মধ্যবিত্ত পরিবেশে থাকতাম। আমাদের এলাকা কিছুই চাইতো না। আশেপাশে, একটি সুসজ্জিত একটি প্রাথমিক এবং একটি মাধ্যমিক স্কুল ছিল। কাঁচের জানালা এবং অতি আশ্চর্য সবুজ চারপাশ সম্পন্ন একটি চার্চ ছিল। এমন একটি সুপার মার্কেট ছিল যেখানে এতটা স্বাদযুক্ত ভ্যানিলা আইসক্রিম বিক্রি করা হত যা আমি কখনো অন্য কোথাও খাইনি। গাড়ির জন্য সুন্দর একটি পার্কিং এরিয়া ছিল। একটি স্থানীয় সমুদ্র সৈকত ছিল যেখান থেকে সেরা গ্রিলড মাংস কেনা যেত। আমাদের পরিবারের আশেপাশে থাকা পরিবারগুলোর মধ্যে বেশিরভাগই গৃহকর্মী নিয়োগ করেছিলেন, যাদের মধ্যে কিছু ক্ষেত্রে আট বছরের চেয়ে কম বয়সী মেয়ে ছিল।
ওই মেয়েগুলোর মধ্যে বিশেষভাবে আমার দু’জনের কথা মনে আছে। একজন আমার প্রতিবেশীর গৃহকর্মী মরিয়ম এবং আরেক প্রতিবেশীর গৃহকর্মী এডনা। একজন গৃহকর্মীকে চেনা খুব সহজ ছিল। তাদের মধ্যে বেশিরভাগেরই চুল ছিল না, ছিন্নভিন্ন, নোংরা পোশাক পড়া থাকতো। তারা সুসজ্জিত, স্নেহযুক্ত, সুন্দর ভাবে কথা বলতে পারা পরিবারের পেছনে দাঁড়িয়ে থাকতো।
গ্রীষ্মকালীন এক সময়ে মরিয়ম আমাদের এলাকায় আসে, তখন আমার বয়স ১৩ বছর। এগারো বছরের একটি ছোট মেয়ে ছিল সে। তার মাথায় চুল ছিল না। সে যখন প্রায়শই হেসে উঠতো তখন বাড়িটি তার হাসিতে কম্পনের সৃষ্টি করত। আমার কোনো বোন ছিল না তাই মরিয়মের মধ্যে আমি আমার বোনকে খুঁজে পেয়েছিলাম। তবে মরিয়ম আমার মত ছিল না। গ্রীষ্মকালে আমি বিনোদনের জায়গাগুলোতে ঘুরতে যেতাম, বন্ধুদের সঙ্গে তাদের বাড়িতে সময় কাটাতাম। কিন্তু মরিয়ম প্রতিদিন কাজ করত।
একজন মেয়ে হিসেবে, আমার চেয়েও অল্প বয়সী একটি মেয়েকে অক্লান্তভাবে রান্না করতে, পরিষ্কারের কাজ এবং অন্যান্য আরো কাজ করতে দেখেছি। যদিও সে আমার পরিবার দ্বারা নিযুক্ত ছিল না, তবুও সে আমার জামা কাপড় ধুয়ে দিত, আমার পরিচর্যা করত। আমি লাগোসের একটি অল গার্লস বোর্ডিং স্কুলে পড়তাম, কিন্তু মরিয়ম কোনো স্কুলে যেত না। সে ইউরুবা এবং ভাঙ্গা ভাঙ্গা ইংরেজীতে কথা বলত। সে খুব বুদ্ধিমতী এবং দীপ্তিমান ছিল। মরিয়ম যার কাছে কাজ করত সেই মালিক ফিরে না আসা পর্যন্ত আমরা একসঙ্গে খেলতাম।
এডনা মরিয়মের চেয়ে বয়সে বড় ছিল। তার বয়স হয়ত ১৯ অথবা ২০ ছিল। কাজের ফাঁকে এডনা এবং মরিয়ম সময় পেলেই ঘুরতে বের হত। মাঝে মাঝে কিছু সময় বের করে তারা সুপারমার্কেটে ঘুরতে যেত।
একদিনের ঘটনা মনে পড়ে আমার, গ্রীষ্মের শেষ সময়ে আমি একদিন বোর্ডিং স্কুল থেকে ফিরে দেখি মরিয়ম তার গৃহকর্তীর সামনে দাঁড়িয়ে আছে এবং তার চোখ থেকে পানি পড়ছে। সেটাই শেষ সময় ছিল যেদিন আমি ওকে দেখেছিলাম। প্রায় ছয় সপ্তাহ পর আমি যখন ফিরলাম ততদিনে মরিয়ম গায়েব হয়ে গিয়েছিল এবং এডনা মারা গিয়েছিল।
তাদের দু’জনের কি হয়েছিল সেটি নিএ অনেক গুজব ছড়ায়। শোনা যায়, গর্ভাবস্থা থেকে মুক্তি পেতে এডনা তার প্রাণ হারায়। কয়েক বছর পর এটাও শোনা যায় যে, এডনা হয়ত মারা যায়নি সে পালিয়ে গেছে। এটাও শোনা গেছে যে, এডনা আত্মহত্যা করেছিল। তবে মরিয়ম সম্পর্কে কিছুই জানা যায়নি। কেউ জানতো না যে মরিয়ম কোথায় গেছে। তবে লোকমুখে শোনা গেছে যে, ওর এক চাচা এসে ওকে নিয়ে গেছে কারণ ওকে অন্য বাড়িতে কাজের জন্য পাঠানো হবে। আবার এটাও শোনা গেছে যে, এডনা মারা যাওয়াতে মরিয়ম পালিয়ে গেছে। আমরা বিভিন্ন কথা শুনতাম তবে আসল ঘটনা কি সেটা কেউ জানতো না।
নাইজেরিয়ার অনেক কম বয়সী মেয়ে এভাবেই কাজ করতো। মরিয়ম এবং এডনা কোনো খোঁজ ছাড়াই গায়েব হয়ে গিয়েছিল। সেসময়ে আমি আমার এক বন্ধুকে হারিয়েছিলাম। এরপর থেকেই আমি ভেবে যাচ্ছি ওর আর এডনার আসলে কি হয়েছিল।
নাইজেরিয়াতে এরকম গৃহকর্মীদের নিজস্ব কোনো শক্তি নেই। তাদের নেই কোনো কণ্ঠস্বর। তাদের নীরবতায় তারা ভয়াবহ শারীরিক ও যৌন নির্যাতনের শিকার হত। এমন অনেক খবর পাওয়া গেছে যে, গৃহকর্মীদের নিয়মিত ধর্ষণ করা হত। তাদের অনাহারে রাখা হত, মারধর করা হত।
আমি চেয়েছিলাম পৃথিবী মরিয়ম এবং এডনার মত মেয়েদের জীবনকে বুঝুক। ঘরোয়া দাসত্ব একটি বড় ধরণের ব্যবসা। আইএলও’র ২০১৭ সালের একটি প্রতিবেদনে দেখা যায়, বিশ্বব্যাপী দাসত্ব ১৫০ বিলিয়ন ডলার বার্ষিক মুনাফা অর্জন করে। এদের মধ্যে বেশিরভাগ আফ্রিকা থেকে আসে। এই মেয়েদের নিয়োগকারীরা যুক্তি দেখান যে, তারা অর্থনীতির চাকাকে সচল রাখছে। একটি মেয়ে শিশুকে কাজ দেয়ার মাধ্যমে তারা তাকে খাওয়াচ্ছে। কেউ কেউ এই যুক্তি দেয় যে, তারা মেয়েদের রাস্তায় না গিয়ে ঘরে থেকে কাজ করার সুযোগ করে দিচ্ছে।
২০০৪ সালে, নাইজেরিয়ার সরকার সীমান্তের ওপারে মানুষের পাচার মোকাবিলা করতে নেপটিপ নামে একটি অ্যান্টি-ট্র্যাফিকিং এজেন্সি তৈরি করে। তবে এরপরেও সেটি এখনও অব্যাহত রয়েছে। গৃহকর্মী নিয়োগের জন্য ন্যূনতম বয়সের প্রয়োজনীয়তা সম্পর্কে পরিষ্কার তথ্যের অভাব রয়েছে।
আধুনিক সময়ের দাসও শুধুমাত্র নাইজেরিয়ার সমস্যা নয়, বরং বিশ্বব্যাপী। আমি দুই দশক ধরে লন্ডনে বসবাস করছি। আমি এমন এক শহরে কাজ করেছি যেখানে ২০১৩ সাল থেকে ২০১৮ সালের মধ্যে দাসত্বের শিকারের মানুষের সংখ্যা দশগুণ বেড়েছে। যুক্তরাজ্যের প্রায় এক লাখ ৩৬ হাজার মানুষ দাসত্ব করে জীবনযাপন করে। আধুনিক সময়ের স্লেভারি হেল্পলাইন নাম্বারে বছরে প্রায় সাত হাজারের বেশি কল পেয়েছে। ২০১৮ সালে বিশ্বব্যাপী প্রায় ৪০ মিলিয়ন মানুষ দাসত্বের ফাঁদে পড়ে। এই মোট সংখ্যার প্রায় ৭০ শতাংশ নারী এবং ২৫ শতাংশ শিশু। বিশ্বব্যাপী এই সমস্যাগুলো খুব তাড়াতাড়ি মোকাবিলা করা প্রয়োজন।
২০১৯ সালে নাইজেরিয়ার ‘সল্ট অ্যান্ড ট্রুথ’ নামের একটি টেলিভিশন প্রযোজনা সংস্থা ‘হাউস গার্লস’ নামে একটি আসন্ন তথ্যচিত্রের হৃদয় বিদারক একটি ট্রেইলার প্রকাশ করেছে। এই তথ্যচিত্রটিতে নাইজেরিয়ার বাড়িগুলোতে মেয়েদের অভিজ্ঞতা এবং নির্যাতনের কথা তুলে ধরা হয়েছে। লাখ লাখ মানুষ ট্রেইলারের এই ক্লিপটি দেখেছে এবং একে অন্যের সঙ্গে শেয়ার করেছে। দাসত্ব প্রথা এমন একটি সমস্যা যা জরুরিভাবে সমাধানের প্রয়োজন।
সূত্র- দ্য গার্ডিয়ান