সৌন্দর্যের লীলাভূমি দিনাজপুরের আশুরার বিল
সময়ের পরম্পরায় এগুলোকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে নৌ-কেন্দ্রিক পর্যটন ব্যবস্থা, যা সংশ্লিষ্ট এলাকার আর্থসামাজিক উন্নয়নে বিশাল ভূমিকা পালন করে আসছে। দিনাজপুরের আশুরার বিলও প্রকৃতির তেমনই একটি অপার দান, সৌন্দর্যের লীলাভূমি।
উত্তরবঙ্গের ‘অ্যামাজন’ খ্যাত দিনাজপুরের বিরামপুর ও নবাবগঞ্জ উপজেলার মধ্যবর্তী প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের লীলাভূমি আশুরার বিলকে ঘিরে এমনটাই স্বপ্ন দেখছে স্থানীয় প্রশাসন।
.png)

লাল-সাদা শাপলার অপূর্ব সৌন্দর্য্যে সেজেছে দিনাজপুরের আশুরার বিল। বিশাল শাল বাগানের মাঝে এ যেনো অপরূপ সৌন্দর্য্যরে লীলাভূমি। প্রকৃতিপ্রেমী দর্শনার্থীরা ছুটে যাচ্ছেন বিলে।
বিলটির মোট আয়তন ৮৫৭ একরেরও বেশি, যার প্রায় ৫৯০ একর পড়েছে নবাবগঞ্জ উপজেলার মধ্যে, বাকিটা বিরামপুর উপজেলায়। প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে ঘেরা আশুরার বিলকে নিয়ে রয়েছে নানান পৌরাণিক কাহিনী। কথিত কাহিনিগুলোর একটি হলো, অতি প্রাচীনকালে আধিপত্য বিস্তারে লড়াই শুরু হয় দেবতা এবং অসুরদের মধ্যে।
সেই লড়াইয়ে পরাজিত হয় অসুরেরা। দেবতাদের খঞ্জরের আঘাতে অসুরদের শরীর থেকে ঝরা রক্তে ভরে গিয়েছিল তাদেরই পায়ে দেবে যাওয়া গর্ত। অসুরদের সেই কাহিনী থেকে লোকমুখের মাধ্যমে ধীরে ধীরে এটির নাম হয়ে ওঠে আশুরার বিল।
শালবনের কোল ঘেঁষে গড়ে ওঠায় প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে ভরপুর আশুরার বিল হয়ে উঠেছে আরো বেশি মোহময়। উদ্ভিদ, বন্যপ্রাণী ও প্রকৃতি সংরক্ষণ এবং পর্যটন সুবিধাদির উন্নয়নের লক্ষ্যে সেই শালবনকে ২০১০ সালে জাতীয় উদ্যান হিসেবে ঘোষণা করেছে সরকার, যা স্থানীয়ভাবে শেখ রাসেল জাতীয় উদ্যান নামে পরিচিত। আগে এটি শুধু শালবন হিসেবে থাকলেও এখন সেখানে রয়েছে ২০-৩০ প্রজাতির গাছ।
আর ৫ কিলোমিটার দৈর্ঘ্যের সমগ্র উত্তরবঙ্গের বৃহত্তম বিল আশুরাতে রয়েছে দেশীয় প্রজাতির বিভিন্ন ধরনের মাছ। শাপলা আর পদ্মফুলের সমারোহে বিভিন্ন প্রজাতির পাখির কলতানে মায়াবী আবেদনে হাতছানি দিয়ে ডেকে যায় আশুরার বিল। ঐতিহ্যবাহী বিলটি এক সময় উত্তরাঞ্চলের ভ্রমণপিপাসুদের কাছে হয়ে ওঠে অন্যতম দর্শনীয় স্থান। কিন্তু অবৈধ দখলদারদের কারণে অচিরেই বিলটি হারাতে বসে তার ঐতিহ্য। স্থানীয় প্রভাবশালী কিছু মানুষের কাছে জিম্মি হয়ে পড়ে অপার সম্ভাবনার এই জলাশয়।
লাল-সাদা শাপলা ফুলে ছেয়ে গেছে দিনাজপুরের নবাবগঞ্জ জাতীয় উদ্যানের সংলগ্ন আশুরার বিল। দূর থেকে দেখে মনে হবে লাল ও সাদা চাদরে মোড়ানো একটি জলাশয়। যেন শিল্পীর নিপুণ হাতে অঙ্কিত স্থিরচিত্র। আর বিলের পানিতে প্রকৃতির এই অপরূপ সৌন্দর্য শাপলা ফুলের সমাহার উপভোগ করতে প্রতিনিয়ত আশুরার বিলে ভিড় করছেন প্রকৃতিপ্রেমীরা।
বিলটিতে পানি বৃদ্ধি পাওয়ায় পদ্ম আর শাপলা ফুটতে থাকে যেন প্রতিযোগিতা করে। বৃদ্ধি পেতে থাকে লাল খলশে, কাকিলা, ধেধলসহ বিভিন্ন প্রজাতির মাছ। দীর্ঘ দুই দশক পর শীতের ঠিকানা খুঁজে নিতে আবারো আশুরায় ছুটে আসতে থাকে বালিহাঁস, গিরিয়াহাঁস, শামুকখোল, হট্টিটি, সাদা মানিকজোড়, রাঙ্গামুডিসহ অন্যান্য প্রজাতির হাজার হাজার পরিযায়ী পাখি।
বাঁশের বেড়া আর মাচা দিয়ে শত ভাগে ভাগ করে ফেলে তারা। শীতে ধান চাষ করে তাতে কীটনাশক ব্যবহার করায় হারিয়ে যেতে থাকে দেশি প্রজাতির বহু মাছ। কচুরিপানা আর বিভিন্ন ধরনের আবর্জনায় জরাজীর্ণ রূপ নেয় আশুরা। সুষ্ঠু পরিকল্পনা আর সঠিক রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে একশ্রেণীর স্বার্থান্বেষী গোষ্ঠী বিলটিকে কৃষি জমি হিসেবে ব্যবহার শুরু করায় এর পানি কমতে থাকে আশঙ্কাজনকভাবে।
বিলের অধিকাংশ ভরাট হয়ে যাওয়ায় হারিয়ে যেতে থাকে এর সৌন্দর্য। অথচ আইনগতভাবে বিলের জমির শ্রেণি পরিবর্তনের সুযোগ নেই।
আশুরার বিলকে তিন দিক থেকে ঘিরে রেখেছে বাংলাদেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম শালবন। সংরক্ষিত এ বনের আয়তন ৫১৭ দশমিক ৬১ হেক্টর। শালবনের পশ্চিমে ৩৪৫ দশমিক ৯৫ একর জায়গা বিরামপুর উপজেলায়।
বাকিটা নবাবগঞ্জ উপজেলার অংশে। এখানে শালগাছ ছাড়াও রয়েছে সেগুন, গামার, কড়ই, বেত, বাঁশ ও জামসহ প্রায় ২০ থেকে ৩০ প্রজাতির বিচিত্র গাছ। বনের ভেতরে প্রায়ই দেখা মেলে বনবিড়াল, খেঁকশিয়াল, বেজি, সাপ ও নানান প্রজাতির পাখি।