জীবন নিয়ে শঙ্কায় কিডনি রোগীরা
দেশের সরকারি হাসপাতালে নামমাত্র খরচে কিডনি ডায়ালাইসিস সেবা প্রদানকারী প্রতিষ্ঠান ‘স্যান্ডর ডায়ালাইসিস সার্ভিসেস বাংলাদেশ লিমিটেড’-এর সঙ্গে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের ১০ বছর মেয়াদি চুক্তির মেয়াদ শেষ হতে চলেছে। আগামী নভেম্বর মাসের শেষ দিকে এই চুক্তির মেয়াদ শেষ হওয়ায় সেবা কার্যক্রম পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যাওয়ার শঙ্কা দেখা দিয়েছে। এর ফলে দেশের সরকারি মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালে কম খরচে চিকিৎসাধীন অসংখ্য দরিদ্র ও অসচ্ছল কিডনি রোগী এবং তাদের স্বজনদের মধ্যে গভীর উৎকণ্ঠা ও আতঙ্ক বিরাজ করছে। সময়মতো সরকারের পক্ষ থেকে নতুন কোনো সিদ্ধান্ত বা চুক্তি নবায়নের উদ্যোগ নেওয়া না হলে দেশের কিডনি চিকিৎসার ক্ষেত্রে এক মারাত্মক বিপর্যয় নেমে আসতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা।
জানা গেছে, ২০১৬ সালের নভেম্বর মাসে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সঙ্গে পাবলিক-প্রাইভেট পার্টনারশিপ (পিপিপি) বা বিশেষ চুক্তির আওতায় ১০ বছরের জন্য কার্যক্রম শুরু করেছিল ভারতীয় প্রতিষ্ঠান ‘স্যান্ডরিনোফি ইন্ডিয়া প্রাইভেট লিমিটেড’-এর সহযোগী প্রতিষ্ঠান স্যান্ডর ডায়ালাইসিস সার্ভিসেস। সেই চুক্তির শর্ত অনুযায়ী, চলতি বছরের ২৯ নভেম্বর স্যান্ডরের সঙ্গে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের বর্তমান চুক্তির মেয়াদ আনুষ্ঠানিকভাবে শেষ হচ্ছে।
.png)
চুক্তি অনুযায়ী, রাজধানীর জাতীয় কিডনি রোগ ও ইউরোলজি ইনস্টিটিউট (শেরেবাংলা নগর) এবং চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ (চমেক) হাসপাতালে দীর্ঘদিন ধরে সফলভাবে ডায়ালাইসিস সেবা পরিচালনা করে আসছে প্রতিষ্ঠানটি। এর মধ্যে জাতীয় কিডনি ইনস্টিটিউটে ৫৯টি এবং চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ৩১টি ডায়ালাইসিস মেশিনের মাধ্যমে প্রতিদিন শত শত রোগীকে সেবা দেওয়া হচ্ছে। কিন্তু নির্ধারিত সময়ে চুক্তির মেয়াদ ফুরিয়ে আসায় এবং পরবর্তীতে তা নবায়ন বা বিকল্প ব্যবস্থা গ্রহণের বিষয়ে এখন পর্যন্ত সুনির্দিষ্ট কোনো নির্দেশনা না আসায় প্রতিষ্ঠানটির কার্যক্রম অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছে।
স্যান্ডর ডায়ালাইসিস সার্ভিসেস বাংলাদেশ লিমিটেড মূলত বাংলাদেশ সরকারের স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সঙ্গে পাবলিক-প্রাইভেট পার্টনারশিপ (পিপিপি) চুক্তির আওতায় নির্দিষ্ট কিছু সরকারি হাসপাতালে ডায়ালাইসিস সেবা প্রদান করে আসছে। প্রতিষ্ঠানটির সঙ্গে সরাসরি চুক্তিভুক্ত প্রধান দুটি সরকারি হাসপাতাল হলো—জাতীয় কিডনি রোগ ও ইউরোলজি ইনস্টিটিউট (নিকডু) এবং চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ (চমেক) হাসপাতাল।
স্যান্ডরের ডায়ালাইসিস সেন্টারে খরচ মূলত সরকারি ভর্তুকিপ্রাপ্ত ও সাধারণ—এই দুটি ক্যাটাগরিতে বিভক্ত। এক্ষেত্রে সরকারি ভর্তুকিপ্রাপ্তরা সংশ্লিষ্ট সরকারি হাসপাতালের (নিকডু বা চমেক) সমাজসেবা বিভাগ বা হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ দ্বারা মনোনীত হন। তারা অত্যন্ত কম খরচে এই সেবা পান। এই ক্যাটাগরিতে সেশনপ্রতি খরচ সাধারণত ৪০০ থেকে ৬২১ টাকা (হাসপাতালভেদে এবং সেশন সংখ্যার ওপর ভিত্তি করে এটি কিছুটা কম-বেশি হতে পারে)।
আর সাধারণ রোগীরা সরকারি কোটা বা ভর্তুকির আওতায় পড়েন না। তাদের সম্পূর্ণ নিজস্ব খরচে ডায়ালাইসিস করতে হয়। এই ক্ষেত্রে প্রতি সেশনের খরচ প্রায় ২ হাজার ৯৩৫ থেকে ৩ হাজার ৩৯৭ টাকা। এর বাইরে সিঙ্গেল ডায়ালাইজার ব্যবহারের জন্য আলাদাভাবে প্রায় ১ হাজার ৩২০ টাকার মতো খরচ হয়।
রাজধানীর জাতীয় কিডনি ইনস্টিটিউটে স্যান্ডর সেন্টারে সরেজমিনে ঘুরে দেখা গেছে, সেখানে চিকিৎসা নিতে আসা রোগীদের অধিকাংশই নিম্নবিত্ত, গরিব ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর। জীবন-মৃত্যুর সন্ধিক্ষণে থাকা এসব মানুষ নিয়মিত বিরতিতে নামমাত্র খরচে ডায়ালাইসিস করতে পেরে কিছুটা স্বস্তিতে ছিলেন। কিন্তু নভেম্বরের শেষের দিকে সেবা বন্ধ হয়ে যাওয়ার খবরে দুশ্চিন্তার ভাঁজ পড়েছে স্বল্প আয়ের কিডনি রোগীদের কপালে।
রাজধানীর শ্যামলী থেকে নিকডুতে আসা রোগী শারমিন মির্জা জানান, কিডনির চিকিৎসা করাতে গিয়ে জমি বিক্রি করেছি। গয়না বিক্রি করেছি। এখন আর সম্বল বলতে কিছু নেই। একদম পথে বসে গেছি। এখন যদি আমার স্বল্পমূল্যের এই ডায়ালাইসিস সেবাটি বন্ধ হয়ে যায়, আমার বিষ খাওয়া ছাড়া কোনো উপায় থাকবে না।
আরেক রোগী কাজী মুন্না বলেন, ডায়ালাইসিস করতে এখানে খরচ পড়ে ৬২১ টাকা। আর বাইরে বেসরকারি কোনো প্রতিষ্ঠানে করাতে গেলে ১০ হাজার টাকারও বেশি খরচ হয়। এতো টাকা দিয়ে ডায়ালাইসিস করা আমাদের পক্ষে সম্ভব না। এছাড়া সরকারি অন্যান্য যে ব্যবস্থাপনা রয়েছে, তাতে ভোগান্তির শেষ নেই। এটা নেই, সেটা নেই বলে সব নিজের কিনতে হয়। ডায়ালাইসিসের একজন রোগীর পক্ষে এই ধকল নেওয়া অনেক কষ্টের। তাই আমরা চাই, এই সেবাটি অব্যাহত থাকুক। এটা বন্ধ হয়ে গেলে চিকিৎসাই বন্ধ করে দিতে হবে, এছাড়া বিকল্প কোনো উপায় নেই।

রাজবাড়ী থেকে আসা রোগী মো. রাজু বলেন, ৬ বছর ধরে ডায়ালাইসিস চলছে। ধারদেনা করে খরচ মেটাই। এখানে দরিদ্র কোটায় প্রতিবার ডায়ালাইসিসে খরচ দিতে হয় ৬২১ টাকা। এখন সেবাটি বন্ধ হয়ে যাওয়ার খবর শুনছি। সত্যি সত্যিই যদি এটি বন্ধ হয়ে যায়, আমাদের চিকিৎসা করানোর আর কোনো উপায় থাকবে না।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে এক জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ বলেন, দেশের সিংহভাগ কিডনি রোগীর পক্ষে বেসরকারি হাসপাতালের চড়া মূল্যে আজীবন ডায়ালাইসিস চালিয়ে যাওয়া অসম্ভব। স্যান্ডরের মতো প্রকল্পগুলো বন্ধ হয়ে গেলে তা জনস্বাস্থ্য খাতে বড় ধরনের ধাক্কা দেবে। ডায়ালাইসিসের মতো জীবনরক্ষাকারী সেবা ব্যাহত হলে তা মৃত্যুর হার বহুলাংশে বাড়িয়ে দেবে। তাই সময়ক্ষেপণ না করে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়, স্বাস্থ্য অধিদপ্তর এবং স্যান্ডর কর্তৃপক্ষের ত্রিপক্ষীয় আলোচনার মাধ্যমে দ্রুত চুক্তি নবায়ন অথবা স্বাস্থ্য খাতের নিজস্ব ব্যবস্থাপনায় এই সেবা চালু রাখার স্থায়ী সমাধান বের করা জরুরি।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে স্যান্ডর ডায়ালাইসিস সার্ভিসেস বাংলাদেশ লিমিটেডের ম্যানেজার (অপারেশন) এম এন হাসান জানান, বাংলাদেশ সরকারের সঙ্গে আমাদের ১০ বছরের চুক্তির মেয়াদ আগামী নভেম্বরে শেষ হতে যাচ্ছে। আমরা নির্ধারিত নিয়ম মেনে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষসহ সংশ্লিষ্ট দপ্তরে আমাদের বর্তমান পরিস্থিতির কথা আনুষ্ঠানিকভাবে জানিয়েছি। চুক্তি নবায়ন বা পরবর্তী কার্যক্রমের বিষয়ে সরকারের উচ্চপর্যায় থেকে সুনির্দিষ্ট নির্দেশনা পেলে কেবল আমরা পরবর্তী পদক্ষেপ নিতে পারব।
এদিকে চুক্তির মেয়াদ শেষ হওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করে সংশ্লিষ্ট হাসপাতালগুলোর পক্ষ থেকে ইতিমধ্যে সরকারের স্বাস্থ্য বিভাগের কাছে চিঠি পাঠানো হয়েছে বলে জানা গেছে। চিঠিতে স্পষ্ট করে উল্লেখ করা হয়েছে যে, নির্ধারিত সময়ের মধ্যে চুক্তি নবায়ন বা নতুন কোনো নীতিগত সিদ্ধান্ত না এলে চলতি বছরের নভেম্বরের শেষ দিকে স্যান্ডরের কার্যক্রম বন্ধ হয়ে যেতে পারে। যা সামলানো হাসপাতালের নিজস্ব ব্যবস্থাপনায় অসম্ভব হয়ে পড়বে।
এ বিষয়ে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হাসপাতাল শাখার পরিচালক ডা. মো. নুরুল ইসলামকে একাধিকবার ফোন করা হলেও পাওয়া যায়নি। তবে নাম প্রকাশ না করার শর্তে স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের এক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, স্যান্ডর কর্তৃপক্ষ সেন্টারটি চালিয়ে যেতে চায় এবং চুক্তি পুনর্নবীকরণ করতে চায়। এ জন্য তারা দুই দফা আবেদনও করেছে। কিন্তু সরকারের তাতে সম্মতি নেই। সরকার চাইছে, সেবাটি তারা নিজেরাই পরিচালনা করবে।