সাবেক লঙ্কান ক্রিকেটারের প্রথম অ্যাসাইনমেন্ট ছিল ওয়েস্ট ইন্ডিজ সফর। ওয়ানডে ও টেস্ট সিরিজে টাইগাররা হোয়াইটওয়াশ হয়ে দেশে ফিরলেও তাতে কোচের দায় ছিল না। দলের ভেতরকার পরিস্থিতি বুঝেই সাজাচ্ছিলেন পরিকল্পনা। ঘরের মাঠে জিম্বাবুয়েকে ওয়ানডে ও টেস্টে ধবল ধোলাই করে জয়ের ধারাবাহিকতায় ফেরে লাল-সবুজের দল।
এরপর দুয়ারে চলে আসে ২০১৫ ওয়ানডে বিশ্বকাপ। মাত্র এক ওয়ানডে ম্যাচে খেলার অভিজ্ঞতা থাকা সৌম্য সরকারকে স্কোয়াডে রাখার ক্ষেত্রে রাখেন ভূমিকা। আসর শুরুর আগে ওয়ার্মআপ ম্যাচে পাকিস্তান ও আয়ারল্যান্ডের কাছে হেরে যাওয়ায় সমর্থকদের মাঝে জাগে শঙ্কা। যথারীতি গ্রুপপর্বেই বিদায়ের তিক্ত স্বাদ পাওয়ার সেই সন্দেহ অবশ্য টুর্নামেন্টের উদ্বোধনী ম্যাচেই উড়ে যায়।
.png)
আফগানিস্তান, স্কটল্যান্ডের বিপক্ষে জেতা লাল-সবুজের দল আশা জ্বালিয়ে রাখে। অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে বৃষ্টিতে ম্যাচ পণ্ড হওয়ায় পয়েন্ট ভাগাভাগি করে নেয়। শক্তিশালী ইংল্যান্ডকে হারিয়ে টিম টাইগার্স প্রথমবারের মতো কাটে কোয়ার্টার ফাইনালের টিকিট।
এরপর ঘরের মাঠে পাকিস্তান, ভারত ও দক্ষিণ আফ্রিকার বিপক্ষে ওয়ানডে সিরিজ জিতে নিজেদের শক্তিমত্তা জানান দেয় বাংলাদেশ। ২০১৬ সালে ইংল্যান্ডকে মাত্র তিন দিনেই মিরপুর টেস্টে হারিয়ে দিয়ে আলোড়ন তুলেছিল হাথুরুর শিষ্যরা। শ্রীলঙ্কার মাটিতে নিজেদের শততম টেস্ট জয়টাও ছিল বিশেষ অর্জন। ক্রিকেট পরাশক্তি অস্ট্রেলিয়াকেও দেশের মাটিতে হারিয়ে সাদা পোশাকের ক্রিকেটে উন্নতির ছাপ রাখতে থাকে বাংলাদেশ।
২০১৬ সালে টি-২০ বিশ্বকাপের পর হাথুরুসিংহেকে নিয়ে বিতর্কের সূচনা। ঐ বছর জুনে বিতর্কিত দ্বি-স্তরবিশিষ্ট দল নির্বাচন প্রক্রিয়া সেই সেই সময় আলোচনার ঝড় তুলেছিল। তাতে দল নির্বাচনে সর্বময় ক্ষমতার অধিকারী হয়ে ওঠেন হাথুরুসিংহে। প্রক্রিয়াটি প্রত্যাখ্যান করে পদত্যাগ করেছিলেন প্রধান নির্বাচকের দায়িত্বে থাকা সাবেক ক্রিকেটার ফারুল আহমেদ। ভাগ্যের কী লীলাখেলা, ঐ ঘটনার আট বছর পর ফারুক এখন নবনির্বাচিত বোর্ড সভাপতি। তার আমলেই বরখাস্ত হলেন হাথুরু।
শ্রীলংকা সফরের মাঝপথে আকস্মিকভাবে আন্তর্জাতিক টি-২০ থেকে অবসরে যান মাশরাফী বিন মোর্ত্তজা। এ ঘটনায় হাথুরুসিংহের সরাসরি ভূমিকা রাখার বিষয়টি ছিল ওপেন সিক্রেট। ২০১৭ সালের আলোচিত ঘটনার বছরেই চ্যাম্পিয়ন্স ট্রফির সেমিফাইনালে খেলার কীর্তি গড়ে টাইগাররা। এরপর দক্ষিণ আফ্রিকা সফরে তিন ফরম্যাটে হোয়াইটওয়াশের পর আকস্মিকভাবে লঙ্কান ম্যান হেড কোচের পদ থেকে ই-মেইলের মাধ্যমে ইস্তফা দেন। তার এমন সিদ্ধান্তে খোদ বিসিবিও ছিল বিস্মিত। মূলত নিজ দেশ শ্রীলংকার হেড কোচ হতেই চুক্তি শেষের আগে তিনি এমনটা করেছিলেন।
প্রথম মেয়াদে হাথুরুর অধীনে ২১ টেস্টে ৬ জয়, ১১ হার এবং ৪ ড্র পায় বাংলাদেশ। ওয়ানডেতে ফরম্যাটে সাফল্যের পাল্লাটা তুলনামূলক ভারি। ৫১ ম্যাচে ২৫ জয়, ২৩ হার এবং ৩টি পরিত্যক্ত হয়। টি-২০তে ২৯ ম্যাচে ১০ জয় এবং ১৯ হার ও ২টি ম্যাচ পরিত্যক্ত হয়।
সাবেক বিসিবি সভাপতি নাজমুল হাসান পাপনের উদ্যোগে ২০২৩ সালের জানুয়ারিতে হাথুরুসিংহে আবারো নিয়োগ পান। ৩৫ হাজার ডলারে তার সঙ্গে চুক্তি করা হয়েছিল বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডের পক্ষ থেকে। যে চুক্তির মেয়াদ ছিল ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত।
ক্রিকেটারদের মাঝে বিভাজন সৃষ্টির অভিযোগ তার বিরুদ্ধে ছিল। অনেকের ধারণা, সাকিব আল হাসান ও তামিম ইকবালের ভেতরকার দ্বন্দ্বটা নাকি উসকে তিনিই উসকে দিয়েছিলেন। হাথুরুর অধীনে বাংলাদেশ গত বছর ওয়ানডে বিশ্বকাপে অপ্রত্যাশিত বাজে পারফরম্যান্স করে। আফগানিস্তান ও শ্রীলংকার বিপক্ষে জিতলেও বাকি সাত ম্যাচ হেরে আসর থেকে বিদায় নেয়। অপেক্ষাকৃত দুর্বল দল নেদারল্যান্ডসের কাছে পরাজিত হওয়ার পর দেশব্যাপী ক্রিকেটার ও কোচিং স্টাফদের নিয়ে চলতে থাকে কঠোর সমালোচনা। বিশ্বকাপ চলাকালীন এক ক্রিকেটারকে শারীরিকভাবে লাঞ্চিত করার গুরুতর অভিযোগ আসার পর চলতে থাকে তোলপাড়। তবুও তাকে রেখে দেওয়ার সিদ্ধান্তে অটল ছিল বিসিবি।
দ্বিতীয় মেয়াদে তার অধীনে ৩৫ ওয়ানডে ম্যাচে ১৩টি জয়, হার ১৯টি, তিন ম্যাচে আসেনি ফল । টি-২০তে ৩৫ ম্যাচের ১৯টিতে জয় পায় বাংলাদেশ, হারে ১৫টিতে, একটি পরিত্যক্ত হয়।
১০টি টেস্টে পাঁচটিতে জয় এবং হার রয়েছে। পাকিস্তানের মাটিতে প্রথমবার ২-০ ব্যবধানে সিরিজ জয়ের কৃতিত্ব তিনি কোচ হিসেবে নিতে পারেন। তবে সবশেষ ভারত সফরে দুই টেস্টে চরমভাবে বিধ্বস্ত হয় বাংলাদেশ। তিন ম্যাচের টি-২০ সিরিজেও ব্যাটে-বলে ছিল সেই ধারাবাহিকতা। টিম ইন্ডিয়া টি-২০ ইতিহাসের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ ২৯৭ রানের সংগ্রহ গড়ে বাংলাদেশকে হোয়াইটওয়াশ করে।
হাথুরুসিংহের বিরুদ্ধে চুক্তির শর্ত ভঙ্গেরও অভিযোগ উঠেছিল। জানা গেছে, ৪৫ দিন ছুটির বিপরীতে প্রথম বছরে ৬৭ দিন এবং দ্বিতীয় বছরে তিনি ৫৯ দিন ছুটি কাটিয়েছেন। সব মিলিয়ে তার সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করেছে বিসিবি।
হাথুরুসিংহে যখন দ্বিতীয়বার বাংলাদেশের কোচ হন, তখন সেই চুক্তিতে ছিল একটি শর্ত। মেয়াদ শেষের আগে তাকে অব্যাহতি দেওয়া হলে দিতে হবে চুক্তির সময়কাল পর্যন্ত অবশিষ্ট বেতন ও জরিমানা। সেজন্য এবার সেজন্য কৌশলগত কারণে হাথুরুকে কারণ দর্শানোর নোটিশ দিয়েছে বিসিবি। তাকে নোটিশের উত্তর দিতে তাকে ৪৮ ঘণ্টা সময় বেঁধে দেওয়া হয়েছে।
ক্রিকেটারকে লাঞ্চিত করা এবং অনুমতি ছাড়া অতিরিক্ত ছুটি কাটানোর বিষয়ে তার কাছে চাওয়া হয়েছে উত্তর। অন্যথায়, চুক্তি অনুসারে প্রাপ্ত বাকি মাসগুলোর বেতন পাবেন না সাবেক এই লঙ্কান ক্রিকেটার।