ঢাকা,  শুক্রবার   ২৩ অক্টোবর ২০২৬, ৭ কার্তিক ১৪৩৩

[ খেলা ]
শুভ জন্মদিন হিথ

হিথ স্ট্রিক: জিম্বাবুয়ের সোনালি অর্জন কিংবা আক্ষেপ

আশরাফুল ইসলাম আকাশ
প্রকাশিত: ১৫:২৩, ১৬ মার্চ ২০২৪
হিথ স্ট্রিক: জিম্বাবুয়ের সোনালি অর্জন কিংবা আক্ষেপ
ছবি অলংকৃত- ডেইলি বাংলাদেশ

খেলোয়াড়ি জীবনে হেঁটেছেন গোলাপের পাপড়ি বিছানো পথে। ক্যারিয়ারের ঊর্ধ্বগগনে ছিলেন প্রতিপক্ষের ভয়ের কারণ। বল হাতে বিশ্বের নামীদামি তারকা ক্রিকেটারদের স্ট্যাম্প উপড়ে ফেলেছেন নিমিষেই। খেলোয়াড় হিসেবে কোনো প্রশ্ন না থাকলেও অধিনায়ক হিসেবে ছিলেন কিছুটা বিবর্ণ। যদিও কোচিং ক্যারিয়ারে বেশ সুনাম কুড়িয়েছেন। কিন্তু তার ক্রিকেট যুগের শেষটা ছিল অপ্রত্যাশিত সুনামির মতো!

বলছি জিম্বাবুয়ের সোনালি যুগের অন্যতম তারকা হিথ স্ট্রিকের কথা। যিনি গতির ঝড় তুলে ব্যাটারদের হৃদয়ে কাঁপুনি ধরিয়েছেন, তেমনি সময়ের প্রয়োজনে ব্যাট হাতে দারুণ স্মৃতির বাহক হয়েছেন। তাইতো দেশটির অন্যতম সেরা তারকাদের কাতারে জায়গা পেয়েছেন এই অলরাউন্ডার।

১৯৭৪ সালের আজকের এই দিনে (১৬ মার্চ) পৃথিবীর আলো দেখেন হিথ স্ট্রিক। হয়তো বেঁচে থাকলে আজ নিজের ৫০তম জন্মদিন পালন করতেন। কিন্তু প্রকৃতির চরম বাস্তবতা মেনে মরণব্যাধী ক্যান্সারের সঙ্গে যুদ্ধ শেষে পরপারে পাড়ি দিয়েছেন তিনি। গত বছরের ৩ সেপ্টেম্বর মৃত্যুবরণ করেন এই তারকা ক্রিকেটার ও কোচ।

ক্রিকেটের রাজকীয় সংস্করণ টেস্ট দিয়ে আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ার শুরু করেন হিথ স্ট্রিক। ছবি- ইএসপিএনহিথ স্ট্রিকের বাবা ডেনিস হিল্টন স্ট্রিক খেলেছেন রোডেশিয়ানদের হয়ে। আর ছেলে হিথ স্ট্রিক জিম্বাবুয়ের সোনালি সময়ের অভিযাত্রী। নব্বই দশকে তার নেতৃত্বেই গড়ে ওঠে জিম্বাবুয়ের পেস বোলিং আক্রমণ।

জাতীয় দলের জার্সিতে হিথ স্ট্রিকের স্বপ্নের যাত্রা শুরু হয় ১৯৯৩ সালে, করাচিতে। বছরের শেষ মাসে অর্থাৎ ডিসেম্বরে সাদা পোশাকের ক্রিকেটে পাকিস্তানের বিপক্ষে অভিষেক হয় তার। যদিও অভিষেকটা রাঙাতে পারেননি। তবে নিজের জাতটা চিনিয়েছিলেন ঠিক তার পরের ম্যাচেই। 

রাওয়ালপিন্ডিতে সিরিজের দ্বিতীয় টেস্টে দুই ইনিংস মিলিয়ে বল হাতে স্ট্রিকের শিকার ৮ উইকেট। কিন্তু তাতেও দলকে জয় উপহার দিতে পারেননি। তীরে গিয়ে তরী ডোবায় তারা। শেষ পর্যন্ত ৫২ রানে হারে জিম্বাবুয়ে।

হিথ স্ট্রিক মূলত বোলার হলেও লোয়ার মিডল অর্ডারে সময়ের প্রয়োজনে হয়ে উঠতেন দারুণ কার্যকরী। ছবি- ইএসপিএনঅভিষেক সিরিজ স্মরণীয় করতে না পারলেও জিম্বাবুয়ের প্রথম টেস্ট জয়ের সঙ্গে জড়িয়েছেন নিজের নাম। ১৯৯৫ সালে নিজেদের ইতিহাসে প্রথম টেস্ট জয়ের স্বাদ পায় জিম্বাবুয়ে। প্রতিপক্ষ সেই পাকিস্তানই। হারারেতে গড়ানো সেই ঐতিহাসিক টেস্টে ইনিংস ও ৬৪ রানে জেতে জিম্বাবুয়ে।

পাকিস্তানের বিপক্ষে অবিস্মরণীয় এই জয়ে বল হাতে নেতৃত্ব দিয়েছিলেন হিথ স্ট্রিক। দুই ইনিংসে নিজের ঝুলিতে ভরেছিলেন ৯ উইকেট। সেই ম্যাচে আর সেরার পুরস্কার পাওয়া হয়নি হিথের। অবশ্য টেস্ট ক্যারিয়ারে কখনোই ম্যাচসেরার পুরস্কার জেতেননি তিনি।

তবে মজার ব্যাপার হলো, ক্রিকেটের রাজকীয় সংস্করণে কখনো ম্যাচ সেরার পুরস্কার না জিতলেও হিথ স্ট্রিক সিরিজ সেরার পুরস্কার জিতেছেন তিনবার!

হিথ স্ট্রিক মূলত বোলার হলেও লোয়ার মিডল অর্ডারে সময়ের প্রয়োজনে হয়ে উঠতেন দারুণ কার্যকরী। টেস্টে ১ হাজার ৯৯০ এবং ৫০ ওভারের ক্রিকেটে ২হাজার ৯৪৩ রান সেটিই প্রমাণ করে। 

২০১৪ থেকে ২০১৬ সাল পর্যন্ত বাংলাদেশের বোলিং কোচ হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন হিথ। ছবি- ইএসপিএনশুধু তাই নয়, আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে হিথের ঝুলিতে একটি শতকও রয়েছে। টেস্টে ১টি সেঞ্চুরির সঙ্গে হাঁকিয়েছেন ১১টি ফিফটি। ক্যারিয়ার সেরা অপরাজিত ১২৭ রানের ইনিংসটা খেলেন ২০০৩ সালে হারারেতে, ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে। এছাড়া ওয়ানডেতে হাঁকিয়েছেন ১৩টি ফিফটি।

জিম্বাবুয়ে ক্রিকেটে হিট স্ট্রিকের একটি কীর্তি এখনও জ্বল জ্বল করে জ্বলছে অক্ষর। তিনিই জিম্বাবুয়ের প্রথম এবং এখন পর্যন্ত একমাত্র পেসার, যার দখলে রয়েছে দুই শতাধিক উইকেটের কীর্তি।

২০০০ সাল থেকে ২০০৪ সাল পর্যন্ত জিম্বাবুয়ে দলকে নেতৃত্ব দিয়েছেন হিথ স্ট্রিক। জাতীয় দলকে সবমিলিয়ে ২১টি টেস্ট ও ৬৮টি ওয়ানডেতে নেতৃত্ব দিয়েছেন তিনি। সেই হিসেবে জয়ের পরিসংখ্যানটা খানিকটা কমই, তার নেতৃত্বে ৪টি টেস্ট এবং ১৮টি ওয়ানডে জেতে জিম্বাবুয়ে। তবে ২০০৪ সালে বোর্ডের সাথে ঝামেলার জেরে অধিনায়কত্ব সরে দাঁড়ান তিনি। এর ১ বছর বাদের মাত্র ৩১ বছর বয়সে তিনি আন্তর্জাতিক ক্রিকেট থেকে অবসর নেন।

মুশফিকুর রহিমের সঙ্গে আলোচনা করছেন হিথ স্ট্রিক। ছবি- ইএসপিএনক্রিকেট ক্যারিয়ারকে ‘গুডবাই’ বলার পর কোচিংয়ে মনোনিবেশ করেন হিথ। সেই ধারাবাহিকতায় তিনি বাংলাদেশ, জিম্বাবুয়ে, কলকাতা নাইট রাইডার্স ও সমারসেটের বোলিং কোচের দায়িত্ব পালন করেছেন।

২০১৪ থেকে ২০১৬ সাল পর্যন্ত বাংলাদেশের বোলিং কোচ হিসেবে দায়িত্ব পালন করা হিথের সান্নিধ্যেই পেস বোলিংয়ে দারুণ উন্নতি ঘটে বাংলাদেশি পেসারদের। এরপর ২০১৬ সালের অক্টোবরে বাংলাদেশের বোলিং কোচের পদ ছেড়ে জিম্বাবুয়ের প্রধান কোচের দায়িত্ব নেন তিনি। ২০১৮ সাল পর্যন্ত জিম্বাবুয়ের কোচের দায়িত্ব পালন করা স্ট্রিক অবশ্য এ যাত্রায় ব্যর্থ ছিলেন।

২০১৯ বিশ্বকাপে জিম্বাবুয়ে যোগ্যতা অর্জনে ব্যর্থ হওয়ায় হিথ স্ট্রিককে বরখাস্ত করা হয়। অবশ্য বরখাস্ত হওয়ার কিছুদিন না গড়াতেই ২০১৮ সালের আইপিএলে তিনি কলকাতা নাইট রাইডার্সের বোলিং কোচের দায়িত্ব পান। 

জিম্বাবুয়ের প্রধান কোচ হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন হিথ স্ট্রিক। ছবি- ইএসপিএনএর কয়েক বছর পরেই অবশ্য হিথ স্ট্রিকের ক্যারিয়ারে সবচেয়ে বড় কলঙ্কের দাগ লাগে। আইসিসি দুর্নীতিবিরোধী বিধির বেশ কয়েকটি ধারা ভঙ্গের কারণে ২০২১ সালে সব ধরনের ক্রিকেট থেকে তাকে ৮ বছরের নিষিদ্ধ করে বিশ্ব ক্রিকেটের সর্বোচ্চ নিয়ন্ত্রক সংস্থাটি।

এরপর থেকেই মূলত ক্রিকেট থেকে দূরে সরে যান হিথ স্ট্রিক। আর মরণব্যাধি ক্যান্সারও ক্রমশ দানা বাঁধে তার শরীরে। মাত্র দুই বছরের ব্যবধানে পৌঁছে যান ক্যান্সারের চতুর্থ স্তরে। এরপর আর শরীর পেরে ওঠেনি। ক্যান্সারের কাছে হার মানতে হয় জিম্বাবুয়ের সাবেক এই অলরাউন্ডারকে।

জিম্বাবুয়ের ক্রিকেটে হিথের যে অবদান, সেটি কি শুধুই স্মৃতি? মোটেই নয়। দীর্ঘ এক যুগের ক্যারিয়ারে জিম্বাবুয়ের ক্রিকেটকে তিনি যেভাবে এগিয়ে নিয়েছেন, তাতে তার নামটা দেশের ক্রিকেটে অনুমিতভাবেই ‘চিরায়ত’ হওয়ার কথা। শুধু তাই নয়, জীবনের ইনিংসে মাত্র ৪৯-এই থেমে যাওয়া হিথকে নিয়ে আক্ষেপের গল্প হতে পারে অনেক। জিম্বাবুয়ের সোনালি সময়ের অনেক গল্পের স্রষ্টা যে ছিলেন ডানহাতি এই পেস অলরাউন্ডারই।

ডেইলি-বাংলাদেশ/এআইএ
Durga Puja
লিংক সফলভাবে কপি হয়েছে!