শহীদ নূরের বাবার ভিটায় স্মৃতিস্তম্ভের প্রত্যাশা
আজ ১০ নভেম্বর। শহীদ নূর হোসেন দিবস। ১৯৮৭ সালের এ উত্তাল দিনে স্বৈরশাসনের বিরুদ্ধে আন্দোলনরত অবস্থায় গুলির আঘাতে বুক ঝাঁঝরা হয় নূর হোসেনের। দেশের গণতন্ত্রের জন্য দিনটি অবিস্মরণীয়। তাই নূর হোসেনকে স্মরণীয় করে রাখতে তার বাবার ভিটায় স্মৃতিস্তম্ভের প্রত্যাশা করছেন স্বজন ও স্থানীয়রা।
পিরোজপুরের মঠবাড়িয়ার নিভৃত পল্লী সাপলেজা ইউপির ঝাঁটিবুনীয়া গ্রামে শহীদ নূর হোসেনের বাবা বাড়ি। সেই বাড়িটি অবহেলায় পড়ে রয়েছে। সেখানে এখনো গড়ে ওঠেনি কোনো স্মৃতিস্তম্ভ। ওই বাড়িতে নূর হোসেনের বড় চাচা মোকলেসুর রহমানের দুই ছেলে আলাদা বসবাস করেন। নূর হোসেনের বাবার ভিটায় তার চাচাতো ভাই মো. রুহুল আমীন হাওলাদার বসবাস করেন।
মো. রুহুল আমীন হাওলাদার বলেন, আমার বাবা ও চাচারা পাঁচ ভাই। পাঁচ ভাইদের মধ্যে তৃতীয় ছিলেন নূর হোসেনের বাবা মজিবর রহমান হাওলদার। তিনি ২০০৫ সালে মারা যান। এছাড়া নূর হোসেনের বাবা চাচা মোকলেসুর রহমান হাওলাদারসহ চাচা চাঁন মিয়া হাওলাদার, রত্তন আলী হাওলাদারও মারা গেছেন। ছোট চাচা লাল মিয়া হাওলাদার বেঁচে আছেন। তিনি রাঙামাটিতে স্থায়ীভাবে বসবাস করেন।
.png)
তিনি আরো বলেন, চাচা মজিবর রহমান দেশ স্বাধীনের আগে কাজের সন্ধানে গ্রাম ছেড়ে ঢাকায় যান। সেখানে তিনি অটোরিকশা চালিয়ে জীবিকা নির্বাহ করতেন। নূর হোসেনের জন্ম ঢাকায়। তারা চার ভাই ও এক বোন। নূর হোসেন মজিবর রহমানের দ্বিতীয় সন্তান। তার অপর ভাইয়েরা হলেন- আলী হোসেন, দেলোয়ার হোসেন, আনোয়ার হোসেন ও বোন শাহানা বেগম। সবাই ঢাকায় স্থায়ীভাবে বসবাস করেন। তবে চাচা মজিবর রহমান সন্তানদের নিয়ে গ্রামে বেড়াতে আসতেন। নূর হোসেন ও গ্রামে আসতো। তখন গ্রামে মোবাইল ছিল না। ঘটনার দিন রাত ১২টায় গ্রামে খবর পাই যে, ঢাকায় নূর হোসেনকে গুলি করে মারা গেছে। এ খবরটি সদরের টেলিফোন অফিসের মাধ্যমে আসে। দুইদিন পর আমরা বিস্তারিত জানতে পারি। নূর হোসেন শহীদ হওয়ার পর চাচা কয়েকবার গ্রামের বাড়িতে এসেছেন। চাচার মৃত্যু হলেও চাচাতো ভাই ও বোনের সঙ্গে কথা হয়। ব্যস্ত থাকায় গ্রামে বেড়াতে আসেন না তারা।
তিনি বলেন, আমার ভাই গণতন্ত্রের জন্য জীবন দিয়েছে। তবে তার বাবার ভিটায় শহীদ ভাইয়ের স্মৃতি সুরক্ষায় কোনো ব্যবস্থা হয়নি। শহীদ ভাইয়ের নামে একটা এবতেদায়ী মাদরাসা করেছিলাম। পৃষ্ঠপোষকতার অভাবে তা এখন অচল হয়ে পড়ে রয়েছে। গ্রামের কাঁচা সড়কে এ বছর ইট বসানো হয়েছে। এর বাইরে আর কিছু না। মাদারাসাটা চালু করতে চাই, পাশে একটি পাঠাগার আর শহীদ ভাইয়ের একটি স্মৃতি স্তম্ভ নির্মাণের দাবি জানাই।

এদিকে ঢাকায় মঠবাড়িয়াবাসী তরুণরা মিলে শহীদ নূর হোসেনের স্মৃতি রক্ষায় ‘জাগো লক্ষ নূর হোসেন’ নামে একটি সংগঠন গড়ে তোলেন। এছাড়া নূর হোসেনের গ্রাম ঝাঁটিবুনীয়া ও পূর্ব সাপলেজা গ্রামের তরুণরা মিলে গড়ে তোলেন ‘নূর হোসেন স্মৃতি পরিষদ’। সংগঠন দুটি শহীদ নূর হোসেন দিবসে স্মরণসভার আয়োজন ছাড়া কিছুই করতে পারছেন না। সংগঠন দুটির সদস্যরা নূরের বাবা ভিটায় স্মৃতিস্তম্ভের প্রত্যাশা করছেন।
নূর হোসেন স্মৃতি পরিষদের অন্যতম উদ্যোক্তা মো. নূরুল আমীন রাসেল বলেন, ১৯৯২ সালে গ্রামের তরুণরা মিলে সংগঠনটি গড়ে তুলি। কিন্ত সরকারি কোনো পৃষ্ঠপোষকতা ও স্থানীয় উদ্যোক্তাদের তেমন সাড়া না পেলেও তরুণরা মিলে দিবসটি পালন করে আসছি। শহীদ নূর হোসেনের বাবার ভিটায় একটি স্মৃতিস্তম্ভ নির্মাণ ও একটি পাঠাগার নির্মাণের প্রত্যাশা করি।
সাপলেজা ইউপি চেয়ারম্যান মো. মিরাজ মিয়া বলেন, আমি গর্বিত যে, শহীদ নূর হোসেন আমার ইউপির কৃতি সন্তান। তার বাবার ভিটায় স্মৃতি সুরক্ষা করা হলে আগামী প্রজন্ম অনুপ্রাণিত হবে। তিনি ছিলেন গণতান্ত্রিক আন্দোলনের প্রতীক। তার জীবন দানের ইতিহাসের জন্য আমরা গর্বিত। তবে তার স্মৃতি রক্ষায় বাবার ভিটেতে কোনো কিছু গড়ে ওঠেনি। মঠবাড়িয়াবাসীর পক্ষ থেকে তার বাবার ভিটেতে স্মৃতিস্তম্ভ করার প্রত্যাশা করছি।
১৯৮৭ সালের ১০ নভেম্বর ঢাকার রাজপথে স্বৈরাচার বিরোধী আন্দোলনে নামেন মুক্তিকামী মানুষের আন্দোলন-সংগ্রামের কর্মী নূর হোসেন। তার উদোম বুকে পীঠে ‘স্বৈরাচার নিপাত যাক, গণতন্ত্র মুক্তি পাক’ লিখে হাজারো মানুষের প্রতিবাদে অংশ নেন তিনি। ওই দিন তিনি প্রতিবাদী যুবকের জীবন্ত পোস্টার হয়েছিলেন। সেদিন জনতার প্রতিবাদ মিছিলে নির্বিচারে গুলি চালিয়ে নূরের বক্ষ ঝাঁঝরা করে দেয়া হয়। এতে প্রতিবাদী নূর হোসেনের বুকের রক্তে সেদিন ঢাকার রাজপথ রঞ্জিত হয়। এরপর থেকে প্রতিবছর ১০ নভেম্বর নূর হোসেন দিবস হিসেবে পালিত হচ্ছে।