খামারের নামে সওজের কোটি টাকার সম্পত্তি দখলের চেষ্টা!
পাবনার কাশীনাথপুরে (সাঁথিয়া, সুজানগর ও বেড়া উপজেলার সংযোগস্থল) মহাসড়কের পাশে সড়ক ও জনপথ (সওজ) বিভাগের ১৯ শতাংশ মূল্যবান সম্পত্তি ব্যক্তি নামে লিজ নেয়ার অপচেষ্টা চলছে বলে অভিযোগ উঠেছে।
এ সম্পত্তির বাজারমূল্য প্রায় ৬-৭ কোটি টাকা। এ সম্পত্তির বেশিরভাগ অংশ জনগণের চলাচলের রাস্তা হিসেবে ও কিছু অংশ ব্যস্ততম রাস্তার মোড়ের পানি নিষ্কাশনের জায়গা হিসেবে ব্যবহৃত হয়ে আসছে।
সওজ এর এই সম্পত্তি ভুলক্রমে এক নম্বর খাস খতিয়ানভুক্ত হয়ে যাওয়ায় সেটির সমাধানে আদালতে মামলা করেছে সওজ। তবে লিজ নেয়ার জন্য আগ্রহী ব্যক্তি মামলাটি তুলে নেয়ার জন্য জেলা অফিসে তদবির চালাচ্ছেন। তিনি সেখানে হাঁস-মুরগির খামার করতে চান বলে পাবনা ডিসির কাছে আবেদন করে রেখেছেন। তবে এটি ওই মহলের মূল্যবান জায়গাটি দখল করার একটা কৌশল ও ষড়যন্ত্র বলে স্থানীয় ব্যবসায়ীরা দাবি করেন।
.png)
তারা জানান, মামলা তুলে নিলে সওজ এই ৬-৭ কোটি টাকার সম্পত্তির মালিকানা হারাবে।
সরেজমিন পরিদর্শন ও অনুসন্ধানে জানা যায়, নগরবাড়ী বগুড়া এবং নগরবাড়ী- পাবনা মহাসড়ক এর মধ্যবর্তী অংশের ২৪ শতাংশ সম্পত্তি সওজ এর। যার এলএ কেস নম্বর ১৭/৫৮-৫৯। এ জমির বেশিরভাগ অংশ এখনো জন চলাচলে, মালামাল পরিবহনে ও মহাসড়কের পানি নিষ্কাশনে ব্যবহৃত হচ্ছে। চলতি বাজার দর অনুযায়ী এই জায়গার দাম কমপক্ষে ৬-৭ কোটি টাকা।
কাশীনাথপুরে সওজ এর ২৪ শতাংশ সম্পত্তির বিষয়ে খোঁজ নিয়ে জানা যায়, আর-এস রেকর্ডের সময় এ সম্পত্তির ১৯ শতাংশ ভুলক্রমে ১ নম্বর খাস খতিয়ানের অন্তর্ভুক্ত হয়ে যায়। ভুল নিষ্পত্তির জন্য এবং এই মূল্যবান সম্পত্তি ২ নম্বর খতিয়ানভুক্ত করে জমি পুনরুদ্ধারে ২০১১ সালে সওজ পাবনার ২য় যুগ্ম জজ আদালতে মামলা করে। এরপর আদালত ২০১১ সালের ২৮ নভেম্বর স্থিতাবস্থার আদেশ প্রদান করে।
মামলার নথিপত্র দেখে ও সরকারি সংশ্লিষ্ট অফিসের তদন্ত প্রতিবেদন দেখে কয়েকজন আইনজীবী জানান, মামলার মেরিট অনুযায়ী রায় সওজ এর অনুকূলে যাওয়ার সম্ভাবনা সবচেয়ে বেশি।
এ ব্যাপারে খোঁজ নিয়ে যায়, সাঁথিয়া উপজেলা ভূমি অফিস থেকে সহকারী কমিশনার (ভূমি) ২০১১ সালের ২২ ডিসেম্বর পাবনার অতিরিক্ত ডিসি (রাজস্ব)এর কাছে একটি প্রতিবেদন দাখিল করেন।
তাতে উল্লেখ করা হয়- ‘অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি বিভাগ সড়ক ও জনপথ বিভাগের প্রকৃত সম্পত্তি সরকারের নামে রেকর্ড হওয়া রেকর্ডীয় ভুল বলে প্রতীয়মান হয়।’
এছাড়া উল্লেখ করা হয় ‘ওই জমি আর এস রেকর্ডে সড়ক ও জনপথ বিভাগের নামে রেকর্ড হওয়ার কথা থাকলেও সড়ক ও জনপথ বিভাগের যথাযথ তদারকির অভাবে সরকারের এক নম্বর খাস খতিয়ানে অন্তর্ভুক্ত হয়।’
সে সময় সহকারী কমিশনার (ভূমি) তার চূড়ান্ত মতামতে উল্লেখ করেন ‘ইউনিয়ন ভূমি সহকারী কর্মকর্তার প্রতিবেদন দৃষ্টে দেখা যায় ‘নালিশি ভূমি ১৭/৫৮-৫৯ নম্বর এল.এ কেসের মাধ্যমে অধিগ্রহণ করা সম্পত্তি সড়ক ও জনপথ বিভাগপ্রাপ্ত হয় এবং ওই জমি সড়ক ও জনপথ বিভাগের নিয়ন্ত্রণে আছে, সেহেতু সড়ক ও জনপথ বিভাগের স্বার্থ নিহিত আছে বলে প্রতীয়মান হয়।’
এরপর পাবনা ডিসি ( রাজস্ব) ২০১৩ সালের ১৯ মার্চ ভূমি মন্ত্রণালয়ে এ সম্পত্তির ব্যাপারে একটি প্রতিবেদন দাখিল করেন। সেখানে বলা হয় ‘ওই মামলায় বিজ্ঞ আদালত ২০১১ সালের ২৮ নভেম্বর স্থিতাবস্থা বজায় রাখার জন্য সংশ্লিষ্ট সবাইকে নির্দেশ দেয়া হয়েছে। বিজ্ঞ আদালত ২০১৩ সালের ১২ মার্চ প্রদত্ত সংবাদ জানার জন্য দরখাস্ত দৃষ্টে দেখা যায় স্থিতাবস্থার আদেশ কার্যকর আছে।’
এদিকে ভূমি মন্ত্রণালয়ে পাবনা ডিসি ( রাজস্ব) অফিসের চিঠি মোতাবেক জানা যায়, সাঁথিয়া উপজেলার মরিচপুরান গ্রামের ওমর আলী মিয়ার ছেলে গোলাম মোস্তফা সওজ এর এই সম্পত্তি লিজ নিয়ে তার উপর হাঁস মুরগির খামার করতে চান।
সংশ্লিষ্ট সূত্র এবং স্থানীয়রা জানান, কয়েক বছর ধরে এই গোলাম মোস্তফা মূল্যবান এ সম্পত্তি দীর্ঘ মেয়াদে বন্দোবস্ত নিয়ে গ্রাস করার জোর চেষ্টা চালাচ্ছেন।
সহকারী কমিশনার ভূমি(সাঁথিয়া) এবং পাবনা ডিসি (রাজস্ব) অফিস তার বেআইনি আবেদন মঞ্জুর না করায় তিনি সওজ এর উপর চাপ দিচ্ছেন মামলাটি তুলে নেয়ার জন্য। কারণ সওজ মামলাটি তুলে নিলে সম্পত্তিটি সওজের হাতছাড়া হয়ে তা ১ নং খাস খতিয়ানে স্থায়ীভাবে চলে যাবে। এতে করে গোলাম মোস্তফা বা অন্য কারো নামে লিজ নেয়ার ক্ষেত্রে কোনো আইনি বাধা থাকবে না। তবে সওজ হারাবে ৬-৭ কোটি টাকার সম্পত্তি। আর জনগণ হারাবে চলাচলের পথ আর রাস্তার পানি নিষ্কাশনের জায়গা।
সওজ এর একটি সূত্র জানায়, সওজ এর এই জায়গাটুকু সড়ক বিভাগের ল্যান্ড অ্যাকুইজিশন এর ভেতরে রয়েছে। আবার মহাসড়ক যখন চার লেন করা হবে তখন সম্প্রসারণ কাজে এ জায়গার বেশিরভাগ প্রয়োজন হবে। এছাড়া কাশীনাথপুর মোড় এলাকার রাস্তায় জমা পানি এই জায়গা দিয়েই পাশের আত্রাই নদীতে নিষ্কাশিত হয়।
অপর একটি সূত্র জানান, একটি মহল অদৃশ্য সুতা টান দিয়ে সওজ নির্বাহী প্রকৌশলীকে মামলাটি তুলে নেয়ার জন্য চাপ দিচ্ছেন এবং তদবির
করছেন।
এ ব্যাপারে সওজ পাবনা’র নির্বাহী প্রকৌশলী সমীরণ রায় জানান, জমি জমা সম্বন্ধে তিনি খুব ভালো বোঝেন না। কাগজপত্র দেখা ছাড়া এই সম্পত্তির মামলার অবস্থা সম্বন্ধেও কিছু বলতে পারবেন না। তবে সওজের স্বার্থবিরোধী কোনো কাজ তিনি করবেন না। মামলা তুলে নেয়ার কোনো চেষ্টাও তিনি করছেন না। তিনি সওজের এই মূল্যবান সম্পত্তিটি তাদের হাতছাড়া হোক তা তিনি চান না ।
এছাড়া উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের অনুমতি ছাড়া তিনি মামলা তুলে নেয়ার সিদ্ধান্ত নিতে পারেন না। এমনকি মামলায় হেরে গেলেও বিধি মোতাবেক আপিল করা হবে।