ঢাকা,  বুধবার   ০৪ নভেম্বর ২০২৬, ১৮ কার্তিক ১৪৩৩

[ খেলা ]

লোকাল ট্রেনে প্রপোজ, পরিবারের বিরোধিতা, এরপর বিয়ে ও বিশ্বকাপ জয়

স্পোর্টস ডেস্ক
প্রকাশিত: ১৭:৩৩, ১০ নভেম্বর ২০২০
লোকাল ট্রেনে প্রপোজ, পরিবারের বিরোধিতা, এরপর বিয়ে ও বিশ্বকাপ জয়
বিশ্বকাপ ট্রফি হাতে কপিল দেব

ভারতের প্রথম বিশ্বকাপজয়ী অধিনায়ক হিসেবেই কপিল দেবকে চেনেন সবাই। ভারতের ক্রিকেট ইতিহাসের অন্যতম সেরা এই অলরাউন্ডারের ব্যক্তিগত জীবন ছিল চমকে পরিপূর্ণ। এমনকি জীবনসঙ্গীকেও খুব সহজে পাননি তিনি। 

সহধর্মিনী রোমির সঙ্গে কপিল দেবের প্রথম আলাপ হয় এক বন্ধুর মাধ্যমে। ১৯৭৭ সালে দুজনের আলাপ করিয়ে দিয়েছিলেন সুনীল ভাটিয়া নামে এক বন্ধু। প্রথম দেখাতেই রোমির রূপে মুগ্ধ হন কপিল। তাকে নিজের প্রতি আকৃষ্ট করার জন্যই ক্রিকেটকে বেছে নেন এই অলরাউন্ডার। তিনি দিল্লিতে ভারত-ওয়েস্ট ইন্ডিজ টেস্ট ম্যাচ দেখতে আসার জন্য রোমিকে আমন্ত্রণ জানান। 

সেই টেস্ট সিরিজের পঞ্চম ম্যাচ শেষ অবধি অমীমাংসিত থেকে যায়। তবে কপিলের কাছে নানা কারণে স্মরণীয় এই ম্যাচ। কারণ এই ম্যাচে গ্যালারিতে প্রেমিকার সামনেই প্রথম টেস্ট শতরান পেয়েছিলেন তিনি। ১২৪ বলে ১২৬ রানের ঝড়ো ইনিংসে তিনি ৯৪ থেকে শতকে পৌঁছেছিলেন নরবার্ট ফিলিপের বলে ছক্কা হাঁকিয়ে।

১৯৭৮ সালে জাতীয় দলে সুযোগ পাওয়ার পরই রোমিকে প্রপোজ করেন কপিল। পরে এক সাক্ষাৎকারে কপিল জানিয়েছিলেন, তার প্রপোজ পর্ব ছিল নাটকীয়। বন্ধুত্ব হওয়ার পরে বেশ কিছু দিন কেটে গেলেও দু’জনের কেউই মনের ভাব প্রকাশ করতে পারছিলেন না। শেষে এক দিন প্রপোজ করে ফেলেন কপিল। তারা তখন একসঙ্গে একটি লোকাল ট্রেনে ছিলেন।

প্রপোক করার সময় রোমিকে কপিল জিজ্ঞাসা করেছিলেন, সেই মুহূর্তের ট্রেনের জানালার বাইরের দৃশ্য তিনি ক্যামেরাবন্দি করে রাখতে চান কি না। পরে যেন সেই ছবি তাদের সন্তানদের দেখানো যায়। মজার ব্যাপার, সে সময় ট্রেনের জানালা দিয়ে কপিল যে বিজ্ঞাপনের বিলবোর্ডের দিকে নির্দেশ করেছিলেন সেই বিজ্ঞাপনের মুখ ছিলেন তিনি নিজেই। 

কপিলের ইঙ্গিত বুঝে রোমি লজ্জায় লাল হয়ে যান। তবে প্রেমের প্রস্তাবে রাজি হতে সময় নেননি তিনি। ১৯৮০ সালে রোমিকে বিয়ে করেন ২১ বছরের কপিল। সহধর্মিণীর বয়স তখন মাত্র ২০ বছর। 

তবে এর আগে প্রেমের কথা প্রকাশ্যে আসতেই সমস্যা দেখা দেয় কপিল এবং রোমির পরিবারে। এত কম বয়সে দু’জনের বিয়েতে কোনো পরিবারেই সম্মতি ছিল না। তবে তারা দু’জনেই ঠিক করেন পরিবারের বিরুদ্ধে গিয়ে বিয়ে করবেন না, বরং অপেক্ষা করবেন। এতে অবশ্য লাভ হয়নি খুব একটা। এক পর্যায়ে দুই পরিবারের পরিস্থিতি এতটাই খারাপ হয় যে কপিল-রোমির যোগাযোগ বন্ধ হয়ে যেতে বসে।

স্ত্রী রোমির সঙ্গে কপিল দেবজানা যায়, দু’জনের দীর্ঘ ফোনালাপে বেড়ে যাচ্ছিল টেলিফোন বিল। তাই রোমির পরিবারে এসটিডি সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেওয়া হয়। একই ঘটনা ঘটে কপিলের পরিবারেও। দু’জনের বাড়িতেই তখন ল্যান্ডলাইন ছিল। কিন্তু সেখান থেকে আউটগোয়িং এসটিডি কল করা যেত না। শুধু ইনকামিং এসটিডি ফোনে কথা বলা যেতো। সে সময় কপিল থাকতেন হরিয়ানায়, অন্যদিকে রোমি দিল্লিতে। দু’জনের বাড়িতেই এসটিডি সংযোগ বিচ্ছিন্ন হওয়ায় তাদের রোজকার প্রেমালাপে ছেদ পড়ে।

শেষে ক্রিকেট দিয়েই সমস্যার সমাধান বার করেন কপিল। কোনো ম্যাচ খেলতে যাওয়ার সময় নির্ধারিত সময়ের বেশ কিছুটা আগেই বিমানবন্দরে পৌঁছাতেন তিনি। তারপর বিমানবন্দরের ফোনবুথ থেকে প্রেমিকার সঙ্গে গল্প করতেন। শেষ অবধি দু’জনের জেদের কাছে হার মানতে বাধ্য হয় দুই পরিবার। ফলে বেশ তরুণ বসেই সাতপাকে বাঁধা পড়েন কপিল-রোমি।

বিয়ের পরে কপিলের ক্যারিয়ারের উন্নতি ঘটে উল্কাবেগে। ১৯৮২-৮৩ মৌসুমে শ্রীলংকার বিরুদ্ধে সিরিজে জাতীয় দলের হয়ে তার অধিনায়কত্বের অভিষেক হয়। আর ১৯৮৩ সালে কপিলের নেতৃত্বেই প্রথমবার বিশ্বকাপ জেতে ভারত। পুরো টুর্নামেন্টে তার পারফরম্যান্স ছিল দুরন্ত।

মাঠ এবং মাঠের বাইরে জীবনের সব বাঁকেই কপিলের পাশে থেকেছেন রোমি। ক্যারিয়ারের শেষ দিকে বার বার জাতীয় দলে তার জায়গা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। জীবনের অমসৃণ সেই মুহূর্তগুলোতে কপিলের মানসিক শক্তির উৎস ছিলেন স্ত্রী রোমিই। দাম্পত্যের ১৪ বছর পেরিয়ে ১৯৯৪ সালে কপিল-রোমির সংসারে আসে তাদের একমাত্র সন্তান, আমেয়া।

১৯৯৪ সালেই ক্রিকেট থেকে অবসর নেন কপিল। তখন তার নামের পাশে ১৩১ টেস্টে ৫২৪৮ রান এবং ৪৩৪ উইকেটের পরিসংখ্যান। সর্বোচ্চ স্কোর ১৬৩। এছাড়া ২২৫টি ওয়ানডে ম্যাচে কপিলের মোট রান ৩৭৮৩। সর্বোচ্চ অপরাজিত ১৭৫। উইকেট নিয়েছেন ২৫৩টি।

ভারতের ক্রিকেট ইতিহাস যতদিন থাকবে ততদিন অমর হয়ে থাকবেন কপিল দেব। তবে জীবনের নানা ঘাত প্রতিঘাতে তার পাশে থাকা রোমির অবদানও কোনোক্ষেত্রে কম নয়। 

ডেইলি-বাংলাদেশ/এএল
লিংক সফলভাবে কপি হয়েছে!