বিদেশি পর্যটকদের ভিড় ‘আলপনা গ্রামে’
চাঁপাইনবাবগঞ্জের নাচোলের ছোট্ট গ্রাম টিকইল। এখানকার বেশির ভাগ ঘরই মাটির। কোনোটা একতলা, কোনোটা দোতলা। অধিকাংশ ঘরের দেয়ালে দেখা মেলে রঙের ছটা। গ্রামের প্রতিটি ঘরের দেয়াল যেন এক একটি ক্যানভাস। আর মানুষগুলো যেন এক একজন চিত্রশিল্পী। সে কারণে টিকইল নয়, ‘আলপনা গ্রাম’ নামেই দেশজুড়ে রয়েছে যার পরিচিতি।
তেভাগা আন্দোলনের অবিসংবাদিত নেত্রী ইলা মিত্রের স্মৃতিধন্য নাচোল উপজেলার নেজামপুর ইউনিয়নে গ্রামটির অবস্থান। হিন্দু-অধ্যুষিত এ গ্রামের প্রতিটি ঘরের দেয়ালে শোভা পায় হাতে আঁকা নানা আলপনা। এসব শিল্পকর্মের মূল কারিগর হচ্ছেন এ গ্রামের গৃহিণী আর মেয়েরা। বংশ পরম্পরায় বছরের পর বছর এ ঐতিহ্যকে টিকিয়ে রেখেছেন তারা।

নির্জন গ্রামটির প্রত্যেকটা মাটির বাড়ির দেয়ালে লেখা আছে অজস্র গল্প। কোনো কোনো গল্পের রং নীল, কোনটির-বা হলুদ। আবার কোনো কোনো দেয়ালের গল্পগুলো শুধু লাল আর সাদা। এই গল্পগুলো তাদের জীবনের কথা বলে, বলে তাদের ধর্মীয় উৎসবের কথা। তবে সবকিছু ছাপিয়ে মাটির বুকে সেঁটে থাকা এসব গল্পের পরিচয় এই গ্রামের সহজ-সরল মানুষের শৈল্পিক মন। চামড়া কুঁচকে যাওয়া যে হাত দুটো রোজ সংগ্রাম করে দারিদ্রতার সঙ্গে, সেই হাতই আবার রং-তুলি ধরতে জানে। জানে কোন রঙের পর কোন রং দিলে মাটির বুকে জেগে উঠবে তাদের জীবনের গল্প।
বাড়ির দেয়ালে আলপনা এই গ্রামে নতুন কিছু নয়। প্রায় ৩০ বছরেরও বেশি সময় ধরে হিন্দু বাড়িগুলোতে এই সংস্কৃতি চলে আসছে। তাই আল্পনায় স্থান পায় ধর্মীয় নানা চিহ্ন, কথামালা। একসময় বিভিন্ন তিথি-উৎসবে মাটির দেয়ালের পাশ দিয়ে তিনটি ফোঁটা দিয়ে নিচের দিকে সাদা রঙের আলপনা টেনে দেয়া হতো। এখন আর তিন ফোঁটার টান নয়, আঁকা হচ্ছে ফুল, পাখি, আকাশ, নদীসহ বাংলার চিরায়ত ছবি। এর কেউ চারুকলার শিক্ষার্থী নয়, নিজেদের সৃজনশীল প্রচেষ্টাকেই রঙিন হয়ে উঠেছে দেয়াল।

আলপনায় নিজেদের তৈরি রঙ ব্যবহার করেন তারা। এসব শিল্পকর্মের রঙয়ের উৎসও মাটি। একসময় গৃহিণীরা আলপনা আঁকতে গিরিমাটি, চক (খড়িমাটি), রং, তারপিন তেল ব্যবহার করতো। তবে ওইসব উপকরণে আঁকা আল্পনা বেশিদিন স্থায়ী হতো না। তাই বর্তমানে শুকনা বরই চুর্ণ আঠা, গিরিমাটি, আমের পুরাতন আঁটির শাঁস চুর্ণ, চকগুঁড়া, বিভিন্ন রং, মানকচু ও কলাগাছের কস দিয়ে তৈরি রংয়ের মিশ্রণ অন্তত ৪/৫ দিন ভিজিয়ে রেখে আলপনা আঁকা হয়। এ কারণে প্রায় এক বছরেরও বেশি সময় স্থায়ী হয় এসব আলপনা।
গ্রামের দাসু বর্মণের বাড়িতে রয়েছে একটি পরিদর্শন খাতা। সেখানে ঘুরতে আসা মানুষরা তাদের মন্তব্য লিখে যান। খাতা ঘেটে দেখা গেল, বিদেশী পর্যটকও এসেছেন এই গ্রামে। সুইজারল্যান্ডের এক আলোকচিত্রী লিখেছেন, ‘অসামান্য আতিথেয়তা, চমৎকার গ্রাম, বিস্ময়কর মানুষ, চমৎকার আলপনা।’ অস্ট্রেলিয়ার জিওনস নামের পর্যটক তাতে লিখেছেন, ‘এটা বাংলাদেশের সম্পদ। প্রচারের মাধ্যমে এই গ্রামটিকে আরো জনপ্রিয় করা সম্ভব।’

গ্রামের রাস্তা দিয়ে হাঁটলেই দেখা যায় লাগোয়া দেয়ালে রঙিন হয়ে আছে আবহমান বাংলার রূপ। মাটির বসতঘর, বৈঠক ঘর ও রান্নাঘরের ভিতরের-বাইরের দেয়ালে বিভিন্ন ধরনের ফুল, পশু-পাখি, শহীদ মিনার, জাতীয় স্মৃতিসৌধ এমনকি বিভিন্ন দেব-দেবীর ছবি এবং হিন্দুধর্মীয় শ্লোক দেখা গেছে।
টিকইল গ্রামের মৃত নরেশের স্ত্রী প্রভাতী বালা এখনো নিজ হাতে মনের মাধুরী মিশিয়ে ধর্মীয় শ্লোক ও আলপনা আঁকেন। তিনি বলেন, এতে যেমন বাড়িঘরে পবিত্রতা আসে ঠিক তেমনি পরিবারের সবার মনে বাড়িঘরে আনন্দ লাভের সুযোগ সৃষ্টি হয়। গ্রামের নারীরা আজও আলপনা আঁকার চর্চাটি ধরে রেখেছেন। আগামী প্রজন্মেও এর ধারা অব্যাহত রাখবে বলে তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন।
ডেইলি বাংলাদেশ/এনকে