ঢাকা,  বৃহস্পতিবার   ১৫ অক্টোবর ২০২৬, ২৯ আশ্বিন ১৪৩৩

[ বিজ্ঞান বিস্ময় ]
জন্মদিবস

বিজ্ঞানী, রাষ্ট্রপতি ও শিক্ষক এ পি জে আবদুল কালাম

হারুন-অর-রশীদ খান
প্রকাশিত: ১২:১৫, ১৫ অক্টোবর ২০২৬
বিজ্ঞানী, রাষ্ট্রপতি ও শিক্ষক এ পি জে আবদুল কালাম
দারিদ্র্য থেকে উঠে এসে বিজ্ঞানী, রাষ্ট্রপতি ও শিক্ষক হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছিলেন আবদুল কালাম

“জীবন এক কঠিন খেলা। সত্যিকারের মানুষ হয়ে উঠতে পারলেই এ খেলায় জেতা যায়।” — এ পি জে আবদুল কালাম

ভারতের সাবেক রাষ্ট্রপতি, প্রখ্যাত মহাকাশবিজ্ঞানী, লেখক ও চিন্তাবিদ এ পি জে আবদুল কালাম। ‘মিসাইলম্যান’ খ্যাত এই মনীষী তাঁর মেধা, অধ্যবসায়, বিনয় ও মানবিকতার জন্য আজও কোটি মানুষের কাছে অনুপ্রেরণার উৎস। ১৯৩১ সালের ১৫ অক্টোবর তামিলনাড়ুর রামেশ্বরমে জন্মগ্রহণ করেন তিনি।

আবদুল কালামের সঙ্গে বাংলাদেশেরও নিগূঢ় সম্পর্ক ছিল। বাংলাদেশের অনেক বিজ্ঞানী ও গবেষক তাঁর সান্নিধ্যে এসেছেন। তিনি একাধিকবার বাংলাদেশে এসে নতুন প্রজন্মকে উজ্জীবিত করেছেন।

আবদুল কালামের জীবনসংগ্রামের পেছনে ছিল তাঁর মায়ের অপরিসীম ভালোবাসা ও ত্যাগ। পরিবারের অন্য সন্তানদের পাশাপাশি ছোট ছেলে কালামের পড়াশোনার সুবিধার কথা ভেবে তাঁর মা বাড়তি যত্ন নিতেন। 

ভোরে উঠে পড়তে বসবে ছেলেটি—এই ভেবে তাঁর জন্য বাড়তি রুটি তৈরি করতেন। দরিদ্র সংসারে সীমিত সামর্থ্যের মধ্যেও ছেলের পড়াশোনার জন্য প্রয়োজনীয় কেরোসিনের ব্যবস্থা করতেন। 

  • মায়ের বিশ্বাস ছিল, একদিন তাঁর ছেলে অনেক বড় হবে। বঙ্গোপসাগরের বিশালতার পাশে বেড়ে ওঠা সেই ছেলেই একদিন নিজের কর্মগুণে বিশ্বজুড়ে পরিচিতি লাভ করেন।

১৯৩১ সালের ১৫ অক্টোবর তামিলনাড়ুর রামেশ্বরমে এক সাধারণ মুসলিম পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন আবুল পাকির জয়নুলাবদিন আবদুল কালাম। তাঁর বাবা জয়নুলাবদিন ছিলেন নৌকার মালিক এবং তীর্থযাত্রীদের নৌকায় পারাপারের ব্যবস্থা করতেন। 

মা আশিয়াম্মা ছিলেন গৃহবধূ। শৈশব থেকেই পরিবারের আর্থিক সংকট মোকাবিলায় তাঁকে পরিশ্রম করতে হয়েছে। স্কুলে পড়ার সময় জীবিকার প্রয়োজনে খবরের কাগজও বিক্রি করতেন তিনি।

স্কুলের পাঠ শেষ করে বৃত্তি নিয়ে তিরুচিরাপল্লির সেন্ট জোসেফ কলেজে ভর্তি হন কালাম। সেখান থেকে ১৯৫৪ সালে পদার্থবিদ্যায় স্নাতক ডিগ্রি অর্জন করেন। পরে মাদ্রাজ ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজিতে অ্যারোনটিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং অধ্যয়ন করেন। তাঁর স্বপ্ন ছিল ভারতীয় বিমানবাহিনীতে যোগ দিয়ে বিমানচালক হবেন। কিন্তু নির্বাচনী প্রক্রিয়ায় তিনি অল্পের জন্য সেই সুযোগ হারান। 

স্বপ্নের একটি দরজা বন্ধ হয়ে গেলেও থেমে যাননি তিনি। বরং অধ্যবসায় ও মেধার জোরে হয়ে ওঠেন ভারতের অন্যতম শ্রেষ্ঠ মহাকাশ ও প্রতিরক্ষাবিজ্ঞানী।

  • ভারতের মহাকাশ গবেষণা সংস্থা ইসরোতে কাজ করার সময় কালাম দেশের প্রথম দেশীয় স্যাটেলাইট লঞ্চ ভেহিকল (এসএলভি-৩) প্রকল্পের পরিচালক হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। ১৯৮০ সালে এই উৎক্ষেপণযানের মাধ্যমে রোহিণী উপগ্রহকে কক্ষপথে স্থাপন করা সম্ভব হয়। 

পরবর্তী সময়ে প্রতিরক্ষা গবেষণা ও উন্নয়ন সংস্থা—ডিআরডিওতে ক্ষেপণাস্ত্র উন্নয়ন কর্মসূচিতে নেতৃত্ব দেন তিনি। অগ্নি ও পৃথ্বীর মতো ক্ষেপণাস্ত্রের উন্নয়নে তাঁর গুরুত্বপূর্ণ অবদানের কারণে তিনি ‘মিসাইলম্যান অব ইন্ডিয়া’ নামে পরিচিতি লাভ করেন। ১৯৯৮ সালের পোখরান-২ পারমাণবিক পরীক্ষাতেও তাঁর গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল।

বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিতে অসামান্য অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ তিনি পদ্মভূষণ, পদ্মবিভূষণ ও ভারতের সর্বোচ্চ বেসামরিক সম্মাননা ভারতরত্নে ভূষিত হন। বিজ্ঞানী হিসেবে তাঁর সাফল্য তাঁকে শুধু দেশের গণ্ডিতেই সীমাবদ্ধ রাখেনি; বরং বিশ্বজুড়ে পরিচিত করে তুলেছিল।

Remembering Dr. A.P.J. Abdul Kalam: A Life Richer by Virtues

২০০২ সালের ২৫ জুলাই ভারতের একাদশ রাষ্ট্রপতি হিসেবে শপথ নেন আবদুল কালাম। ক্ষমতাসীন ও বিরোধী—উভয় পক্ষের সমর্থনে নির্বাচিত এই রাষ্ট্রপতি ২০০৭ সাল পর্যন্ত দায়িত্ব পালন করেন। সাধারণ মানুষের সঙ্গে নিবিড় যোগাযোগ এবং শিক্ষার্থীদের প্রতি বিশেষ অনুরাগের কারণে তিনি ‘জনগণের রাষ্ট্রপতি’ হিসেবে পরিচিতি পান। রাষ্ট্রপতি ভবনেও তিনি শিশু-কিশোর ও শিক্ষার্থীদের সঙ্গে মতবিনিময়ে বিশেষ আগ্রহ দেখাতেন।

রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব শেষ হওয়ার পরও তিনি থেমে থাকেননি। আবার ফিরে গেছেন শিক্ষকতা, গবেষণা ও জ্ঞানচর্চার জগতে। বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে অধ্যাপনা করেছেন এবং দেশজুড়ে শিক্ষার্থীদের সঙ্গে মতবিনিময় করেছেন। 

তরুণ প্রজন্মের মধ্যে স্বপ্ন দেখার সাহস, বিজ্ঞানমনস্কতা ও দেশ গড়ার প্রত্যয় জাগিয়ে তোলাই ছিল তাঁর অন্যতম লক্ষ্য।

কালাম বিশ্বাস করতেন, শিক্ষাই মানুষের জীবন বদলে দেওয়ার অন্যতম প্রধান শক্তি। তাঁর কাছে শিক্ষকতা ছিল শুধু পেশা নয়, বরং মানুষ গড়ার মহান দায়িত্ব। তাই জীবনের শেষ দিনেও তিনি শিক্ষক হিসেবেই শিক্ষার্থীদের সামনে উপস্থিত হয়েছিলেন।

Introducing Kalam Chakra Fellowship Program for bright young professionals,  leaders and change makers who wish to work towards realizing the dream of Dr.  Kalam for an Economic Superpower India with

জীবন ও জগৎ সম্পর্কে তাঁর বহু বক্তব্য মানুষের চিন্তাজগৎকে সমৃদ্ধ করেছে। তাঁর নামে প্রচলিত কয়েকটি অনুপ্রেরণামূলক উক্তি হলো—

★ নিজেকে একা মনে হলে আকাশের দিকে তাকাও। আমরা একা নই; পৃথিবী আমাদের বন্ধু।

★ জীবনে প্রতিবন্ধকতা থাকা প্রয়োজন। বাধা অতিক্রম করেই সাফল্যের প্রকৃত আনন্দ উপলব্ধি করা যায়।

★ জীবন এক কঠিন খেলা। সত্যিকারের মানুষ হয়ে উঠতে পারলেই এ খেলায় জেতা যায়।

★ একটি দেশ বা জাতিকে বদলে দেওয়ার ক্ষেত্রে বাবা, মা ও শিক্ষকের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

কালামের ব্যক্তিজীবনের আরেকটি উল্লেখযোগ্য দিক ছিল তাঁর অসাম্প্রদায়িক ও উদার দৃষ্টিভঙ্গি। ধর্মীয় মূল্যবোধের প্রতি শ্রদ্ধাশীল থেকেও তিনি জ্ঞান, যুক্তি ও মানবিকতাকে গুরুত্ব দিতেন। 

পবিত্র কোরআন ও ভগবদ্গীতার প্রতি তাঁর আগ্রহের কথা বিভিন্ন লেখায় উঠে এসেছে। ধর্মীয় পরিচয়ের ঊর্ধ্বে উঠে মানুষের মধ্যে সম্প্রীতি ও পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ গড়ে তোলার যে শিক্ষা তিনি দিয়েছেন, তা আজও প্রাসঙ্গিক।

২০১৫ সালের ২৭ জুলাই মেঘালয়ের শিলংয়ে ইন্ডিয়ান ইনস্টিটিউট অব ম্যানেজমেন্টে ‘বসবাসযোগ্য পৃথিবী’ বিষয়ে বক্তব্য দেওয়ার সময় অসুস্থ হয়ে পড়েন আবদুল কালাম। পরে হাসপাতালে নেওয়া হলে তাঁর মৃত্যু হয়। মৃত্যুকালে তাঁর বয়স হয়েছিল ৮৩ বছর। কর্মময় জীবনের শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত তিনি শিক্ষার্থীদের মধ্যে জ্ঞান ও অনুপ্রেরণার আলো ছড়িয়ে গেছেন।

তাঁর নামে প্রচলিত একটি বহুল উদ্ধৃত বক্তব্য হলো—“আমার মৃত্যুতে ছুটি ঘোষণা কোরো না। আমাকে যদি ভালোবাসো, তাহলে সেদিন মন দিয়ে কাজ করো।” বক্তব্যটির মূল ভাব তাঁর কর্মনিষ্ঠা ও দায়িত্ববোধের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ।

দারিদ্র্য থেকে উঠে এসে বিজ্ঞানী, রাষ্ট্রপতি ও শিক্ষক হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছিলেন আবদুল কালাম। তাঁর জীবন আমাদের শেখায়—প্রতিকূলতা কখনোই স্বপ্নের শেষ কথা নয়; নিষ্ঠা, অধ্যবসায়, জ্ঞান ও মানবিকতার সমন্বয়ে মানুষ নিজের সীমাবদ্ধতাকে অতিক্রম করতে পারে।

এ পি জে আবদুল কালাম শুধু একজন বিজ্ঞানী বা রাষ্ট্রপতি নন; তিনি স্বপ্ন দেখতে শেখানো, জ্ঞানচর্চায় উদ্বুদ্ধ করা এবং মানবিক মানুষ হয়ে ওঠার এক অনন্য প্রেরণা। তাঁর জন্মবার্ষিকীতে জানাই গভীর শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা।
 
দারিদ্র্য থেকে উঠে এসে বিজ্ঞানী, রাষ্ট্রপতি ও শিক্ষক হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছিলেন আবদুল কালাম। তাঁর জীবন আমাদের শেখায়—প্রতিকূলতা কখনোই স্বপ্নের শেষ কথা নয়; নিষ্ঠা, অধ্যবসায়, জ্ঞান ও মানবিকতার সমন্বয়ে মানুষ নিজের সীমাবদ্ধতাকে অতিক্রম করতে পারে।

5 Less Known Facts About “Dr.APJ Abdul Kalam” – Adarsh Beohar's Blog

আবদুল কালামের জীবন থেকে ৬ শিক্ষণীয় ঘটনা

এ পি জে আবদুল কালাম। পুরো নাম আবুল পাকির জয়নুলাবেদিন আবদুল কালাম। মিসাইল ম্যান নামেও যিনি পরিচিত। ভারতের মহাকাশবিজ্ঞানী এবং ১১তম রাষ্ট্রপতি। একজন কিংবদন্তীতূল্য মানুষ। জন্ম ১৫ অক্টোবর ১৯৩১ বর্তমান ভারতের তামিল নাড়ুতে। মারা যান ২০১৫ সালের আজকের দিনে। তার মৃত্যুদিবস উপলক্ষে তার জীবনের মজার এবং একই সাথে শিক্ষণীয় ৬ ঘটনাঃ

১. স্ট্রেসপূর্ণ ক্লাস প্রজেক্ট  

  • আবদুল কালাম খুব দরিদ্র পরিবারের সন্তান ছিলেন। বাবা ছিলেন মাঝি এবং স্থানীয় মসজিদের ইমাম। পড়াশোনার খরচ জোগাড় করতে আবদুল কালাম পত্রিকা হকারি করেছেন। ছোটবেলা থেকেই শেখার প্রতি তার ছিল বেজায় আগ্রহ।

পদার্থবিদ্যায় গ্রাজুয়েশনের পর এরোস্পেস ইঞ্জিনিয়ারিং পড়ার জন্যে ১৯৫৫ সালে স্কলারশীপ নিয়ে মাদ্রাজ ইনস্টিটিউট অফ টেকনোলজিতে ভর্তি হন। সেখানে সিনিয়র ক্লাস প্রজেক্টে কাজ করার সময় ফ্যাকাল্টির ডিন তার কাজের অগ্রগতি নিয়ে অসন্তোষ প্রকাশ করলেন। হুমকি দিলেন পরবর্তী তিন দিনের মধ্যে প্রজেক্ট শেষ না করতে পারলে তার বৃত্তি ক্যান্সেল!

আবদুল কালাম নির্ধারিত সময়ের মধ্যেই প্রজেক্ট শেষ করলেন। মুগ্ধ হলেন ডিন স্যার। আসলে ছাত্রের কাজে তিনি সন্তুষ্টই ছিলেন। তবে তিনি দেখতে চাচ্ছিলেন চাপের মধ্যে কঠিন টার্গেট সে পূরণ করতে পারে কিনা!   

২. বড় সাফল্যের পেছনে ছোট ব্যর্থতা

  • আবদুল কালামের স্বপ্ন ছিল একজন ফাইটার পাইলট হবেন। ইন্ডিয়ান এয়ার ফোর্সের পরীক্ষায় অংশও নিয়েছিলেন। তাতে তার অবস্থান হয় ৯ম। কিন্তু সেবার সুযোগ পায় প্রথম ৮ জন!

এত কাছাকাছি গিয়েও স্বপ্ন ছুঁতে না পারায় প্রচণ্ড মন খারাপ হয় তার। এক শিক্ষকের সাথে শেয়ার করেন ব্যাপারটা। শিক্ষক তাকে বললেন, তুমি ব্যর্থ হয়েছ, কারণ হয়তো এর চেয়েও বড় কোনো সাফল্য তোমার জন্যে অপেক্ষা করছে!

শিক্ষকের কথায় আবদুল কালাম উজ্জীবিত হলেন। পাইলট হওয়ার স্বপ্নটাকে বদলে দিলেন মহাকাশবিজ্ঞানী হওয়ার স্বপ্নে। কঠোর পরিশ্রমে পূরণ করেন সেই স্বপ্ন। Defence Research and Development Organisation (DRDO) এবং Indian Space Research Organisation (ISRO)’র মতো সংস্থাগুলোর বিজ্ঞানী ও বিজ্ঞান প্রশাসক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন তিনি।

বিমান চালাতে পারেন নি তাতে কী! বিমান এমনকি রকেট উড়িয়েছেন তিনি। ভারতের মিলিটারি মিসাইল উন্নয়ন এবং পোখরান-২ নিউক্লিয়ার টেস্টে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন তিনি। সেদিন যদি পাইলট নিয়োগ পরীক্ষায় সফল হতেন তাহলে নিশ্চয়ই এত কিছু তিনি হতে পারতেন না!   

৩. রাষ্ট্রপতি ভবনে ইফতার পার্টির আয়োজন করেন নি

  • রোজার মাসে রাষ্ট্রপতি তার বাসভবনে ইফতার পার্টির আয়োজন করবে এটা ভারতের একটি পুরনো রেওয়াজ। প্রথমবারের মতো এই প্রথা ভাঙেন আবদুল কালাম।

রাষ্ট্রপতি পদে আসীন হওয়ার পর রমজান মাসে প্রেসিডেন্ট তার সচিব মি. নায়ারের কাছে ইফতার পার্টিবাবদ খরচ কত তা জানতে চাইলেন। মি. নায়ার জানালেন, ২২ লাখ রুপি। ড. কালাম তাকে নির্দেশ দিলেন, কয়েকটি নির্দিষ্ট এতিমখানায় এই অর্থে খাদ্য, পোশাক ও কম্বল কিনে দান করতে হবে। কোন কোন এতিমখানায় দান করা হবে তা বাছাইয়ের জন্যে একটি টিম গঠন করা হয়।

এতিমখানা বাছাইয়ের পর ড. কালাম মি. নায়ারকে তার কক্ষে ডেকে এক লাখ রুপির একটি চেক দিলেন। বললেন, তিনি তার ব্যক্তিগত সঞ্চয় থেকে এই অর্থ দান করছেন। কিন্তু এই তথ্য প্রকাশ করা যাবে না। মি. নায়ার বললেন, “স্যার, আমি এক্ষুণী বাইরে যাব এবং সবাইকে বলব। কারণ, মানুষের জানা উচিত এখানে এমন একজন মানুষ রয়েছেন, যিনি রাষ্ট্রীয় যে অর্থ তার খরচ করা উচিত শুধু সেটাই দান করেননি, নিজের অর্থও দান করে দিয়েছেন!”  

৪. ব্যক্তি আবদুল কালাম বনাম রাষ্ট্রপতি আবদুল কালাম

  • বিদেশে সফরকালে রাষ্ট্রপতিরা দামী দামী উপহার পেয়ে থাকেন। প্রেসিডেন্ট আবদুল কালামও পেয়েছেন। এ-ধরণের উপহার গ্রহণ না করা সৌজন্যের খেলাপ। তাই আবদুল কালাম বিনা বাক্যব্যয়ে এসব উপঢৌকন নিতেন। তবে রাষ্ট্রপতি ভবনে তার নির্দেশ ছিল তিনি সফর থেকে ফেরার পর সাথে আনা সব উপহারসামগ্রী ক্যাটালগ করে আর্কাইভে জমা করতে হবে। সেই উপহারসামগ্রীর দিকে তাকে কখনো ফিরে তাকাতেও দেখা যায়নি।

ড. কালাম রাষ্ট্রপতি ভবনে প্রবেশ করেছিলেন দুই স্যুটকেস নিয়ে; ভবন ত্যাগের সময়ও তার হাতে ছিল দুই স্যুটকেস! কোনো উপহারসামগ্রী, এমনকি একটি পেনসিলও নিয়ে যেতে দেখা যায়নি তাকে।

৫. ব্যক্তিগত ব্যয় রাষ্ট্রীয় তহবিল থেকে মেটান নি কখনো  

  • ড. কালাম একবার তার কিছু আত্মীয়কে দিল্লিতে আমন্ত্রণ জানান। তারা রাষ্ট্রপতি ভবনে এলে তাদের নগর ঘুরিয়ে দেখাতে তিনি একটি বাস ভাড়া করেন। 

তিনি বাস ভাড়াবাবদ অর্থই শুধু পরিশোধ করেন নি, তাদের থাকা-খাওয়ার খরচবাবদ আসা দুই লাখ রুপি বিল তিনি পরিশোধ করেন ব্যক্তিগত উৎস থেকে। ভারতের ইতিহাসে এমন দৃষ্টান্ত দ্বিতীয়টি নেই।

৬. অহমবোধের ঊর্ধ্বে তিনি

  • আবদুল কালামের রাষ্ট্রপতি পদের মেয়াদ শেষের দিকে। সর্বস্তরের কর্মকর্তা-কর্মচারী তার সঙ্গে দেখা করতে আসছেন। ব্যক্তিগত সচিব মি. নায়ার গিয়েছিলেন একা। কারণ তার স্ত্রীর পা ভেঙে গিয়েছিল। শুনে ড. কালাম মর্মাহত হলেন। পরদিন মি. নায়ার সবিস্ময়ে দেখলেন প্রেসিডেন্ট তার বাসভবনে!

এ পি জে আবদুল কালাম শুধু একজন বিজ্ঞানী বা রাষ্ট্রপতি নন; তিনি স্বপ্ন দেখতে শেখানো, জ্ঞানচর্চায় উদ্বুদ্ধ করা এবং মানবিক মানুষ হয়ে ওঠার এক অনন্য প্রেরণা। তাঁর জন্মবার্ষিকীতে জানাই গভীর শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা।

লেখক : হারুন-অর-রশীদ খান, প্রাবন্ধিক।

ডেইলি-বাংলাদেশ/এসএমএম
লিংক সফলভাবে কপি হয়েছে!